بابٌ القراءة والعرض : اي هذا باب في حكم القراءة والعرض
علي المحدث: এটি بالقراءة এবং العرض উভয়ের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে। সুতরাং এখানেتنازع الفعلان-এর সূরত ব্যবহার হয়েছে।
উলেখ্য, এখানে দুটি মাসআলা রয়েছে-
১. প্রথম মাসআলা হলো قراءة علي الشيخ তথা ওস্তাদের সম্মুখে ছাত্র পড়বে, যেমন বর্তমান যুগের দীনী মাদরাসাগুলোতে এ পদ্ধতিই প্রচলিত রয়েছে।
২. দ্বিতীয় মাসআলা হলো عرض علي المحدث তথা ওস্তাদের সম্মুখে পেশ করা। অর্থাৎ ওস্তাদ ছাত্রকে কোনো
কিতাব দিয়ে বলল তুমি এর কপি করে নাও, ছাত্র তা কপি করে ওস্তাদের সামনে পেশ করল। অথবা ছাত্রের নিকট ওস্তাদের লিখিত হাদীসের সমষ্টি পূর্ব থেকেই ছিল, এখন ছাত্র তা কপি করে ওস্তাদের সম্মুখে সেটি শুনিয়ে অনুমতি প্রার্থনা করল, এটি হলো عرض علي المحدث
শায়খুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া (র.) বলেন, قرأة علي المحدث তো হলো যে, ছাত্র পড়বে আর ওস্তাদ শুনবে। কিন্তু যারা পাঠকারীর সাথী তারা যদিও পড়েনা; বরং শুনতে থাকে, তাই তার সাথীদের এ কাজ হলো عرض علي المحدث-এর নামান্তর।
واحتج بعضهم : এখানে بعضهم দ্বারা ইমাম বুখারীর ওস্তাদ আবু সাঈদ হাদ্দাদ উদ্দেশ্য, যদিও بين السطور-এ হুমাইদি লেখা আছে, এটি ভুল। আর এ ভুল হয়েছে ফতহুল বারীর মুকাদ্দমা থেকে। ইবনে হাজার আসকালানী (র.) ফতহুল বারীর মুকাদ্দমায় এটিই লিখেছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে তিনি ভুল স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছেন, যে সেটি আমার ভুল ছিল, পরবর্তীতে বায়হাকীর ‘মারেফাতুসসুনান ওয়াল আছার’ থেকে উদ্বৃত করেছেন যে, স্বয়ং ইমাম বুখারী বলেন যে, আবু সাঈদ হাদ্দাদ উদ্দেশ্য। : ফতহুল বারী খ. ১, পৃ. ১২১
و احتج مالكٌ بالصَّكِّ الخ : ইমাম মালিক (র.) صَك (ص বর্ণে যবর) দ্বারা দলিল প্রদান করেন। (الصكফারসি শব্দ, যার অর্থ আমাদের ভাষায় চুক্তিনামা, দস্তাবেজ বা কবলা) যার পদ্ধতি হলো ঋণ বা ক্রয়-বিক্রয়ের লেনদেনের চুক্তিপত্র লেখক লেখা সমাপ্ত করে পক্ষদ্বয় ও সাক্ষীদের উপস্থিতিতে পড়ে শুনিয়ে দেন। পক্ষদ্বয় তা মেনে নেয়। সাক্ষীদের স্বাক্ষর হয়ে যায়। দেখুন! এখানে পক্ষদ্বয় নিজে এটি পাঠ করেননি; বরং প্রয়োজনের সময় বিচারকের আদালতে সাক্ষী দিয়ে থাকেন, আর আদালত তা নির্ভরযোগ্য সাব্যস্ত করে থাকেন। আর এটা স্বীকৃত যে, সাক্ষ্যের বিষয় সংবাদদানের তুলনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ। হাদীস বর্ণনা সংবাদদানের অন্তর্ভুক্ত। কাজেই যেহেতু আদালতী ফয়সালাগুলোতে এ প্রকার স্বীকারোক্তি সহীহ এবং নির্ভরযোগ্য হয়, তাহলে রেওয়ায়েতের ক্ষেত্রে আরো উত্তমরূপে নির্ভরযোগ্য হওয়া উচিত।
ويُقْرِئ علي المُقْرِي الخ : এখানে مُقرِي দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কুরআন শিক্ষাদাতা, ওস্তাদজী।
ইমাম মালিক (র.) এর দ্বিতীয় দলীল হল, قاري তথা ছাত্র مُقرِي তথা ওস্তাদকে পড়ে শোনায়, ওস্তাদ নিজে পড়েন না, শুধুমাত্র শুনেই সত্যায়ন করে দেন। কিন্তু ছাত্র বলে যে, অমুক আমাকে কুরআন পড়িয়েছেন, অথচ সে নিজে ওস্তাদকে পড়ে শুনিয়েছে। ঠিক তদ্রƒপ দৃষ্টান্ত হলো قراءة علي الشيخ في الحديث-এর। ইমাম মালিক (র.)কে কেউ যদি বলত যে, হযরত আপনি পড়ে শুনান, তখন তিনি রাগান্বিত হয়ে যেতেন এবং বলতেন তোমাদেরকে কেউ যদি কুরআন পড়ে শোনায় তাহলে তোমার তা বিশ্বাস কর, তাহলে হাদীস বিশ্বাস করনা কেন?: উমদাতুল কারী, ফতহুল বারী
অবশ্য কখনো কখনো নিজেও পড়ে শুনাতেন। যেমন ইমাম মুহাম্মদ (র.) কে তিনি পাঁচশত হাদীস শুনিয়েছিলেন। এটি কেবলমাত্র তার বৈশিষ্ট্য। অন্য কাউকে তিনি পড়ে শুনাননি।
এর দ্বারা বুঝা গেল যে, ইমাম মালিক (র.)-এর মতে قراءة علي الشيخ ও قراءة الشيخ উভয়ই বৈধ ও বিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে সমপর্যায়ের। অন্যথায় ইমাম মালিক (র.)-এর নিকট ছাত্র কর্তৃক ওস্তাদের সম্মুখে পাঠ উত্তম। যা ইমাম আজম আবু হানিফা (র.)-এর মাযহাবও এটিই।
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ حَدَّثَنَا اللَّيْثُ، عَنْ سَعِيدٍ ـ هُوَ الْمَقْبُرِيُّ ـ عَنْ شَرِيكِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي نَمِرٍ، أَنَّهُ سَمِعَ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ، يَقُولُ بَيْنَمَا نَحْنُ جُلُوسٌ مَعَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فِي الْمَسْجِدِ، دَخَلَ رَجُلٌ عَلَى جَمَلٍ فَأَنَاخَهُ فِي الْمَسْجِدِ، ثُمَّ عَقَلَهُ، ثُمَّ قَالَ لَهُمْ أَيُّكُمْ مُحَمَّدٌ وَالنَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم مُتَّكِئٌ بَيْنَ ظَهْرَانَيْهِمْ. فَقُلْنَا هَذَا الرَّجُلُ الأَبْيَضُ الْمُتَّكِئُ. فَقَالَ لَهُ الرَّجُلُ ابْنَ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَقَالَ لَهُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم " قَدْ أَجَبْتُكَ ". فَقَالَ الرَّجُلُ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم إِنِّي سَائِلُكَ فَمُشَدِّدٌ عَلَيْكَ فِي الْمَسْأَلَةِ فَلاَ تَجِدْ عَلَىَّ فِي نَفْسِكَ. فَقَالَ " سَلْ عَمَّا بَدَا لَكَ ". فَقَالَ أَسْأَلُكَ بِرَبِّكَ وَرَبِّ مَنْ قَبْلَكَ، آللَّهُ أَرْسَلَكَ إِلَى النَّاسِ كُلِّهِمْ فَقَالَ " اللَّهُمَّ نَعَمْ ". قَالَ أَنْشُدُكَ بِاللَّهِ، آللَّهُ أَمَرَكَ أَنْ نُصَلِّيَ الصَّلَوَاتِ الْخَمْسَ فِي الْيَوْمِ وَاللَّيْلَةِ قَالَ " اللَّهُمَّ نَعَمْ ". قَالَ أَنْشُدُكَ بِاللَّهِ، آللَّهُ أَمَرَكَ أَنْ نَصُومَ هَذَا الشَّهْرَ مِنَ السَّنَةِ قَالَ " اللَّهُمَّ نَعَمْ ". قَالَ أَنْشُدُكَ بِاللَّهِ، آللَّهُ أَمَرَكَ أَنْ تَأْخُذَ هَذِهِ الصَّدَقَةَ مِنْ أَغْنِيَائِنَا فَتَقْسِمَهَا عَلَى فُقَرَائِنَا فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم " اللَّهُمَّ نَعَمْ ". فَقَالَ الرَّجُلُ آمَنْتُ بِمَا جِئْتَ بِهِ، وَأَنَا رَسُولُ مَنْ وَرَائِي مِنْ قَوْمِي، وَأَنَا ضِمَامُ بْنُ ثَعْلَبَةَ أَخُو بَنِي سَعْدِ بْنِ بَكْرٍ
অনুবাদ : হযরত আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) বলেছেন, আমরা আল্লাহর নবী (সাঃ)-এর সাথে মসজিদে বসেছিলাম এমন সময় এক ব্যক্তি উটে চড়ে এলো। সে উটটিকে মসজিদের আঙ্গিনায় বসিয়ে তার হাঁটু বাঁধলো। এরপর সে প্রশ্ন করলো, তোমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ কে? তখন আল্লাহর নবী (সাঃ) সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে হেলান দিয়ে বসেছিলেন। আমরা বললাম, এই যে হেলান দিয়ে বসা সাদা মানুষটি। লোকটি তাঁকে বললো, হে আব্দুল মুত্তালিবের পুত্র (বংশধর)! আল্লাহর নবী (সাঃ) তাকে বললেন, বলো, আমি তোমার কথা শুনছি। লোকটি তাঁকে বললো, আমি আপনাকে প্রশ্ন করবো এবং প্রশ্নের ব্যাপারে আমি আপনার প্রতি কঠোর হবো। আপনি আমার ব্যাপারে কিছু মনে করবেন না। তিনি বললেন, তোমার যা ইচ্ছা প্রশ্ন করো। সে বললো, আমি আপনাকে আপনার এবং আপনার পূর্ববর্তী নবীগণের শপথ দিয়ে প্রশ্ন করছি, আল্লাহ কি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন? তিনি বললেন, আল্লাহ সাক্ষী, হ্যাঁ। সে বললো, আমি আপনাকে আল্লাহর শপথ দিচ্ছি, আল্লাহ কি আপনাকে দিন রাতে পাঁচবার নামায আদায় করতে আদেশ দিয়েছেন? তিনি বললেন, আল্লাহ সাক্ষী, হ্যাঁ। সে বললো, আমি আপনাকে আল্লাহর শপথ দিচ্ছি, আল্লাহ কি আপনাকে বছরের এই মাসে রোযা পালন করার নির্দেশ দিয়েছেন? তিনি বললেন, আল্লাহ সাক্ষী, হ্যাঁ। সে বললো, আমি আপনাকে আল্লাহর শপথ দিচ্ছি, আল্লাহ কি আপনাকে আমাদের ধনাঢ্যদের কাছ থেকে এই সাদকা (যাকাত) আদায় করে আমাদের দ্ররিদ্রদের মধ্যে ভাগ করে দেবার নির্দেশ দিয়েছেন? আল্লাহর নবী (সাঃ) বললেন, আল্লাহ সাক্ষী, হ্যাঁ। এরপর লোকটি বললো, আপনি যা নিয়ে এসেছেন আমি তাতে ইমান আনলাম। আমি আমার জাতির অন্যান্য লোকজনের পক্ষ থেকে এসেছি। আমি যিমাম ইবনে সা'লাবা, সা'দ ইবনে বকর গোত্রের ভাই।
حدثنا موسي ابن اسماعيل قال ثنا سليمان بن المغيرة قال ثنا ثابت عن انس قال نهينا في القران ان نسأل النبي صلي الله عليه وسلم وكان يعجبنا الخ
হাদীস নং ৬৪: হযরত আনাস (রাঃ) বলেছেন, আল্লাহর নবী (সাঃ)-কে প্রশ্ন করার ব্যাপারে কোরআনে আমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে। তাই কোনো বুদ্ধিমান গ্রাম্য লোক এসে তাঁকে প্রশ্ন করতে থাকলে আমরা তা শুনে অবাক হতাম। পরে একজন গ্রাম্য লোক এলো। আল্লাহর রাসূল (সাঃ)-কে বললো, আপনার প্রেরিত দূত আমাদের কাছে এসে জানালো যে, আপনি নাকি মনে করেন যে, সর্বশক্তিমান আল্লাহ আপানাকে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন? তিনি বললেন, সে সত্যই বলেছে। সে প্রশ্ন করলো, আকাশ সৃষ্টি করেছেন কে? তিনি বললেন, সর্বশক্তিমান আল্লাহ। সে প্রশ্ন করলো, পৃথিবী ও পাহাড় সৃষ্টি করেছেন কে? তিনি বললেন, সর্বশক্তিমান আল্লাহ। সে প্রশ করলো, সেখানে নানা ধরনের ভোগেরম জিনিস তৈরী করেছেন কে? তিনি বললেন, সর্বশক্তিমান আল্লাহ। সে বললো, যিনি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করে পাহাড়গুলোকে স্থাপন করেছেন এবং পৃথিবীতে নানা ধরনের ভোগের জিনিস দিয়েছেন, তাঁর শপথ দিয়ে প্রশ্ন করছি, আল্লাহ সত্যিই কি আপনাকে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। সে বললো, আপনার প্রেরিত দূত জানিয়েছে যে, আমাদের প্রতি পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করা এবং আমাদের ধন-সম্পদের যাকাত দেয়া ফরয। তিনি বললেন, সে সত্য বলেছে। সে বললো, যিনি আপনাকে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ দিয়ে প্রশ্ন করছি, আল্লাহ কি আপনাকে এসবের আদেশ দিয়েছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। সে বললো, আপনার প্রেরিত দূত জানিয়েছে যে, আমাদের প্রতি বছরে এক মাস রোযা রাখা ফরয। তিনি বললেন, সে সত্য বলেছে। সে বললো, যিনি আপনাকে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ দিয়ে প্রশ্ন করছি, আপনাকে আল্লাহ কি এর আদেশ দিয়েছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। সে বললো আপনার প্রেরিত দূত বলেছে যে, আমাদের কারো সামর্থ হলে কা'বা ঘরের হজ্জ আদায় করা তার প্রতি ফরয। তিনি বললেন, সে সত্য বলেছে। সে বললো, যিনি আপনাকে রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন তার শপথ দিয়ে প্রশ্ন করছি, আল্লাহ কি আপনাকে এর আদেশ দিয়েছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। সে বললো, যিনি আপনাকে সত্য সহকারে প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ করে বলছি, আমি এসব নিদের্শের সাথে আর কোনো কিছু হ্রাস-বৃদ্ধি করবো না। তখন রাসূল (সাঃ) বললেন, এ ব্যক্তি সত্য বলে থাকলে অবশ্যই সে জান্নাতে যাবে।
শিরোনামের সাথে সামঞ্জস্য: হযরত যিমাম ইবনে ছা’লাবার হাদীসদ্বয় শিরোনামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ হযরত যিমাম (রা.) হুযুর (স.)-এর দূত থেকে অবহিত বিষয়গুলি রাসূল (স.)-এর সম্মুখে পেশ করেছেন, এবং হুযুর (স.) তার সত্যায়ন করেছেন। অতঃপর যিমাম ইবনে ছা’লাবা তার স¤প্রদায়ের নিকট ফিরে গিয়ে এসব কথার পৌঁছানোর পর তারা সকলে ইমান গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে যায়। এর দ্বারা বুঝা গেল যে, ওস্তাদের পড়া আবশ্যক নয়; বরং এটাও গ্রহণযোগ্য যে, ছাত্র পড়বে আর ওস্তাদ শুনে তা সত্যায়ন করে দিবে। এ দ্বারা قراءة علي الشيخ ও عرض علي المحدث প্রমাণিত হয়ে গেল।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ :
نحن جُلوس : جُلوس শব্দটি جالس-এর বহুবচন, যেমন راكع শব্দটির বহুবচন ركوع ; نحن হলো মুবতাদা, আর جلوس তার খবর।
دخل رجل : رجل দ্বারা যিমাম ইবনে ছা’লাবা উদ্দেশ্য। যেমন এ হাদীসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে যে, আগন্তুক লোকটি বলেছিল انا ضمام ابن ثعلبة
فاناخه في المسجد : [অতঃপর তিনি উটটিকে মসজিদের মধ্যে বাঁধলেন] এর দ্বারা ইবনে বাত্তাল (র.) প্রমুখ যে সমস্ত প্রাণীর গোশত খাওয়া হালাল তাদের প্রসাব-পায়খানা পবিত্র হওয়ার পক্ষে দলীল প্রদান করেন। কারণ, মসজিদে উট বসলে ধরে নিতে হবে তা সেখানে প্রস্রাব করেছে। এতদসত্তেও হুযুর (স.) তাকে সেখানে উট বাঁধতে নিষেধ করেননি; বরং নীরবতা অবলম্বন করেছেন। যা প্রমাণ করে যে, উটের প্রস্রাব পবিত্র।
উত্তর : আমরা বলি যে, তাদের এ দলীল গ্রহণযোগ্য ও সঠিক নয়। কারণ এখানে শুধুমাত্র সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে যে, হয়ত উট প্রস্রাব করে থাকতে পারে। মূলত প্রস্রাব-পায়খানা করা প্রমাণিত নয়। এখানে লক্ষণীয় বিষয় যে, নবী করীম (স.) যিনি মসজিদের ভিতর থুথু পর্যন্ত বরদাশত করতে পারেননি, এবং ক্রোধে চেহারা বিকৃত হয়ে যেত, সেই পবিত্র সত্তার ব্যাপারে কি ভাবে ধারণা করা যায় যে, তিনি মসজিদে উট প্রবেশ করানো ও তাকে সেখানে বসিয়ে রাখা কিভাবে বরদাশত করবেন? এটি যৌক্তিক বিষয় নয় যে, মসজিদে উট বসানো হয়েছে। বর্ণনাকারী মসজিদের নিকটকে (আঙ্গিনাকে) মসজিদ বলে ব্যক্ত করে দিয়েছেন। যেমনটি হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। মুসনাদে আহমদের একটি রেওয়ায়েতে রয়েছে فاناخ بعيره علي باب المسجد فعقله ثم دخل الخ তিনি উটটিকে মসজিদের গেটে বসিয়ে দিল, অতঃপর মসজিদে প্রবেশ করেন।
হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (র.) বলেন, فعلي هذا في رواية انس مجاز الحذف والتقدير فاناخه في ساحة المسجد او نحو ذلك অর্থাৎ এ রেওয়ায়েতে শব্দ উহ্য রয়েছে, মূলত হবে তিনি মসজিদের আঙ্গিনায় উটটিকে বেঁধেছিলেন। এ দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, في المسجد দ্বারা উদ্দেশ্য হলো علي باب المسجد অথবা في ساحة المسجد মসজিদের গেট বা মসজিদের আঙ্গিনায় বেঁধেছিলেন।
ثم قال لهم ايكم محمد الخ : নবী করীম (স.) একদিন সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে হেলান দিয়ে বসা ছিলেন, এমতাবস্থায় একজন লোক মসজিদে প্রবেশ করে উপস্থিত লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে মুহাম্মদ (স.) কে? আমরা বললাম, এই যে হেলান দিয়ে বসা সাদা মানুষটি।
بَيْنَ ظَهْرَانَيْهِم : ظَهْرَانَيْهِم-এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো المشرب بخمرة (قس) মূলত ظهر-এর দ্বিবচন হলো ظهران; এরপর ظهران-কে মুফরাদের হুকুমে সাব্যস্ত করে দ্বিবচনের আলামত তার সাথে যুক্ত করা হয়েছে। এভাবে ظهرانين হয়েছে। এবার যমীরের দিকে ইযাফতের কারণে নূন ফেলে দেওয়া হয়েছে। এটা তখন বলা হয় যখন লোকসংখ্যা অধিক হয় এবং একে অপরের দিকে পিঠ করে থাকে।
প্রশ্ন : কুরআনে আছে لا تجعلوا دعاء الرسول بينكم كدعاء بعضكم بعضا এ আয়াতের তাফসীর এটাও করা হয়েছে যে, যখন রাসূলে আকরাম (স.)কে কোনো প্রয়োজনে ডাকার বা সম্বোধন করার প্রয়োজন হয়, তখন সাধারণ লোকদের ন্যায় নাম নিয়ে يا محمد বলে ডেকোনা। এ ধরনের করা আদব ও শিষ্টাচার পরিপন্থি। এর দ্বারা বুঝা গেল যে, যিমাম ইবনে ছা’লাবার এ সম্বোধন আদব ও শিষ্টাচার পরিপন্থি, যা জায়েয নয়। তাহলে তিনি এরূপ করলেন কেন?
উত্তর : মুহাদ্দিসীনে কেরাম এর অনেকগুলি উত্তর দিয়েছেন।
যিমাম ইবনে ছা’লাবা তখন পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেননি। যদি তাই হয় তাহলে তো উত্তরের কোনো প্রয়োজনই নেই। কিন্তু ইমাম বুখারী, কাজী ইয়ায ও হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (র.)প্রমুখের পছন্দনীয় উক্তি হলো তিনি মুসলমান হয়ে এসেছিলেন। একারণেই তো ইমাম বুখারী (র.) এর উপর ভিত্তি করে শিরোনাম কায়েম করেছিলেন। আবু সাঈদ হাদ্দাদ ও হুমাইদী (র.) এর উপর ভিত্তি করেই যিমাম ইবনে ছা’লাবার রেওয়ায়েত দ্বারা প্রমাণ পেশ করেছিলেন। কারণ কাফিরের কিরাত সর্বসম্মতিক্রমে ধর্তব্য নয়। তখন সম্বোধনে বে-আদবীমূলক আচরণের জবাব হলো
তিনি নবমুসলিম ছিলেন, তখনও ইসলামি রীতি-নীতি ও বিধিবিধান জানা ছিল না। তাছাড়া তিনি ছিলেন গ্রাম্য লোক, আদব-আখলাক, শিষ্টাচার ও সৌজন্যতা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না। তাঁর মুসলমান হওয়ার সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো তার প্রশ্নের ধরণ, কারণ তিনি তাওহীদ ও একত্ববাদ সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করেননি, আর না তো হুযুর (স.)-এর নিকট মুজিযা তলব করেছেন; বরং পূর্ণ প্রশ্নগুলো ছিল ব্যাপকভাবে রিসালাত ও ইসলামী আহকাম সংক্রান্ত।
এটা ছিল এ ধরনের সম্বোধন করার নিষেধাজ্ঞার পূর্বের ঘটনা।
অথবা বিধানটি তার নিকট পৌঁছেনি।
هذ الرجل الابيض : এখানে সাদা দ্বারা ধবধবে সাদা উদ্দেশ্য নয়; হুযুর (স.)-এর শরীরের রং সম্পর্কে শামায়েলে তিরমিযীর রেওয়ায়েত হল :لا بالابيض الامهق ولا بالادم প্রিয়নবী (স.) চুনার মত একদম শ্বেতশুভ্র ছিলেন না, আবার একদম গোধুমী রং-এরও ছিলেন না; বরং লালমিশ্রিত ফর্সা ও সুন্দর ছিলেন। কিন্তু যেহেতু শ্রভ্রতা প্রবল ছিল, তাই ابيض দ্বারা ব্যক্ত করা হয়েছে।
يا ابن عبد المطلب : এ সম্বোধন আদব ও সম্মান প্রদর্শনের পরিপন্থি নয়। কারণ, আব্দুল মুত্তালিব আরবের প্রসিদ্ধ নেতা ছিলেন। এই সুখ্যাতির ভিত্তিতে হুনাইনের যুদ্ধে তিনি নিজেই কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন:
انا النبي لا كذب – انا ابن عبد المطلب
আমি নবী, আর নবী কখনো যুদ্ধে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেন না, পার্থিব দৃষ্টিকোণ থেকেও আমি আরবের প্রসিদ্ধ নেতার সন্তান।
قد اجبتك : আমি তোমার উত্তর দিয়েছি, অর্থাৎ আমি পরিপূর্ণ প্রস্তুত আছি। যেন উত্তর দিয়ে দিয়েছি। অকৃত্রিমভাবে জিজ্ঞেস করুন। অথবা বলা যায় যে, اجبتُ অর্থ হলো سمعتُ আমি তোমার কথা শুনেছি। (সুতরাং কি বলবে বল?)
امنت بما جئت به : যিমাম ইবনে ছালাবা বলতে লাগলেন, যে বিধান আপন (আল্লাহর নিকট হতে) নিয়ে এসেছেন আমি তার উপর ইমান এনেছি। অর্থাৎ এটি হলো ইতোপূর্বেই ইমান আনার সংবাদ। এটিই হলেঅ ইমাম বুখারী, ইমাম আওযায়ী, কাজী ইয়ায পছন্দনীয় কওল।
কিন্তু আল্লামা কুরতুবী প্রমুখ বলেন: آمنتُ হলো ইমানের انشاء সুতরাং এমতাবস্থায় امنتُ কে নতুন ইমানের উপর প্রয়োগ করতে হবে।
انا ضمام بن ثعلبة : ضمام (ض বর্ণে যের, আর - ثعلبة ث বর্ণে যবরযোগে)
اخو بني سعد بن بكر : বনু সাদের এ বংশ হলো হাওয়াযেন গোত্রের একটি শাখা। হুযুর (সা.)-এর দুধমাতা হালীমা সা’দিয়া (রা.) এ গোত্রেরই লোক ছিলেন। সম্ভবত এ পরিচয়দানের দ্বারা তার উদ্দেশ্য ছিল নবী করীম (সা.)-এর সাথে নৈকট্যতা প্রকাশ করা যে, আপনার আমাদের অধিকার আছে।
প্রশ্ন : এ হাদীসে হজের কথা উলেখ করা হলো না কেন?
উত্তর : এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায় যে:
১. কেউ কেউ বলেন, তখনো হজ ফরজ হয়নি। কারণ ওয়াকেদীর বর্ণনামতে যিমাম ইবনে ছা’লাবার আগমন হয়েছিল ৫ম হিজরীতে, আর হজ ফরজ হয়েছিল তারও পরে। তবে এ উত্তরটি সঠিক নয়।
২. মূলত তখন হজ ফরজ হয়েছিল, এবং হজের কথা উলেখও করা হয়েছিল, কিন্তু এখানে সংক্ষিপ্ত করার কারণে হজের উলেখ করা হয়নি। যেমন বুখারী শরীফেই এর পরের হাদীসটি এবং মুসলিম শরীফের হাদীসে স্পষ্টভাবে হজের কথা উলেখ রয়েছে।
যদিও মুসা ইবনে ইসমাঈল এর হাদীসটি আমাদের দেশীয় তথা ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে প্রচলিত ফিরাবরীর সঙ্কলনগুলোতেই বিদ্যমান, সউদী আরবসহ অন্যান্য দেশের সঙ্কলনসমূহে এ হাদীসটি নেই। তাই তো উমদাতুল কারী, ফতহুলবারী, ইরশাদুস্সারী ইত্যাদিতেও হাদীসটি খুঁজে পাওয়া যাবে না। এবং সেই হিসেবেই এ হাদীসের শেষে رواه موسي ابن اسماعيل -এর সূত্রে বর্ণিত হাদীসটিকে تعليقস্বরূপ বর্ণণা করে দিয়েছেন, বর্ণিত হাদীসটির শক্তি বৃদ্ধির জন্য।
কিন্তু যেহেতু আমাদের দেশীয় সঙ্কলনগুলোতে তালীকে বর্ণিত হাদীসটি সরাসরি উলেখ রয়েছে, তাই رواه موسي ابن اسماعيل الخ ইবারতটি সঠিক হবে না। লিপিকার দুটি কপিকে একত্র করে দিয়েছেন।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হাদীস নং ৬২ : এ হাদীসেও যিমাম ইবনে ছা’লাবার ঘটনাই বর্ণিত হয়েছে। আর এ হাদীসটি (অর্থাৎ মুসা ইবনে ইসমাইলের হাদীসটি) শুধুমাত্র ফেরাবরীর সংকলন যা কেবলমাত্র ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে প্রচলিত সংকলনেই রয়েছে। সউদি আরবসহ অন্যান্য দেশের প্রচলিত সঙ্কলনে এমনকি উমতাদুল কারী, ফতহুল বারী ইত্যাদিতেও নেই। তবে আল্লামা ফেরাবরী (র.) যেহেতু ইমাম বুখারী (র.)-এর প্রত্যক্ষ ছাত্র, এবং তিনি ইমাম বুখারীর নিকট বুখারী শরীফ দুই বা মতান্তরে তিনবার পড়েছেন। তাই তার রচিত সঙ্কলনটিই অধিক প্রসিদ্ধ ও প্রচলিত।
نهينا في القران الخ : এখানে যে আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে তা হলো لا تسئلوا عن اشياء ان تبد لكم تسؤكم আর যে নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে তা হলো অনর্থক প্রশ্নাবলী। কিন্তু প্রবাদ রয়েছেمقربان را بيش بود حيراني নৈকট্যপ্রাপ্তদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভুল-ত্রæটিকেও বড় করে দেখা হয়। আর সাহাবায়ে কেরাম হুযুর (স.)কে অত্যধিক ভালবাসতেন। তাই তারা সম্পূর্ণরূপে প্রশ্ন করা থেকে বিরত ও সংযত হয়ে যান। যাতে এমন না হয় যে, আমরা কোনো প্রশ্ন করলে সটা ভর্ৎসনা ও আযাবের কারণ হয়ে দাড়ায়। কিন্তু সাহাবায়ে কিরাম (রা.) মনে প্রাণে চাইতেন যেন কোনো জ্ঞানবান বেদুঈন যদি আসত, যে নিষেধাজ্ঞা ম্পর্কে জ্ঞাত নয় এবং যথার্থ কিছু প্রশ্ন করত! এজন্য হযরত উমর ফারূক (রা. )যিম্মা ইবনে ছা’লাবার প্রশংসা করেছেন:ما رأيت احسن مسئلة ولا اوجز من ضمام ابن ثعلبة যিমাম ইবনে ছা’লাবার ন্যায় এত উত্তম অথচ সংক্ষিপ্ত প্রশ্নকারী আর কাউকে দেখিনি।
কোন মন্তব্য নেই