Header Ads

কিতাবুল ইমানঃ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের বিশ্লেষণ

حدثنا عبيد الله بن موسى قال أخبرنا حنظلة بن أبي سفيان عن عكرمة بن خالد عن ابن عمر رضي الله عنهما قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم بني الإسلام على خمس شهادة أن لا إله إلا الله وأن محمدا رسول الله وإقام الصلاة وإيتاء الزكاة والحج وصوم رمضان

অনুবাদ : হযরত ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর স্থাপিত। এই সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। নামায আদায় করা। যাকাত আদায় করা। হজ্জ আদায় করা এবং রমজানের রোজা পালন করা।

হাদীসের পুনরাবৃত্তি : এ হাদীসটি ইমাম বুখারী এখানে পৃষ্ঠা নং ৬ এবং কিতাবুত্তাফসীরে ৬৪৮ পৃষ্ঠায় হাদীস নং ৪১ বর্ণনা করেছেন। এবং এ হাদীসটি ইমাম মুসলিম প্রমুখও বর্ণনা করেছেন।

শিরোনামের সাথে সামঞ্জস্য : শিরোনামের সাথে হাদীসটির সুন্দর মিল রয়েছে। কারণ, এ হাদীসটিই হুবহু শিরোনাম।

 

রাবী পরিচিতি : এ হাদীসের রাবী হলেন চারজন:

উবাইদুল্লাহ ইবনে মূসা : ইস্কান্দারিয়ায় ২১৩ মতান্তরে ২১৪ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন।

হানযালা ইবনে আবু সুফিয়ান: তিনি হলেন কারশী এবং মাক্কী। সাফওয়ান বিন উমাইয়ার বংশধরদেও একজন। মৃত্যু : ১৫১ হিজরিতে তিনি পরলোকগমন করেন।

ইকরামা ইবনে খালেদ  ইবনে আসী : তিনি হযরত আতা (র.)-এর পরে ইন্তেকাল করেন। আর হযরত আতা (র.) ইন্তেকাল করেন ১৪ বা ১৫ সনে।

সতর্কীকরণ: ইকরিকা বিন খালিদ বিন আল আসীর স্তরে ইকরিমা বিন খালিদ বিন সালমা বিন হিশাম মাখযূমীও একজন। যিনি দুর্বল রাবী। বুখারী শরীফে তার রেওয়ায়েত নেই। আর না ইবনে ওমর (রা.) থেকে তার রেওয়ায়েত আছে।

ইবনে উমর (রা.) : তিনি তৃতীয় খলীফা হযরত উমর (রা.)-এর পুত্র এবং উ¤মূল মুমিনীন হযরত হাফসা (রা.)-এর সহোদর। তার মাতার নাম জয়নব বিনতে মাযঊন।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) ছিলেন প্রথম পর্যায়ের ইসলামগ্রহণকারী সাহাবী। তাঁর পিতা হযরত উমর  (রা.)-এর সাথে মক্কায় অবস্থানকালে শৈশবেই তিনি ইসলাম গ্রহণে ধন্য হন, এবং পিতার সাথেই হিজরতও করেন।

কারো কারো ধারণা যে, ইবনে উমর পিতার পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ এবং হিজরতও করেছিলেন। কিন্তু এটি সঠিক নয়। কেননা আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের শিষ্য হযরত নাফেএ উক্তিকে খণ্ডন করে দিয়েছেন। বয়স কম হওয়ার কারণে বদর ও উহদ যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করতে পারেন নি। উহদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তখনও তার বয়স পনর বছর পূর্ণ না হওয়ায় তাকে ফেরত  দেওয়া হয়েছিল। এরপর সকল যুদ্ধেই তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। উমদাতুল কারীতে রয়েছে:وهـو اكـثر الـصـحـابـة روايـة بـعـد ابـي هـريـرة  তিনি হলেন হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর পরে সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী। তাঁর থেকে ২৬৩০টি হাদীস বর্ণিত আছে। তন্মধ্যে বুখারী ও মুসলিমে যৌথভাবে ১৭০টি এবং এককভাবে বুখারীতে ৮১টি এবং মুসলিমে ৩১টি। (উমদাতুল কারী)

মৃত্যু : আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান হাজ্জাজ বিন ইউসূফকে কড়া ভাষায় নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন হজের বিষয়ে ইবনে উমরের বিরোধিতা করা না হয়। এ বিষয়টি হাজ্জাজের খুব খারাপ লাগে। যখন আরাফার ময়দান থেকে লোকজন প্রত্যাবর্তন করল, তখন হাজ্জাজের ইঙ্গিতে এক ব্যক্তি বিষমিশ্রিত বর্শা তার পায়ে বিদ্ধ করে দেয়। যার ফলে কয়েকদিন অসুস্থ থাকার পর ৭৩ হিজরিতে তিনি শাহাদতবরণ করেন।

হাদীসের ব্যাখ্যা : এ হাদীসটি একটি উপমামূলক হাদীস। অত্র হাদীসে ইসলামকে একটি তাঁবুর সাথে তুলনা দেওয়া হয়েছে। একটি তাঁবুর পাঁচটি খুঁটি থাকে। একটি মাঝখানে যা,  অপেক্ষাকৃত বড়, শক্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ থাকে। আর চার কোণে চারটি। সুতরাং যেমনিভাবে তাঁবুর মূল ভিত্তি হলো মাঝের খুঁটি। যার পূর্ণতার জন্য (অর্থাৎ বিস্তৃতি প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য) চারদিকে খুঁটি গেঁড়ে রশি দ্বারা বাঁধা হয়। এভাবে একটি তাঁবু পুর্ণ হয়ে যায়।

এতে মাঝের খুঁটি না থাকলে অন্যান্য খুঁটি অবশিষ্ট থাকাসত্তেও তাঁবু স্থির থাকবে না। একই অবস্থা ইসলামের পাঁচটি বিষয়ের।

অনুরূপভাবে ইসলামও পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। তন্মধ্যে মাঝের স্তম্ভ হচ্ছে:কালিমা, তাওহীদ ও রেসালাত যার উপর ইসলামের তাঁবু দণ্ডায়মান। অপর চারটি স্তম্ভ হচ্ছে নামাজ কায়েম করা, জাকাত প্রদান করা, হজ করা এবং রমজান মাসে রোজা রাখা এগুলি হলো তাঁবুর অন্যান্য স্তম্ভসদৃশ।  যদি নামাজ কায়েম করা, জাকাত প্রদান করা, হজ করা এবং রমজান মাসে রোজা রাখা, এ স্তম্ভ চতুষ্টয়ের কোনো একটি না পাওয়া যায়, তাহলেও তাকে মুসলমান বলা হবে; কিন্তু অসম্পূর্ণ মসলমান। আর যদি কালিমা, তাওহীদ ও রেসালাত নামক স্তম্ভটি না পাওয়া যায়, তাহলে তাকে মুসলমানই বলা যাবে না। অন্যান্য চারটি স্তম্ভ বিদ্যমান থাকলেও এগুলো কোনো কাজে আসবে না। যেমন : তাঁবুর মাঝের খুঁটি না থাকলে একে তাঁবু বলা যায় না এবং এটি কোনো কাজে আসে না।

 

প্রশ্ন : ইসলামের রোকনসমূহ তো আরো আছে। এখানে শুধুমাত্র পাঁচটির মধ্যে সীমাবদ্ধ করার কারণ কি?

উত্তর :

১.     এ পাঁচটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ করা উদ্দেশ্য নয়; বরং প্রসিদ্ধতম কয়েকটির কথা উলে­খ করা হয়েছে।

২.     ইসলামের রোকনসমূহের বিভিন্ন প্রকার রয়েছে। তন্মধ্যে প্রত্যেক প্রকারের একটি করে উলে­খ করা হয়েছে। যেমন আহকাম হয়ত তা আকিদা সম্পর্কিত হবে বা আমল সম্পর্কিত হবে। আকিদাগত বিষয়সমূহ থেকে শাহাদাতাইন বা কালিমার কথা উলে­খ করা হয়েছে। আবার আমল দুই প্রকার। ক. করণীয়, খ. বর্জনীয়। সুতরাং বর্জনীয়গুলোর মধ্য থেকে রোজার কথা উলে­খ করা হয়েছে। করনীয় আমল আবার তিন প্রকার। শুধুমাত্র দৈহিক, শুধুমাত্র আর্থিক, দৈহিক ও আর্থিক উভয়ের সমন্বয়ে। সুতরাং শুধুমাত্র দৈহিকগুলো থেকে নামাজ, শুধুমাত্র আর্থিকগুলো থেকে জাকাত এবং দৈহিক ও আর্থিকের সমন্বয়ে গঠিতগুলোর মধ্য থেকে হজের কথা উলে­খ করা হয়েছে।

 

হাদীসের শব্দরাজি আগে-পরে হওয়া প্রসঙ্গে আলোচনা : হাদীস শরীফে ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের আলোচনার ধারাবাহিকতায় কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। বুখারীর এ রেওয়ায়েতে ইবনে উমর থেকে হানযালার সূত্রে হাদীস রয়েছে যাতে حـج কে صـوم -এর আগে উলে­খ করা হয়েছে। ইমাম বুখারী এ রেওয়ায়েতের উপর নির্ভরও করেছেন। তাই তিনি সহীহ বুখারীতে কিতাবুল হজকে আগে, আর কিতাবুসসাওমকে পরে উলে­খ করেছেন।

মুসলিমের রেওয়ায়েতে এসেছে, যখন ইবনে উমর (রা.) صـومُ رَمَـضـانَ والـحـج বলেছেন, তখন তাঁরই এক ছাত্র (ইয়াযিদ ইবনে বিশ্র আস-সাকী) এ রেওয়ায়েতটি ইবনে উমর (রা.)-এর অন্য একটি সূত্র থেকে শুনে এভাবে বর্ণনা করেছেন:الـحـج و صَـومُ رمَـضَـانَ যেমন বুখারীর রেওয়েতে রয়েছে। তখন ইবনে উমর (রা.) তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন:لا صِـيَـامُ رَمَـضَـان والـحـج هـكـذا سـمـعـت مـن رسُـول الـلـه صـلـي الـلـه عـلـيـه وسـلـم এর দ্বারা বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেল যে, হুযুর (স.)-এর  শব্দের আসল বিন্যাস হলো:صِـيـامُ رمـضـانَ والـحـج নতুবা ইবনে উমর (রা.) এর বিপরীত পদ্ধতিকে প্রত্যাখ্যান করে এভাবে বলতেন না যে:هـكـذا سـمـعـت مـن رسـول الـلـه الخ  বুঝা গেল যে, বুখারীর এ রেওয়ায়েতটি হলো رِوَايـة بـالـمـعـنـي ; কারণ হয়ত সে ইবনে উমরের প্রত্যাখ্যান সম্পর্কিত হাদীসটি শ্রবণ করেনি, অথবা শুনেছে কিন্তু পরে ভুলে গিয়েছে। আর মুসলিম শরীফের রেওয়ায়েতটি হলো আসলরূপ। কেননা সেখানে হুযুর (স.) থেকে শ্রবণের কথা স্পষ্ট রয়েছে।

সহীহ মুসলিমে ইবনে উমরের সংমোধন করে দেয়ার দ্বারা ইমাম নবভীর উস্তাদ হাফিজ ইবনে সালাহ এটা প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, এখানে واؤটি তারতীবের জন্য এসেছে। ইবনে সালাহের এ দলিলের জবাব স্বয়ং শাফেয়ীদের মধ্য থেকে ইমাম নবভী, হাফিজ আসকালানী প্রমুখ এভাবে দিয়েছেন যে, ইবনে ওমর যা সংশোধন করেছেন তার অর্থ এ নয় যে, এখানে ওয়াওটি তারতীবের জন্য হয়েছে; বরং সংশোধন দ্বারা আসল উদ্দেশ্য ছিল হুযুর (সা.) থেকে শব্দরাজি যেভাবে বর্ণিত হয়েছে তাকে যতদূও সম্ভব ঐরূপই বর্ণনা করার প্রতি গুরুত্বারোপ করা উচিত।

ওয়াও যদিও তারতীবের জন্য আসেনা, কিন্তু বর্ণনার তারতীব রক্ষার ক্ষেত্রে ভাষাবিদদের সাধারণত এবং কুরআন ও হাদীসে বিশেষত কোনো সূ² বিষয় অবশ্যই হয়ে থাকে। যেমন হুযুর (সা.) ان الصفا والمروة من شعائر الله-এর বর্ণনাগত তারতীব ঠিক রাখার বিষয়টি লক্ষ্য রেখে সাফা থেকে সায়ী শুরু করতে বলেছেন। এক্ষেত্রে তিনি বলেন: نبدأ بما بدأ الله به ان الصفا والمروة من شعائر الله

 

হাদীসে صـوم কে حـج -এর পূর্বে উলে­খ করার হেকমত হাফিজ ইবনে হাজর এটা বর্ণনা করেছেন যে, صـوم ২য় হিজরিতে ফরজ হয়েছে। আর حـج ফরজ হয়েছে ৬ষ্ঠ বা মতান্তরে ৯বম হিজরিতে।  রোজা যেহেতু ফরজ হয়েছে আগে তাই আগে উলে­খ করা হয়েছে।

তাছাড়া রোজা পালনকারী হলো প্রত্যেক জ্ঞানবান ও বালেগ ব্যক্তি, যাদের সংখ্যা অধিক, পক্ষান্তরে হজ পালনকারীর সংখ্যা তার তুলনায় কম। তাই যাদের সংখ্যা অধিক তার কথা আগে র্বণনা করা হয়েছে।

অথবা বলা যায় যে, হজ জীবনে একবার ফরজ হয়। আর রোজা প্রতি বৎসর ফরজ হয়। তাই যা অধিকবার পালন করতে হয় তার আলোচানা আগে আনা হয়েছে।

ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের  বিশ্লেষণ:

এ আমল ও ইবাদত  দুপ্রকার। একটির সম্পর্ক আল্লাহ তাআলার শাসকসুলভ শানের সাথে, কারণ তিনি হলেন শাসক আর আমরা হলাম শাসিত।

আর দ্বিতীয় প্রকারের সম্পর্ক হলো প্রেম ও ভালবাসার আন্তরিক প্রেরণার সাথে। ভিন্নভাবে বলা যায় কিছু ইবাদত শানে জালালীর বহিঃপ্রকাশে করা হয়, আর কিছু করা হয় শানে জামালীর বহিঃপ্রকাশে।

নামাজ ও জাকাত হলো শাসকসুলভ শানের বহিঃপ্রকাশ, যার দ্বারা আল্লাহর  জালালের বহিঃপ্রকাশ হয়ে থাকে।  যেমন, আজান হলো শাহী দরবার খোলার ঘন্টাধ্বনিস্বরূপ, শাহী দরবারে উপস্থিতির জন্য শরীর ও পোশাক-পরিচ্ছদের পরিচ্ছন্নতার প্রতি বিশেষ যতœবান হতে হয়, এবং উত্তম পোশাক পরিধান করা হয়। নামাজেও তার বিধান রয়েছে। যেমন:خُـذُوا زِينَتَـكُـم عِنْدَ كُـل مَـسْـجِـد ; রাজ দরবারের দিকে দৌড়ে নয়; বরং গাম্ভীর্যের সাথে যেতে হয়। শাসকের বিশেষ মজলিসে হাজির হওয়ার পূর্বে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। সুতরাং নামাজের মধ্যেও সঙ্গত এটাই যে, নামাজ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পূর্বে মসজিদে গিয়ে অপেক্ষা করবে। এরপর আল্লাহু আকবার বলে হাতের ইশারায় এ বিশ্বজগতকে পশ্চাতে ফেলে আল্লাহর দরবারে হাজির হতে হয়। এটিই হলো তাকবীরে তাহরিমা। শায়খে আকবর (র.) লিখেছেন হাত উত্তোলন করে বাঁধার পূর্বে কিছুটা হালকা ছেড়ে দিবে, যেন পিছনের দিকে সামান্য ইঙ্গিত হয়ে যায় যে, সমস্ত গায়রুল্লাহকে পশ্চাতে ফেলে দিয়েছে। রাজ দরবারে পৌঁছে সকলে সর্বপ্রথম সালাম/সম্ভাষণ ও আদব রক্ষা করে থাকে। এ কারণেই নির্দেশ রয়েছে নামাজের শুরুতেই ইমাম এবং মুক্তাদি সকলেই ছানা পাঠ করবে। এরপর উপস্থিত সকলের পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি দরখাস্ত পেশ করে থাকে। এ কারণেই ইমাম আবু হানিফা (র.) বলেছেন সূরা ফাতিহা কেবলমাত্র ইমামই পড়বে, কেননা এটি হলো দরখাস্ত, দরখাস্তের বিষয়বস্তুটিও আল্লাহ তাআলাই শিখিয়ে দিয়েছেন। এ কারণেই এই সূরার নামসমূহের মধ্য হতে একটি নাম হলো সূরাহ তালিমূল মাসআলাহ

সূরা ফাতিহা : এ দখাস্তের প্রতিটি বাক্যের উপর আল্লাহ তাআলারর পক্ষ থেকে প্রতিদানও দেয়া হয়। এ জন্য হযরত আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে আছে: রাসূল (স.) ইরশাদ করেছেন: আল্লাহ তাআলার বাণী রয়েছে:

قـسـمـت بـيـني وبـيـن عـبـدي نـصـفـيـن ولـعـبـدي مـا سأل ، فـاذا قـال الـعـبـد الـحـمـد لـلـه رب الـعـالـمـيـن قـال الـلـه تـعـالـي حـمـدنـي عـبـدي واذا قـال الـرحـمـن الـرحـيـم قـال الـلـه اثـنـي عـلـي عـبـدي واذا قـال مـالـك يوم الـدين قـال مـجـدنـي عـبـدي فـاذا قـال اياك نـعـبـد واياك نـسـتـعـيـن قـال هـذا بـيـني وبـيـن عـبـدي ولـعـبـدي مـا سـأل، فاذا قـال اهـدنـا الـصـراط الـمـسـتـقـيـم صـراط الـذين انـعـمـت عـلـيـهـم غـيـر الـمـغـضـوب عـلـيـهـم ولا الـضـالـيـن قـال هـذا لـعـبـدي ولـيـعـبـدي مـا سـأل - ‘আমি আমার ও আমার বান্দার মাঝে নামাজকে বণ্টন করে নিয়েছি। আমার বান্দা যা চায়, তা সে পায়। বান্দা যখন الـحـمـد لـلـه رب الـعـالـمـيـن বলে, তখন আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার তারিফ করেছে। আর বান্দা যখন বলেالـرحـمـن الـرحـيـم তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার বান্দা আমার মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছে। বান্দা যখন বলেاياك نـعـبـد واياك نـسـتـعـيـن তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, এটা আমার ও আমার বান্দার মাঝে অর্ধেক অর্ধেক বণ্টন। আর আমার বান্দা যা চায়, সে তা পাবে। (সূরার শেষাংশ আমার বান্দার জন্য) যখন বান্দা বলেاهـدنـا الـصـراط الـمـسـتـقـيـم  তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, এসব আমার বান্দার। বস্তুতঃ আমার বান্দা যা চাইবে, সে তা পাবে। : সহীহ মুসলিম : ১/১৬৯-৭০)

এ দ্বারা বুঝা গেল, সূরা ফাতিহার প্রতিটি আয়াতে আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরষ্কার দেয়া হয়। হাদীস দ্বারাও প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (স.) সূরা ফাতিহার প্রতিটি আয়াতে ওয়াক্ফ করতেন। অতএব, আমাদেরও উচিত, সূরা ফাতিহার প্রতিটি আয়াতে ওয়াক্ফ করা এবং কল্পনা করা যে, আল্লাহ তাআলা তা শুনছেন এবং উত্তর দিচ্ছেন।

তবে এ উদ্দেশ্যে ওয়াক্ফ করার ব্যাপারে শায়খে আকবর, হাফিজ ইবনে কাইয়িম ও শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী (র.) সতর্ক করেছেন। কিন্তু শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী (র.) সর্বদা এর উপর আমল করতেন।

অতঃপর আমীন বলে সকল মুক্তাদি ইমামের আবেদনকৃত দরখাস্তের সত্যায়ন করে থাকে। তার দোয়ার জবাবে ইমামের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কুরআন মাজীদের কিছু অংশ পাঠ করে শুনিয়ে দেয়া হয় যে, তোমরা :اهـدنـا الـصـراط الـمـسـتـقـيـم আয়াতে যে হেদায়েত প্রার্থনা করছ, তার জবাবে আমি তোমাদেরকে এই কিতাব (কুরআন) প্রদান করছি, যা هـدي لـلـمـتـقـيـن

নামাজে এ পর্যন্ত তো শুধু মৌখিক প্রশংসা ও গুণকীর্তন ছিল। পরবর্তীতে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দ্বারাও শিষ্টাচার রক্ষার জন্য রুকুতে ঝোঁকা হয়, এরপর ইমাম سـمـع الـلـه لـمـن حـمـده বলে এ সুসংবাদ প্রদান করে যে, আপনার মৌখিক ও কার্যগত সকল প্রশংসা কবুল হয়েছে।  এ সুসংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে শুকরিয়াস্বরূপ মুক্তাদি ربـنا ولـك الـحـمـد বলে অতিরিক্ত প্রশংসা করে। এরপর আহকামূল হাকিমীনের সম্মুখে অত্যধিক বিনয় প্রকাশার্থে সর্বোত্তম অঙ্গ চেহারাকে মাটিতে লাগিয়ে দেওয়া হয়। দুবার সিজদা করে প্রকাশ করে যে, আমরা আল্লাহর শানে জালালী ও জামালী উভয়ের উপর উৎসর্গিত হতে প্রস্তুত। যখন দরখাস্ত পেশ করা হয়েছে এবং তা গ্রহণও হয়েছে এবং দাসত্বের যাবতীয় কার্যাদি সম্পাদিত হয়ে গেছে তাই এরপর বসে বসে দরবারি নিয়াজ ও নজরানা পেশ করতে থাকে। তা হলো আত্তাহিয়্যাত।

যাকাতের হেকমত : যখন নামাজের মাধ্যমে শাহী দরবারে তার রাজত্বের স্বীকৃতি দিয়ে এসেছি, যে আমি তোমারই অনুগত, তোমার দাস ও অধীনস্থ, এবং আমি তোমারই রাজত্বে বসবাসকারী। আর সকল রাষ্ট্রেরই বিধান রয়েছে প্রজাদের উপর কর আরোপ করা হয়। যেন এটা প্রমাণ হয় যে, আমার প্রজাসাধারণ জান-মাল উভয়ভাবেই হাজির আছে। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা স্বীয় প্রজ্ঞাসুলভ শানে যাকাত ফরজ করে নির্দেশ প্রদান করেছেন যে, যাকাত প্রদান কর। আর বান্দাও যাকাত প্রদান করে এটা প্রমাণ করে যে, আমরা যেমনিভাবে স্বশরীরে হাজির আছি, তেমনিভাবে আর্থিকভাবেও হাজির আছি। মোটকথা নামাজ ও যাকাত হলো আল্লাহ তাআলা জালালী শান বা শাসকসুলভ শানের বহিঃপ্রকাশ। আর রোজা ও হজ হলো জামালী তথা প্রেমাস্পদসুলভ শানের বহিঃপ্রকাশ।

রোজা ও হজ : এ উভয়টি পালন করে বান্দা আল্লাহ তাআলার জামালী বা প্রেমাস্পদসুলভ শানের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।  কারণ, নিয়ম হলো যখন কেউ কারো প্রেমে পড়ে তখন তার প্রথম স্তর হলো তারা খানাপিনা ও রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। এরপর দ্বিতীয় স্তর হলো সত্যপ্রেমিক সকলের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে নির্জনে বসে প্রেমাস্পদের ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে পড়ে।  কবি বলেন:


অতঃপর তৃতীয় স্তর এমন হয় যখন সে নির্জনতায় প্রেমাস্পদের কল্পনা করতে করতে তার মহব্বত শিরা-উপশিরায় সংক্রমিত হয়ে পড়ে, তখন সে নির্জনতা (ইতিকাফ) ও ঘর-বাড়ি ছেড়ে পাগলপারা হয়ে যায়। এবং এক পর্যায়ে  প্রেমাস্পদের বাড়ির পথ ধরে।


এবং অস্থিরচিত্তে, প্রেমাস্পদের বাড়ির চতুর্দিকে অলিতে গলিতে চক্কর লাগাতে থাকে, দেয়ালে দেয়ালে চুমু খেতে থাকে, আর বলতে থাকে যে, আমি এসে গেছি, আমি এসে গেছি। (ঠিক তেমনি হজের ক্ষেত্রে এমনই হয়ে থাকে। আল্লাহকে পাবার জন্য বান্দা দূর-দূরান্ত থেকে অনেক কষ্ট স্বীকার করে আল্লাহর ঘরে গিয়ে হাজির। যখন তার অবস্থা এমন হয় যে, মাথায় টুপি নেই, চুল উস্কোখুস্কো এবং সর্বপ্রকার সাজগোজ পরিহার করে আল্লাহর ঘরের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করতে থাকে, আবার হাজরে আসওয়াদে চুমু খায় আর বলতে থাকে:لـبـيـك الـلـهـم لـبـيبـك  হে আল্লাহ আমি হাজির হয়ে গেছি।) কবি সুন্দর বলেছেন:

امـر عـلـي الـديار ديار لـيـلـي + اقـبـل ذالـجـدار وذا الـجـدارا

ومـا حـب الـديار شـغـفـن قـلـبـي + ولـكـن حـب مـن سـكـن الـديارا

আমি লাইলির বাড়ির পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম, আর একবার এ দেয়ালে আবার ও দেয়ালে চুমু খাচ্ছিলাম।

মূলত আমার অন্তর সেই ঘর-বাড়ির প্রতি আসক্ত ছিল না; বরং আসক্ত ছিল সেই ঘরের বাসিন্দার প্রতি।

জনৈক ফারসি কবি বলেন:

একবার মজনু কুকুরের পায়ে চুমু খাচ্ছিল, তাই দেখে লোকেরা বলতে লাগল এটা কেমন কথা? উত্তরে সে বলল, এ কুকুরটি কখনো কখনো লাইলির গলিতে গিয়েছিল।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.