অনুবাদ: হযরত আমার ইবনে উমাইয়া (রা.) বলেন, তার পিতা তাকে এই মর্মে খবর দেন যে, তিনি আল্লাহর রাসূল (সা.)-কে ছাগলের পায়ের গোস্ত কেটে খেতে দেখেন। এরপর তাঁকে নামাযের জন্য ডাকা হলো। তিনি ছুরি রেখে নামায আদায় করলেন। কিন্তু অযু করলেন না।
হাদীসের পুনরাবৃত্তি: হাদীসটি বুখারী শরীফে ৩৪, ৯৩, ৪০৯, ৮১৪, ৮১৫, ৮২১, এবং মুসলিম শরীফে ১৫৭ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে।
বাবের উদ্দেশ্য: এ বাব দ্বারা ইমাম বুখারীর উদ্দেশ্য হলো ما مست النار তথা আগুনে পাকানো জিনিসের বিধান বর্ণনা করা। অর্থাৎ আগুনে রান্না করা জিনিস খেলে অযু ভঙ্গ হয় না।
ইমাম বুখারী এ মাসআলা বর্ণনার জন্য শিরোনামে দুটি বিষয়ের উলেখ করেছেন: গোশত এবং ছাতু। এ উভয়টির সম্পর্ক আগুনের সাথে। গোশত যে আগুনে পাকানো হয় তা সুস্পষ্ট। ছাতুও ভাজা গম বা ভাজা যব হতে তৈরি হয়। তাই উভয়টি مما مست النار-এর অন্তর্ভুক্ত।
ইমাম বুখারী বলেন, গোশত খাওয়া দ্বারা অযু আবশ্যক হয়না। দলীল হিসেবে তিনি খোলাফায়ে রাশেদীনের আমল উপস্থাপন করেছেন। হযরত আবু বকর, ওমর, উসমান (রা.) গোশত খেয়েছেন; কিন্তু অযু না করেই নামায পড়েছেন। আর যেহেতু গোশত খাওয়া দ্বারা অযু আবশ্যক হয়নি যার মধ্যে রয়েছে তৈলাক্ততা, সুতরাং যা তার থেকে নিম্নস্তরের বস্তু যেগুলোর মধ্যে তৈলাক্ততা নেই : যেমন ছাতু ইত্যাদি- সেগুলো খাওয়ার কারণে যে অযু করতে হবে না তা বলারই অপেক্ষা রাখে না।
এ শিরোনাম কায়েমের কারণ হলো কোনো কোনো হাদীসে আছে, যেমন হযরত আয়েশা ও আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত হাদীস মুসলিম পৃ. ১৫৬, আবু দাউদ পৃ. ২৫, তিরমিযী পৃ. ১২ ; যেমন তিরমিযী শরীফের হযরত আবু হুরায়রার হাদীস: عـن ابى هـريرة قـال قـال رسـول اللـه ﷺ الـوضـوء مـمـا مـسـت الـنار ولـو مـن ثـوراقـط তেমনিভাবে হযরত আয়েশা (রা.) হতেও এতদসংক্রান্ত হাদীস রয়েছে, যা মুসলিম, আবু দাউদ ইত্যাদিতে রয়েছে।
মোটকথা, আগুনে পাকানো জিনিস খেলে অযু ভঙ্গ হবে কিনা সে ব্যাপারে সাহাবীদের যুগে কিছুটা মতবিরোধ ছিল। কিন্তু আল্লামা নববী (র.) বলেন, আগুনে রান্না করা খাবার খেলে অযু ওয়াজিব না হওয়ার ব্যাপারে বর্তমানে ইজমা হয়ে গেছে। এটিই হলো ইমাম চতুষ্টয়, খোলাফায়ে রাশেদীন (রা.)-এর মাযহাব যে, আগুনে পাকানো জিনিস খেলে শরয়ী অযু ওয়াজিব হয় না।
তাদের দলীলের জবাব: জমহুর আলেমগণের পক্ষ থেকে তাদের দলীলসমূহের নানা রকম জওয়াব হয়েছে। তন্মধ্যে কিছু নিম্নরূপ :
১. রান্না করা খাবার খাওয়ার পর অযু করার বিধান পূর্বে ছিল, পরে তা মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে। দলিল হলো আবূ দাঊদ শরীফে বর্ণিত হযরত জাবের (রা.) -এর এ হাদীস:
‘তিনি (জাবের) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর শেষ আমল/নির্দেশ এই ছিল যে, রান্না করা খাদ্য খাওয়ার পর অযু না করা।’
২. রান্না করা খাদ্য খাওয়ার পর অযু করা মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়। এর দলিল হলো, রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে অযু করা এবং না করা উভয় প্রমাণিত আছে। আর এরূপ হওয়া মুস্তাহাবের আলামত। (কেননা, যদি ওয়াজিব হতো তাহলে সব সময়ই খাওয়ার পর অযু করতেন, কখনো ছাড়তেন না।)
৩. এ ক্ষেত্রে অর্থাৎ খাওয়ার পর অজু করা বলতে পারিভাষিক অযুকে বুঝানো হয় না; বরং আভিধানিক অযু বুঝানো উদ্দেশ্য। আর আভিধানিক অযুর অর্থ হলো: হাত-মুখ ধৌত করা। এ বিষয়ে দলিল হলো হযরত ইকরাশ ইবনে যুওয়াইব (রা.)-এর হাদীস, যা তিরমিযী শরীফের দ্বিতীয় খণ্ডে খানা-পিনা পরিচ্ছেদের খানার শুরুতে বিস্মিল্লাহ শিরোনামক পরিচ্ছেদে বর্ণিত আছে। সে হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী একটি দাওয়াতের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:
‘অতঃপর আমাদের কাছে পানি আনা হলো। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর হস্তদ্বয় ধৌত করলেন। এবং হস্তদ্বয়ের ভিজা দ্বারা চেহারা, বাহু ও মাথা মাসাহ করলেন। অতঃপর বললেন, হে ইকরাশ! এই হলো রান্না করা খাদ্য খাওয়ার পরবর্তী অযু।
তবে ইমাম আহমদ (র.) বলেন, উটের গোশত খেলে অযু ওয়াজিব হয়। বাহ্যতঃ ইমাম বুখারীর ঝোঁকও সেদিকে মনে হচ্ছে। তার নিদর্শন হলো من لم يتوضأ مما مست النار-এর মত সংক্ষিপ্ত বাব গঠন করার পরিবর্তে তিনি من لم يتوضأ من لحم الشاة والسويق-এর ন্যায় দীর্ঘ শিরোনাম গঠন করেছেন।
কোন মন্তব্য নেই