অনুবাদ: হযরত আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, একদিন আল্লাহর নবী (সা.) মদিনার এক পথে তাঁর সাথে মিলিত হন। তিনি (আবু হুরাইরা) নাপাক ছিলেন। তিনি বলেন, আমি তাঁর কাছে থেকে সরে গেলাম। তারপর গোসল করে পুনরায় এলাম। তিনি জানতে চাইলেন, আবু হুরাইরা তুমি কোথায় ছিলে? আবু হুরাইরা বলেন, আমি নাপাক অবস্থায় আপনার সাথে বসা পছন্দ করলাম না। তিনি বলেন, সুবহানাল্লাহ! মুমিন কখনও অপবিত্র হয় না।
হাদীসের সামঞ্জস্য: শিরোনামের দুটি অংশ রয়েছে। এক. ঘামের হুকুম কী? দুই. মুসলমান নাপাক হয় না। আল্লামা আইনী (র.) বলেন, শিরোনামে উলিখিত হাদীসের শব্দإِنَّ الْمُؤْمِنَ لاَ يَنْجُسُ-এর সাথে শিরোনামের দ্বিতীয় অংশের সামঞ্জস্য রয়েছে।
বাবের উদ্দেশ্য : আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী (র.) বলেন, ইমাম বুখারীর উদ্দেশ্য হলো শিরোনামের প্রথম অংশের হুকুম বর্ণনা করা। কিন্তু বাবের হাদীস দ্বারা কেবলমাত্র শিরোনামের দ্বিতীয় অংশের মিলই পাওয়া যায়; কারণ, শিরোনামের প্রথম অংশের হুকুমের ব্যাপারে হাদীসে কোনো নির্দেশনা নেই। ইমাম বুখারী হাদীসের শব্দ ان المؤم لا ينجس দ্বারা শিরোনামের প্রথম অংশের হুকুম বর্ণনা করে দিয়েছেন যে, জুনুবী ব্যক্তির ঘাম পবিত্র। কেননা, ঘামের উৎস হলো শরীর। সুতরাং ঘামেরও ঐ হুকুম হবে যা তার মূল তথা শরীরের হুকুম।
অর্থাৎ জানাবাত হলো একটি অদৃশ্য ও হুকমগত নাপাকী। এর কারণে বাহ্যিক দেহ নাপাক হবে না। তাই জুনুবী ব্যক্তির সাথে মুসাফাহা করা, চলা-ফেরা করা, এবং সালাম-কালাম করা সবই জায়েয।
হাদীসের পুনরাবৃত্তি: হাদীসটি বুখারী শরীফে ৪২, ৪২ এবং মুসলিম ১৬২, আবু দাউদ ৩০, তিরমিযী ১৭, নাসাঈ ৩০, ইবনে মাজাহ ৪০ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ
প্রশ্ন:১ : إِنَّ الْمُؤْمِنَ لاَ يَنْجُسُ অর্থাৎ মুমিন পবিত্র হয় না। অথচ আমরা দেখি যে, মুমিন হাকীকী-হুকমী উভয়ভাবেই নাপাক হয়। হুকমী যেমন: হদছে আসগার এবং হদছে আকবার দ্বারা। আর হাকীকী যেমন কোনো বাচ্ছাকে কোলে নিল, আর সে প্রস্রাব-পায়খানা করে দিল, এভাবে সে জাহিরী বা হাকীকী নাপাক হয়ে গেল। মোটকথা, মুমিন নাপাক হয়, কখনো নাজাসাতে হুকমী দ্বারা, যেমন জানাবাত অবস্থায়। আবার কখনও বাহ্যিক ও হাকীকীভাবেও নাপাক হয়, যেমন প্রস্রাব, রক্ত ইত্যাদি শরীরে লাগর দ্বারা।
উত্তর: এখানে لا ينجس দ্বারা নির্দিষ্ট নাপাকীর নফী করা হয়েছে, সকল প্রকার নাপাকীর নফী করা উদ্দেশ্য নয়। যেহেতু আবু হুরায়রা (রা.) ধারণা করেছিলেন যে, হুকমী ও অদৃশ্য নাপাকী বাহ্যিক বা প্রকাশ্য নাপকীর মতই। অর্থাৎ জানাবাত অবস্থায় শরীর এমনভাবে নাপাক হয়ে যায় যে, মুসাফাহা করা বা সাথে উঠাবসা করাও নাজায়েয হয়ে যায়। এ জন্য এখানে আবু হুরায়রা (রা.)-এর ভুল ধারণা দূর করার জন্য নবী করীম (সা.) বলেছেন: إِنَّ الْمُؤْمِنَ لاَ يَنْجُسُ ‘মমিন ব্যক্তি জুনুবী হলেও এমন নাপাক হয়না যেমনটা তুমি ধারণা করছ।
প্রশ্ন : ২: إِنَّ الْمُؤْمِنَ لاَ يَنْجُسُ-এর مفهوم مخالف তথা বিপরীতার্থ হলো إِنَّ الْكافرَ يَنْجُسُ ‘নিশ্চয় কাফির নাপাক হয়।’ যেমন কোনো আহলে যাহেরদের ধারণা যে, কাফিররা نجس العين (তাদের দেহটা অপরাপর নাজাসাতের ন্যায়) নাপাক। তারা এর সমর্থনে কুরআনের আয়াত انما المشركون نجس ‘নিশ্চয়ই মুশরিকগণ নাপাক।’ দ্বারা দলীল পেশ করেন।
উত্তর: এ আয়াতে মুশরিকদেরকে اعتقادي (বিশ্বাসগত) নাপাকীর কথা বলা হয়েছে যে, কুফর এবং শিরকের কারণে কাফিরদের অন্তর নাপাক। আর মু’মিনের অন্তর কুফর-শিরক হতে মুক্ত থাকার কারণে তারা পাক। বাকী রইল বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যাপার। এ বিষয়ে কাফির এবং মু’মিনের হুকুম একই রকম। ইহাই জুমহূর ওলামা এবং আইম্মায়ে ইসলামের মত। যেমন : হাফিজ আসকালানী (র.) বলেন:
وعن الآية بان المراد انهم (اي الكافر) نجس في الاعتقاد والاستقذار وحجتهم ان الله تعالي اباح نكاح نساء اهل الكتاب الخ
আয়াতের উত্তর হলো যে, কাফিররা তাদের ই’তিকাদ তথা বিশ্বাসগত নাপাক। তাদের দলীল হলো আল্লাহ তা‘আলা আহলে কিতাব মহিলাদের বিবাহ মুসলমানের জন্য জায়েয রেখেছেন। সুতরাং জুমহূরের দলীল হলো এই যে, আল্লাহ তা‘আলা আহলে কিতাব মহিলাদের বিবাহ জায়েয রেখেছেন। আর স্পষ্ট কথা যে, বিবাহের পর তাদের সাথে সহবাস এবং মিলামিশা হবে। তাদের ঘাম থেকে বেঁচে থাকা খুবই কঠিন। কিন্ত তা ধৌত করার বিশেষ কোনো বিধান শরিয়তে আসেনি। আর মুসলামন মহিলার সঙ্গে সহবাস করার পর যেমনিভাবে জানাবাতের গোসল করতে হয়, তেমিনভাবে আহলে কিতাব মহিলার সাথে সহবাস করার পরও জানাবাতের গোসল করতে হয়। এতদুভয় গোসলের মাঝে কোনো পার্থক্য করা হয়নি। এর দ্বারা বুঝা গেল জীবিত ব্যক্তি نجس العين তথা সত্ত¡াগতভাবে নাপাক হয় না। কারণ, পুরুষ এবং মহিলার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
শায়খুল হাদীস যাকারিয়া (র.) বলেন:واغرب القرطبي اذ نسب القول بناجسة الكافر الي الشافعي الخ ‘কুরতুবী (র.) ইমাম শাফেয়ীর দিকে কাফেরের ঘাম নাপাক হওয়ার কথা সম্পর্কিত করে অভিনব ও অবাস্তব কথা বলেছেন। এরপর তিনি বলেন: আমি বযলুল মাজহূদের হাশিয়ায় ইবনে আরসালানের (যিনি শাফেয়ী মতাবলম্বী) উক্তি উল্লেখ করেছি, তিনি বলেন যে, মুসলমান নাপাক হয় না, তেমনিভাবে কাফেরও নাপাক হয় না: আমাদের (শাফেয়ীদের) মতে, মালেকীদের মতে, এবং সকল মুসলমানের মতে।
এর দ্বারা স্পষ্টভাবে জানা গেল যে, কাফের ব্যক্তি নাপাক হওয়ার মতাদর্শ ইমাম শাফেয়ী বা ইমাম মালেকের দিকে করা সঠিক নয়। অধিকন্তু কাফের ব্যক্তিকে সত্ত¡াগতভাবে নাপাক সাব্যস্ত করা কুরআনের বাণী:ولقد كرمنا بني آدم-এরও পরিপন্থি।
কোন মন্তব্য নেই