Header Ads

সহীহ বুখারীঃ কিতাবুল ইলমঃ মজলিসে স্থান পেলে বসে পরা সমন্ধে

باب مَنْ قَعَدَ حَيْثُ يَنْتَهِي بِهِ الْمَجْلِسُ وَمَنْ رَأَى فُرْجَةً فِي الْحَلْقَةِ فَجَلَسَ فِيهَا‏.

পরিচ্ছেদ: যে মজলিসের  পিছনে বসে এবং যে মজলিসের মধ্যবর্তী স্থানে জায়গা পেয়ে বসে পড়ে: তার সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে। ‏

حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ، قَالَ حَدَّثَنِي مَالِكٌ، عَنْ إِسْحَاقَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي طَلْحَةَ، أَنَّ أَبَا مُرَّةَ، مَوْلَى عَقِيلِ بْنِ أَبِي طَالِبٍ أَخْبَرَهُ عَنْ أَبِي وَاقِدٍ اللَّيْثِيِّ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بَيْنَمَا هُوَ جَالِسٌ فِي الْمَسْجِدِ وَالنَّاسُ مَعَهُ، إِذْ أَقْبَلَ ثَلاَثَةُ نَفَرٍ، فَأَقْبَلَ اثْنَانِ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَذَهَبَ وَاحِدٌ، قَالَ فَوَقَفَا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَأَمَّا أَحَدُهُمَا فَرَأَى فُرْجَةً فِي الْحَلْقَةِ فَجَلَسَ فِيهَا، وَأَمَّا الآخَرُ فَجَلَسَ خَلْفَهُمْ، وَأَمَّا الثَّالِثُ فَأَدْبَرَ ذَاهِبًا، فَلَمَّا فَرَغَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ "‏ أَلاَ أُخْبِرُكُمْ عَنِ النَّفَرِ الثَّلاَثَةِ أَمَّا أَحَدُهُمْ فَأَوَى إِلَى اللَّهِ، فَآوَاهُ اللَّهُ، وَأَمَّا الآخَرُ فَاسْتَحْيَا، فَاسْتَحْيَا اللَّهُ مِنْهُ، وَأَمَّا الآخَرُ فَأَعْرَضَ، فَأَعْرَضَ اللَّهُ عَنْهُ ‏"‏‏.‏


অনুবাদ : হযরত আবু ওয়াকিদ লাইসী (রাঃ) বলেন, একবার আল্লাহর রাসূল (সাঃ) লোকজন নিয়ে মসজিদে বসেছিলেন। এমন সময় তিন ব্যক্তি এলো। তাদের দুইজন রাসূল (সাঃ)-এর দিকে এগিয়ে গেলো এবং আরেকজন চলে গেলো। আবু ওয়াকিদ বলেন, ঐ দুইজন তাঁর কাছে দাঁড়িয়ে রইলো। পরে একজন জমায়েতের মধ্যে খালি জায়গা দেখে সেখানে বসলো। আর অপরজন লোকদের পিছনে বসলো। তৃতীয় ব্যক্তি পিছন ফিরে চলেই গেলো। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বললেন, আমি ঐ তিন ব্যক্তি সম্পর্কে তোমাদেরকে জানিয়ে দেব না কি? তাদের একজন আল্লাহর আশ্রয় চাইলো, আল্লাহ তাকে আশ্রয় দিলেন। দ্বিতীয় জন লজ্জা করলো। আল্লাহও তার প্রতি অনুগ্রহ করে লজ্জা করলেন। তাকে সওয়াব থেকে বঞ্চিত করলেন না। আর তৃতীয়জন মুখ ফিরিয়ে নিলো। সর্বশক্তিমান আল্লাহও তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তিনি তার প্রতি অসন্তুষ্ট হলেন।

বাবের সাথে হাদীসের মিল: তরজমাতুল বাবের সাথে হাদীসের মিল সুস্পষ্ট। কারণ তরজমাতুল বাব হলো من قعد حيث ينتهي به المجلس الخ আর হাদীসেও তরজমাতুল বাবের সব শব্দ তথা مجلس-فرجة-ينتهي به المجلس ইত্যাদি রয়েছে।

যোগসূত্র ও বাবের উদ্দেশ্য :

কিতাবুল ইলমের সাথে এ বাবের সামঞ্জস্য এই যে, এখানে হালকা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ইলমের হালকা।

এ বাব দ্বারা ইমাম বুখারী (র.)-এর উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থী ও জ্ঞান অšে¦ষণকারীদেরকে মজলিসে বসার আদব শিক্ষা দেওয়া।  মজলিসে গিয়ে যেখানে জায়গা পাবে সেখানেই বসে পড়বে। এর মধ্যে রয়েছে গর্ব-অহংকারের চিকিৎসা। অযথা মজলিসে উপবিষ্ট ব্যক্তিদের ঘাড় টপকে তাদেরকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। তবে যদি কোনো ইলমের মজলিসে গিয়ে দেখল যে, সামনের দিকে জায়গা খালি রয়েছে, তাহলে সেই শূন্যস্থান পূরণ করে বসা জায়েয আছে। মোটকথা কোনো ইলম, যিকির বা ওয়াজ-নসীহতের মজলিসে গিয়ে প্রথমে দেখবে যে, মধ্যে জায়গা আছে কিনা, যদি থাকে তাহলে সেই জায়গায় গিয়েও বসতে পারবে। নতুবা যেখানে সহজে বসা যায সেখানেই বসে পড়বে। কিন্তু জায়গা না পেলে সেখান থেকে ফিরে চলে যাওয়া জায়েয হবে না। ইলমের মজলিসে বসলে ইলমগত উপকারিতা অর্জনের পাশাপাশি আল্লাহর রহমতের কোলে স্থান পাবে। অমনোযোগিতা ও বেপরোয়াভাব দেখিয়ে সেখান থেকে ফিরে গেলে নিজেই নিজের ক্ষতি করল। আর যদি অহংকারের কারণে ফিরে চলে আসে তাহলে তা হারাম হবে। আর যদি বেপরোয়াভাবের কারণে হয়ে থাকে, তবে একটি সৌভাগ্যবান মজলিস থেকে উপকৃত হওয়া থেকে অবশ্যই রঞ্চিত হতে হবে।

হাদীসের পুনরাবৃত্তি : এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (র.) বুখারী শরীফের ১৫-১৬ ও ৬৮ নং পৃষ্ঠায় পুনরাবৃত্তি করেছেন। তাছাড়া মুসলিম, তিরমিযী ইত্যাদি কিতাবেও হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে।

واما الاخر فاستحي فاستحي الله منه : দ্বিতীয় ব্যক্তি (ভিতরে প্রবেশ করার ব্যাপারে) লোকদেরকে লজ্জা করেছে, আল্লাহ তা‘আলাও তার সাথে লজ্জা করেছেন। এ বাক্যাটির ব্যাখ্যায় ওলামায়ে কেরামের দু ধরনের উক্তি রয়েছে।

১.    প্রথম ব্যক্তি মজলিসে জায়গা খালি দেখেছে, তাই সে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে গিয়ে সেখানে বসেছে। কিন্তু তার দ্বিতীয় সাথী লজ্জা করেছে যে, কিভাবে মানুষের ঘাড় টপকে সামনে যাবে, তাই সে মজলিসের শেষে বসে পড়েছে। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাকে লজ্জার প্রতিদান দেন এবং মজলিসে বসারও প্রতিদান দেন। এমতাবস্থায় এ দ্বিতীয় ব্যক্তির মর্যাদা প্রথম ব্যক্তির চেয়ে অধিক হয়ে যাবে।

২.    দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হলো তার মজলিসে বসার উদ্দেশ্য ছিল না, মনে চাচ্ছিল তৃতীয় ব্যক্তির ন্যায় মজলিস ছেড়ে চলে যেতে। কিন্তু তার লজ্জা হলো যে, হুযুর (স.) কি বলবেন? সাহাবীরা কি বলবেন? তাই সে লজ্জায় মজলিসে বসে পড়ল। এমতাবস্থায় এর মর্যাদা প্রথম ব্যক্তির চেয়ে কম হবে। কিন্তু তৃতীয় ব্যক্তি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তার এ বেপরোয়াভাবের ফলে আল্লাহ তা‘আলাও তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। অর্থাৎ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন। তবে শর্ত হলো, তা বিনা ওযরে হতে হবে।

এ হাদীসে ايواء، استحياء، اعراض এ শব্দগুলির ব্যবহার  صنعت مشاكلة  হিসেবে হয়েছে। এমন প্রয়োগের ক্ষেত্রে করা হয় যার বাহ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য নেওয়া সম্ভব হয়না, তখন তার ফলাফল ও আবশ্যিক অর্থ উদ্দেশ্য নেওয়া হয়। 

একটি শিক্ষণীয় ঘটনা

এ হাদীসে একটি শব্দ আছে فرجة যা ف বর্ণে যবর, পেশ উভয়ই পড়া যায়। তবে  ف বর্ণে যবর অধিক বিশুদ্ধ না পেশ এ সম্বন্ধে ভাষাবিদ আবুল ‘আলা-এর সংশয় ছিল। তখন ছিল জালিম বাদশাহ হাজ্জাজ বিন ইউসুফ এর শাসনামল। কোনো এক কারণে হাজ্জাজ তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে যায়। আর হাজ্জাজ কারো প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়া মানেই তার মৃত্যু নিশ্চিত।  তাই তিনি হাজ্জাজের ভয়ে পালিয়ে পল­ীতে আশ্রয় নিয়ে বছরের পর বছর পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। ইত্যবসরে তিনি একজন গ্রাম্য লোকের মুখে হাজ্জাজের মৃত্যুর আনন্দে একটি পংক্তি আবৃত্তি করতে শুনতে পেলেন। পংক্তিটি হলো:

رُبـمـا تَـكـره الـنفـوس مـن الـدهـر - لـه فَـرجـة كـحـل الـعِـقـال

“কখনো মানুষ কালের দুর্বিষহ যাতনে পিষ্ট হতে থাকে; কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে মুহূর্তেই তা থেকে নি®কৃতি লাভ করে, যেমনিভাবে উট বন্ধনমুক্ত হয়ে স্বাধীন হয়ে যায়।” আবুল ‘আলা বলেন, এটি শুনে আমি একত্রে দুটি আনন্দ অনুভব করলাম, একটি হলো হাজ্জাজের মৃত্যুর সংবাদ, অপরটি হলো গ্রাম্যলোকের মুখে উচ্চারিত فرجة এর ف বর্ণে যবর উচ্চারণ। কিন্তু আমি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারছিলাম না যে, হাজ্জাজের মৃত্যু সংবাদ আমার নিকট অধিক আনন্দদায়ক না কি গ্রাম্য লোকটির মুখে শোনা পংক্তিটিতে ‘ফারজাতুন’ শব্দে ফা বর্ণে যবর  উচ্চারণ, যার দ্বারা আমার শব্দটির তাহকীক হয়ে গেল যে, এটি ফা বর্ণে যবরই অধিক বিশুদ্ধ।

এর দ্বারা অতি উত্তমভাবেই অনুমান করা যায় যে, আগেকার যুগে ইলমের কত কদর ছিল যে, হাজ্জাজের ভায়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরে ঘুরছে যেন কোনোভাবে জীবন রক্ষা হয়। বছর বছর ধরে কতইনা বিপদাপদ বরদাশত করেছেন। কিন্তু নিজে একজন ভাষাবিদ হওয়াসত্তেও একটি শব্দের তাহকীক হওয়ায় এত অধিক আনন্দ উদযাপন করছেন যে, সমস্ত বিপদাপদের সমাপ্তি তার আনন্দের সমান হয়ে গেছে। : নাফহাতুল ইয়ামন


কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.