بابُ قَولِ النبي صلي الله عليه وسلم اَنا اَعْلَمُكُم بِالله واَن المَعْرِفَة َ فِعْلُ القَلْبِ لِقَولِ الله تَعَالي ولكِن يُؤاخِذُكُم بما كَسَبَت قُلُوبُكُم
অধ্যায় : নবী করীম (স.) এর বাণী: “আমি তোমাদের তুলনায় আল্লাহ সম্পর্কে অধিক জ্ঞানী। আর মারেফাত হলো অন্তরের কর্ম।’ যেমন: আল্লাহর বাণী: ولكِن يُؤاخِذُكُم بما كَسَبَت قُلُوبُكُم ‘কিন্তু তিনি তোমাদের পাকড়াও করবেন ঐ সমস্ত শপথের জন্য যা তোমরা জেনেবুঝে করেছো।”
অনুবাদ : উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা (রাঃ) বলেন, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) যখন লোকজনকে নির্দেশ দিতেন, তখন এমন কাজের নির্দেশ দিতেন যা করার সামর্থ তাদের রয়েছে। একবার সাহাবায়ে কেরাম বললেন, হে আল-াহর রাসূল (সাঃ)! আমরা তো আপনার অনুরূপ নই। আল্লাহ তো আপনার পূর্বের ও পরের সব ভুল ক্ষমা করে দিয়েছেন। (সুতরাং আপনার তুলনায় অধিক গোলামী করা আমাদের কর্তব্য) এতে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) রাগানি¦ত হলেন। এমনকি তাঁর চেহারায় ক্রোধের লক্ষণও দেখা গেল। তারপর তিনি বললেন, আমিই তো তোমাদের সকলের তুলনায় সর্বাধিক আল্লাহকে ভয় করি এবং আল্লাহকে তোমাদের তুলনায় অধিক জানি।
হাদীসের সামঞ্জস্য: শিরোনামের অংশ হলো: اَنا اَعْلَمُكُم بِالله আর হাদীসের শেষাংশেও আছে: اَعْلَمُكُم بِالله انا সুতরাং এভাবে শিরোনামের সাথে হাদীসের মিল সুস্পষ্ট।
পূর্বের সাথে যোগসূত্র :
পূর্বের বাবে উল্লেখ হয়েছিল فِرار مِنَ الفِتَن বা ফিতনা থেকে পালানো সম্পর্কে। আর একথা সুস্পষ্ট যে, মানুষের দীন ও ইমান যত শক্তিশালী হবে এবং আল্লাহর সাথে পরিচয় যার শক্তিশালী হবে, যার আল্লাহভীতি অধিক হবে, সে ফিতনা থেকে ততই দূরে থাকবে, এবং আরাম-আয়েশের সামগ্রী বর্জন ও দীনের জন্য কুরবানি তার জন্য সহজ হবে। এই কারণে ইমাম বুখারী (র.) এখানে ইলম ও মারেফাত-এর আলোচনা করেছেন।
প্রশ্ন - ১ : এ শিরোনামের উপর একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। তা হলো ইমাম বুখারী (র.) এখানে শিরোনাম গঠন করেছেন - اَنا اَعْلَمُكُم بِالله যা বাহ্যত কিতাবুল ইলমের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেহেতু এখানে কিতাবুল ইমানের আলোচনা চলছে, তাই পূর্বোক্ত অধ্যায়গুলোর ন্যায় من الايمان - من الاسلام অথবা من الدين জাতীয় শিরোনাম হওয়া উচিত ছিল। সুতরাং শিরোনাম:انا اعلمكم بالله এর সাথে কিতাবুল ইমানের সামঞ্জস্যতা কি?
উত্তর :
১. علم بالله মানেই হলো ايمان بالله- এবং হুযুর (স.)-এর বাণী:اَعْلَمُ হলো ইসমে তাফযীলের সীগাহ। যা দ্বারা বুঝা যায় যে, علم بالله -এর অনেকগুলি স্তর রয়েছে, তাহলে ايمان بالله-এরও অনেকগুলি স্তর প্রমাণিত হলো। এক স্থানে হুযুর (স.)কে ইলম বৃদ্ধির জন্য দোয়া করতে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে: قُل رب زِدْنِي عِلْمًا এর দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, علم এর অনেকগুলি স্তর রয়েছে: وفَوقَ كُل ذِي عِلمٍ عَلِيم
২. এখানে اَعْلَمُكُم بِالله মানে হলো اَعْرَفُكُم بِالله, যেমনটি বুখারীর কোনো নুসখায় তথা উসাইলির রেওয়ায়েতে اَعلَمُكُم بِالله-এর পরিবর্তে اَعْرَفُكُم بِالله রয়েছে। এর দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, এখানে عِلْم টি مَعْرفَة অর্থে ব্যবহৃত। যদিও প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী علم ও معرفة এর মাঝে পার্থক্য রয়েছে।
علم ও معرفة এর মধ্যকার পার্থক্য নিম্নরূপ:
১. كُلي বা মূলনীতি-বিষয়ক অনুধাবনকে ইলম বলা হয়। পক্ষান্তরে جُزئِي বা একক-বিষয়কে জানার নাম হলো মারেফাত।
২. مركب বা যৌগিক বিষয় জানাকে ইলম বলা হয়, পক্ষান্তরে بسيط বা একক বিষয় জানাকে মারেফাত বলা হয়।
৩. علم শব্দটি দুটি মাফউলের দিকে মুতাআদ্দি হয়। যথা: عَلِمتُ زَيدًَا فَاضِلًا পক্ষান্তরে معرفة মাত্র একটি মাফউলের দিকে মুতাআদ্দি হয়। যেমন:عَرِفْتُ زَيدًا
৪. علم এর সম্পর্ক হয় বিশেষণ বা সিফত জানার সাথে। যেমন: عَلِمتُ زَيدًَا فَاضِلًا এ উদাহরণে জানার বিষয় হচ্ছে যায়েদের গুণ ও মর্যাদা। পক্ষান্তরে معرفة এর সম্পর্ক হয় সত্তা জানার সাথে। যেমন:عَرِفتُ زَيدًا অর্থ: আমি যায়েদকে চিনি। তার গুণাবলি কি তা জানা না থাকা সত্তেও আমি তাকে চিনি।
প্রশ্ন- ২ : শিরোনামের দুটি অংশ রয়েছে। এক. انا اعلمكم بالله দুই. ان المعرفة فعل القلب প্রশ্ন হলো বাক্যদ্বয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক কি?
উত্তর : اَعْلَمُكُم শব্দটি اَعْرَفُكُم অর্থে ব্যবহৃত হয়। সুতরাং উভয়ের মাঝে মিলও স্পষ্ট।
তরজমাতুল বাবের উদ্দেশ্য:
ইমাম বুখারী (র.) তরজমাতুল বাবে দুটি অংশ উল্লেখ করেছেন। এক. انا اعلمكم بالله দুই. ان المعرفة فعل القلب সুতরাং যারা ইমানকে بسيط মনে করে এবং বলে যে: الايمان لا يزيد ولا ينقص ‘ইমান বাড়েও না কমেও না’ তাদের মতকে খণ্ডন করা হচ্ছে ইমাম বুখারী (র.)এর উদ্দেশ্যে। ইমাম বুখারী (র.) এ পরিচ্ছেদ গঠন করেছেন। انا اعلمكم بالله যা মূলত হাদীসেরই অংশ, যা দ্বারা বুঝে আসে যে, হুযুর (স.)-এর ইলম হলো সকলের চেয়ে অধিক। অতঃপর তিনি এর ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন যে: ان المعرفة فعل القلب যা দ্বারা এটা বলে দিয়েছেন যে: اعلمكم بالله অর্থ হলো: اعرفكم بالله আর মারেফাত হলো অন্তরের কর্ম। সুতরাং বুঝা গেল যে, অন্তরের বিষয়সমূহের মধ্যে হৃাস-বৃদ্ধি হয়ে থাকে। আর ইমানও অন্তরের বিষয়। সুতরাং ইমানেরও হ্রাস-বৃদ্ধি হয়ে থাকে। যা হোক এর দ্বারা মুরজিয়াদের খণ্ডন হয়ে গেল।
মারেফাত যে অন্তরের কর্ম এর দলিল দিচ্ছেন: ولكِن يُؤاخِذُكُم بما كَسَبَت قُلُوبُكُم দ্বারা। এ আয়াতে অন্তরের দিকে كسب অর্জনের সম্পর্ক করা হয়েছে, যা কর্ম ও আমল উভয়ের অর্থে ব্যবহৃত হয়। সুতরাং অন্তরের কর্ম হওয়া প্রমাণিত হয়ে গেল।
আর এখানে علم ও معرفة দ্বারা এমন অনিচ্ছাকৃত মারেফাত উদ্দেশ্য নয় যা ইমানের জন্য পূর্বশর্ত; বরং এর দ্বারা সূফী-সাধকদের পারিভাষিক মারেফাত উদ্দেশ্য, যা ইমান গ্রহণের পর চেষ্টা-সাধনার দ্বারা অর্জন হয়, যা হলো ঐচ্ছিক জিনিস। তাছাড়া তরজমাতুল বাবের দ্বিতীয় অংশ ان المعرفة فعل القلب দ্বারা কাররামিয়াদের মতবাদও খণ্ডিত হয়েছে, যাদের মতে ইমান হলো কেবলমাত্র মৌখিক স্বীকারোক্তির নাম। খণ্ডন হয়েছে এভাবে যে, ايمان بالله মানেই علم بالله ; আর علم হলো মারেফাত। আর মারেফাত হলো অন্তরের কাজ। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, ইমান হলো অন্তরের কাজ। তাই অন্তরের সত্যায়ন ও বিশ্বাস ব্যতীত শুধুমাত্র মৌখিক স্বীকৃতি যথেষ্ট নয়।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ :
এখানে হাদীসটি সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু বুখারী শরীফের কিতাবুন-নিকাহ তে ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। তা হলো, হযরত আনাস বিন মালিক (রা.) বর্ণনা করেন যে, তিনজন সাহাবী (হযরত আলী, উসমান বিন মাযঊন ও আব্দুল্লাহ ইবনে আমর বিন আস (রা.) হুযুর (স.)-এর স্ত্রীগণের নিকট এসে হুযুর এর ইবাদত সম্পর্কে জানতে চাইলেন। যখন উত্তর দেওয়া হলো তখন তারা এসব ইবাদতকে কম মনে করে বলতে লাগলেন, আমরা কোথায় আর নবী কোথায়, তাঁর সাথে আমাদের কি তুলনা? হুযুর (স.)-এর তো অগ্র-প্রশ্চাতের সকল ত্রæটি ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। (অর্থাৎ যদি নবী কারীম (স.) ইবাদত কমও করেন, তার পরেও কোনো অসুবিধা নেই। তিনি তো নিস্পাপ, তিনি তো ক্ষমাপ্রাপ্ত। কিন্তু আমরা তো গুনাহগার। অতএব, আমাদের তো বেশি ইবাদত করা উচিত।) ফলে এক সাহাবী বললেন, আমি সর্বদা রাতভর নামাজ পড়তে থাকব। দ্বিতীয়জন বললেন, সর্বদা রোযা রাখব: কখনো দিনে রোযাহীন থাকব না। তৃতীয়জন বললেন, আমি সর্বদা মহিলাদের থেকে দূরে থাকব:কখনো বিয়ে করব না। এমতাবস্থায় নবীজী (স.) তাশরীফ আনলেন: তিনি বললেন, তোমরা কি এরূপ এরূপ কথা বলেছো? শোন! আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের সবার চেয়ে অধিক ভয় করি। তোমাদের সবার চেয়ে বেশি মুত্তাকী আমি। এতদসত্তেও আমি রোযা রাখি (আবার ইফতারও করি) আমি নামাজও পড়ি আবার নিদ্রাও যাই। মহিলাদেরকে বিয়েও করি। (তোমাদের কথাবার্তায় বুঝতে পারলাম যে, তোমরা আমার এ ইবাদতসমূহকে কম মনে করছ, এবং আমার চেয়ে অধিক ইবাদত করতে চাচ্ছ।) শুনে রাখ! যে ব্যক্তি আমার আদর্শ থেকে বিমুখ হবে, সে আমার দলভুক্ত নয়। : (বুখারী ২/৭৫৭)
قَدْ غَفَرلَكَ مَ تَقَدمَ مِن ذنبِكَ الخ : ‘আল্লাহ তা‘আলা আপনার পূর্বাপর সকল ত্রæটি ক্ষমা করে দিয়েছেন।’ এ দ্বারা ইঙ্গিত হলো আয়াতে কারীমা:لِيَغفِرَ لك الله ما تَقَدمَ مِنْ ذَنْبِكَ و مَا تَأخرَ এর দিকে।
ذَنْبٌ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ইজতিহাদী ভুল অথবা শব্দের বাহ্যিকতার বিচারে শাস্তি হওয়া। কারণ:حسنات الابرار سئيات المقربين ‘পুণ্যশীলদের নেক-কাজ নৈকট্যপ্রাপ্তদের জন্য মন্দ-কাজ স্বরূপ।’ যেমন হযরত মূসা (আ.) انا اَعلَمُ বলার কারণে ভর্ৎসনার পাত্রে পরিণত হন, অথচ কথাটি যথার্থও ছিল। হযরত ইয়াকুব (আ.) কে اني ليحزنني ان تذهبوا به واخاف ان يأكله الذئب বলার কারণে যা বাহ্যত তাওয়াক্কুলের পরিপন্থি ছিল কয়েক বৎসর পর্যন্ত বিচ্ছেদ বরদাশত করতে হয়েছিল।
ইবনে উম্মে মাকতূমের ঘটনায় আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন:عبس وتولي ان جائه الاعمي অথচ হুযুর (স.)-এর উদ্দেশ্য কেবলমাত্র এই ছিল যে, তিনি তো ঘরের মানুষ, যখন ইচ্ছা করবেন তখনই জিজ্ঞেস করে জেনে নিতে পারবেন। কিন্তু এসব শীর্ষ নেতাদের নিকট দীনের দাওয়াত পৌঁছানের সুযোগ হয়ত পুনরায় পাওয়া যাবে না।
حتي يعرف الغضب في وجهه : ‘এমনকি ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ তার চেহারায় প্রতীয়মান হচ্ছিল।’ হুযুর (স.) যেহেতু সকল সৃষ্টির মধ্যে অধিক সুদর্শন ও রূপের অধিকারী ছিলেন, তাই ক্রোধ ও প্রফুল্লতা উভয়ের চিহ্নই তার চেহারায় ফুটে উঠত।
ক্রোধের কারণ :
১. ঐ সাহাবীগণের ইবাদতে সীমালঙ্ঘন করার কারণে তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে থাকতে পারেন।
২. হুযুর (স.)-এর ইবাদতকে কম মনে করার কারণেও ক্রুদ্ধ হতে পারেন। কারণ নবী ও অ-নবীর ইবাদতের মধ্যে আকাশ-পাতালের ব্যবধান রয়েছে।
৩. ক্রটি ক্ষমা করাটা ইবাদত কমের কারণ মনে করা, অথচ তা হলো অধিক ইবাদতের দাবিদার। যেমন হুযুর (স.) বলেছেন: افلا اكون عبدًا شكورا আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না?
কোন মন্তব্য নেই