এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহর বাণী:وامسحوا برؤسكم; হযরত ইবনে মুসাইয়্যিব বলেন, মহিলারা পুরুষের মতই (পূর্ণ) মাথা মসেহ করবে। ইমাম মালেক (র.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, মাথার কিছু অংশ মসেহ করা কি জায়েয হবে? তিনি আব্দুল্লাহ বিন যায়েদের হাদীস দ্বারা দলীল দিয়েছেন।
যোগসূত্র: পূর্বের বাবে এটা বর্ণনা করা হয়েছিল যে, হালকা বেহুঁশী যাতে সংজ্ঞা-হুঁশ অবশিষ্ট থাকে তা অযু ভঙ্গকারী নয়। এ বাবে পূর্ণ মাথা মাসাহ করার কথা বর্ণনা করা হয়েছে, যা অযুরই অংশ। সুতরাং উভয় বাবের মধ্যে যোগসূত্র স্পষ্ট।
বাবের উদ্দেশ্য: এ বাব দ্বারা ইমাম বুখারীর উদ্দেশ্য হলো অযুতে পূর্ণ মাথা মাসাহ করা ফরজ তা বর্ণনা করা।
অনুবাদ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.) বলেন, একজন লোক তাঁকে প্রশ্ন করলো, আপনি কি আমাকে দেখাতে পারেন আল্লাহর রাসূল (সা.) কিভাবে অযু করতেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তারপর তিনি পানি আনিয়ে নিজের হাতের ওপর ঢেলে কব্জি পর্যন্ত দুইবার ধুলেন। তারপর তিনি বার কুলি করলেন এবং তিনবার নাকে পানি দিলেন। তারপর তিনবার মুখমণ্ডল ধুলেন। কনুই পর্যন্ত দুইহাত দুইবার ধুলেন। তারপর দুইহাত দিয়ে মাথা মাসাহ করলেন উভয় হাত আগে পিছনে টেনে। শুরু করলেন মাথার সম্মুখ ভাগ থেকে এবং নিয়ে গেলেন ঘাড় পর্যন্ত। তারপর যেখান থেকে শুরু করেছিলেন সেখানে ফিরিয়ে আনলেন। এরপর দুই পা ধুলেন।
، أَنَّ رَجُلاً، قَالَ لِعَبْدِ اللَّهِ بْنِ زَيْدٍ وَهُوَ جَدُّ عَمْرِو بْنِ يَحْيَى : বুখারী শরীফের রেওয়ায়েত সম্পূর্ণ স্পষ্ট। এবং هو যমীর رجلا-এর দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে। অর্থাৎ এক ব্যক্তি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদের নিকট জিজ্ঞাসা করল, সে লোকটি ছিল আমর বিন ইয়াহইয়ার দাদা। পরিভাষায় যেহেতু পিতার চাচা ও দাদার ভাইকেও দাদা বলা হয়, তাই এখানে جد শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। নতুবা সেই লোকটি আমর বিন ইয়াহইয়ার আপন দাদা নন; বরং তার আপন দাদা হলো উমারা বিন আবী হাসান। তার বংশ পরম্পরা হলো এরূপ: আমর বিন ইয়াহইয়া বিন উমারা বিন আবুল হাসান। আর আমর বিন আবুল হাসান লোকটি ছিল উমারা বিন আবুল হাসানের ভাই।
মোটকথা, বুখারী শরীফের রেওয়ায়েত অনুসারে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু আবু দাউদ ও মুয়াত্তা ইমাম মালেকের রেওয়ায়েতে এখানে কোনো বর্ণনাকারী থেকে সংক্ষিপ্তি হয়ে গেছে, এবং সেখানে ان رجلا শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে। আবু দাউদের ১৬ নং পৃষ্ঠার ইবারত হলো عن ابيه انه قال لعبد الله بن زيد وهو جد عمرو بن يحي এমতাবস্থায় هوযমীর আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদের দিকে প্রত্যাবর্তিত হচ্ছে। অথচ এ আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ আমর বিন ইয়াহইয়ার দাদাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নন।
মাথা মাসাহ-এর পরিমাণ:
ইমাম আবু হানীফার মতে মাথার চার ভাগের এক ভাগ মাসাহ করা ফরজ। আর পূর্ণ মাথা মাসাহ করা সুুন্নত।
ইমাম মালেক ও আহমদ -এর মতে পূর্ণ মাথা মাসাহ করা ফরজ। ইামাম বুখারীর মাযহাবও ইহাই। ইমাম বুখারী এ মাসআলায় ইমাম মালেক এর অনুসরণ করেছেন। আর মেয়েদের ব্যাপারে ইমাম আহমদ-এর মাযহাব হলো মেয়েদের মাথার সম্মুখের অংশ মাসাহ করলেই যথেষ্ট হবে।
ইমাম শাফেয়ীর মতে মাথা মাসাহ এর ফরজ আদায়ের জন্য বিশেষ কোনো পরিমাণ নেই; বরং যতটুকু মাসাহ করলে মাসাহ করা হয়েছে এরূপ বলা সহীহ হবে ততটুকু মাসাহ করলেই মাসাহ-এর ফরজ আদায় হয়ে যাবে। আর তা হলো কমপক্ষে তিন চুল।
فـأقـبـل بـهـمـا وأدبـر : এখানে এ বিষয়টি স্মরণ রাখা উচিত যে, অভিধানে إقـبـال শব্দের অর্থ হলো: হাতকে পেছন থেকে সামনের দিকে আনা। إدبـار শব্দের অর্থ হলো: সামনে থেকে পেছনের দিকে নেওয়া। এ বাক্যটি দ্বারা বাহ্যিকভাবে এরূপ মনে হচ্ছে যে, মাসেহের সূচনা মস্তকের পেছনের দিক থেকে হয়েছে; কিন্তু পরবর্তী বাক্য অর্থাৎ بـدأ بـمـقـدم رأسـهসামনে থেকে সূচনা করার কথাটা স্পষ্ট। অতএব, হাদীসের শুরু ও শেষে বৈপরীত্য মনে হচ্ছে। এর সবচেয়ে উত্তম জবাব হলো, প্রথম বাক্যে واو’অক্ষরটি সাধারণ একত্রিতকরণের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, তারতীবের জন্য নয়।
এর দলীল হলো باب الوضوء من التور-এ আছে فادبر بيديه واقبل এখানে ادبار আগে আনা হয়েছে। যা দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, মাথা মাসাহ করার সূচনা সামনের দিক থেকে করাটাই হুযুর (সা.)-এর সাধারাণ অভ্যাস ছিল। এটিই হলো সর্বোত্তম ও বিশুদ্ধতম জওয়াব। জুমহূর ফোকাহা ও মুহাদ্দিসীনে কেরামের মতে মাযহাব এটিই যে, মাথা মাসাহ এর সূচনা সামনের দিক থেকে করাটা সুন্নত। শুধুমাত্র হযরত ওয়াকি’ বিন জাররাহ পিছন দিক থেকে করাকে মাসনূন বলে থাকেন।
ইমাম বুখারীর দলীল: ইমাম বুখারী তার মতের সমর্থনে সর্বপ্রথম কুরআনের আয়াত وامسحوا برؤسكم উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন এখানে ب টি অতিরিক্ত। আর শুধুমাত্র رأس দ্বারা পূর্ণ মাথাকেই বুঝানো হয়ে থাকে। বুঝা গেল আয়াতে পূর্ণ মাথাকেই মাসাহ করতে বলা হয়েছে। দ্বিতীয় দলীল হলো বাবের হাদীস।
জবাব: এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, رأس পূর্ণ মাথাকেই বলা হয়। কিন্তু আয়াতে কারীমায় وامسحوا برؤسكم-এর মধ্যে মাথায় মাসাহ এর যে হুকুম তা মাথার কিছু অংশ মাসাহ করার দ্বারা আদায় হবে যাবে। কারণ, মূলনীতি হলো কোনো فعل বা ক্রিয়া বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য مفعول-এর সর্বাংশে তা পতিত হওয়া আবশ্যক নয়; বরং কিয়দাংশে পতিত হওয়াই যথেষ্ট। যেমন ضربت زيدا বাক্যটি তখনও বলা যাবে যখন যায়েদের কোনো অংশে তার ক্রিয়া পতিত হয়। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এরূপই হয়ে থাকে যে, মাফউলের পূরোটার উপর ক্রিয়া খুবই কম পতি হয়। এখানেই তদ্রƒপ হবে। মাথা মাসাহর যে হুকুম রয়েছে তা মাথার একাংশ মাসাহ করার দ্বারই আদায় হয়ে যাবে। এখন সে অংশটি কতটুকু তা কুরআনে উল্লেখ নেই। বরং পরিমাণের বিষয়টি মুজমাল বা অস্পষ্ট। যেমন يدين-এর সাথে الي المفرافق এবং رجلين-এর সাথে الي الكعبين-এর উল্লেখ রয়েছে, তাই সেগুলোর মধ্যে কোনো অস্পষ্টতা নেই। কিন্তু মাসাহ এর ব্যাপারে আয়াতে কোনো সীমা উল্লেখ নেই। আয়াতের মধ্যে যেহেতু অস্পষ্টতা রয়েছে তাই তার বয়ান এবং তাফসীরের জন্য নবী করীম (সা.)-এর আমলের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, তিনি মাথার এক চতুর্থাংশ মাসাহ করেছেন। যেমন মুসলিম শরীফে এবং নাসাঈ শরীফে হযরত মুগীরা বিন শু’বা (রা.) এবং হযরত আনাস বিন মালিক (রা.)-এর হাদীসে ناصية পরিমাণ মাসাহ এর কথা উল্লেখ রয়েছে। আর ناصية মাথার এক চতুর্থাংশ হয়ে থাকে।
মোটকথা, হানাফীদের মাযহাবে সকল হাদীসের উপর আমল হয়ে যায়। বাবের হাদীসে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ-এর াহদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, পূর্ণ মাথা মাসাহ করতে হবে। হানাফীরা বলেন, আলহামদুলিল্লাহ আমরা এর উপরও আমল করি। হানাফীরা সুন্নত হিসেবে পূর্ণ মাথা মাসাহ করে থাকে। তবে ফরজ আদায়ের ক্ষেত্রে ناصية তথা মাথার এক চতুর্থাশ পরিমাণ মাসাহই যথেষ্ট।
কোন মন্তব্য নেই