ইমাম
বুখারী (র.) এ সকল মুহাদ্দিসীনের রুচীকে পাশ কাটিয়ে সম্পূর্ণ
ব্যতিক্রমধর্মী, সর্বাধিক গুরুত্ব, তৎপর্যপূর্ণ ও উচ্চ মর্যাদাশীল মৌলিক
বিষয় بَـدْأالـوَحْـي দ্বারা স্বীয় কিতাবের সূচনা করেছেন।
وجه ابتداء البخاري ببدأ الوحي - بدؤ الوحي
দ্বারা কিতাব শুরুর কারণঃ
(বাগানে গিয়ে সকলেই ফুল প্রত্যক্ষ করল, কিন্তু তাতে না আছে তোমার ন্যায় রং না তোমার ন্যায় সুঘ্রাণ)
ইমাম
বুখারী (র.) কিতাবুল ঈমানের পূর্বে بـابُ بَـدْأ الـوَحْـي দ্বারা সূচনা
করে ইঙ্গিত করেছেন যে, ঈমান সম্পর্কিত কোনো বিষয়ই ততক্ষণ পর্যন্ত
গ্রহণযোগ্য হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তা অহীর আলোকে প্রমাণিত না হবে। বুঝা গেল
যে, আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক প্রেরিত অহীই হলো দীনের ভিত্তি। শরীয়তের যাবতীয়
বিষয়াদির উৎস হলো অহী। আল্লাহর সন্তুষ্টিবাচক ইলম অহী ব্যতীত হতেই পারে না।
সুতরাং সর্বাধিক নির্ভরতা ও আস্থাভাজন জিনিস হলো অহী, তা মাতলূ (কুরআন)
হোক বা গাইরে মাতলূ তথা হাদীস।
দার্শনিকগণ
মানতিকশাস্ত্রের সংজ্ঞায় বলেন:تـعـصـم مـراعَـاتـهـا الـذهـن عـن
الـخـطـاء فـي الـفـكـر (মানতিক এমন শাস্ত্রের নাম যা যেহেন/মেধাকে
চিন্তাগত ভুলভ্রান্তি থেকে রক্ষা করে) অথচ মানতিক স্বয়ং ভুলভ্রান্তিমুক্ত
নয়, তাহলে তা কিভাবে অন্যকে ভুলভ্রান্তি থেকে রক্ষাকারী হবে? এ কারণেই তো
দার্শনিকদের মাঝে শত-সহস্র মতবিরোধ বিদ্যমান। তাদের কেউ বলেন, দেহ হলো
هَـيُـولَـي (মূলবস্তু, আদিবস্তু) ও صُـورة (আকৃতি) দ্বারা গঠিত; আবার কেউ
বলেন পরমাণু দ্বারা গঠিত। কোনো কালে পৃথিবীকে গতিশীল ধারণা করা হতো; আবার
দীর্ঘকাল যাবৎ সমস্ত বিজ্ঞানীগণ আকাশমÐলীকে গতিশীল ধারণা করে আসছেন।
সা¤প্রতিকালের বিজ্ঞানীগণ পুনরায় পৃথিবীকে গতিশীল বলে মতপোষণ করতে শুরু
করেছেন। কবি বলেন:
(দিলের
নূর তুমি সিনা থেকে অন্বেষণ করো না, অন্ধ চক্ষু থেকে আলোর আশা করো না।
ইউনানি/গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞান তো অনেক অধ্যয়ন করেছো, ঈমানের জ্ঞান-বিজ্ঞানও
তুমি অধ্যয়ন কর।)
ইলম
অর্জনের উপকরণ তিনটি। শরহে আকাঈদে আছেঃ اسـبَـابُ الـعِـلْـمِ ثَـلاثَـة
الـحَـوَاس الـسـلِـيْـمَـة والـعَـقْـل والـخَـبْـرُ الـصـادِق ইলম
অর্জনের উপকরণ তিনটি। ১. সুস্থ অনুভূতিশক্তি। ২. আক্ল বা জ্ঞান-বুদ্ধি। ৩.
সত্য সংবাদ। সত্য সংবাদ আবার দু’প্রকারঃ ১. خـبـر مُـتَـوَاتِـر (অসংখ্য
অগণিত লোকের ধারাবহিক সূত্রে প্রাপ্ত সংবাদ) ২. অহী বা প্রত্যাদেশ। এভাবে
ইলমের উপকরণ বা মাধ্যম চারটি হয়ে যায়। কিন্তু বুদ্ধিগত ও দলিলগতভাবে এ কথা
প্রমাণিত যে, এ সবগুলির মধ্যে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য হলো অহী।
আকল
বা জ্ঞান-বুদ্ধির মধ্যে ভুলত্রæটি সংঘটিত হওয়া উপরে প্রমাণিত হয়েছে যে,
জ্ঞানবানদের মাঝে অনেক মতবিরোধ রয়েছে এবং তারা একে অপরের মতবাদকে খণ্ডন করে
থাকেন। তেমনিভাবে অনুভূতিশক্তিও ভুল করে থাকে। যেমন চাঁদনি রাতে মেঘ ভেসে
বেড়ায়, কিন্তু আমরা দেখতে পাই যে, চাঁদ দৌড়াচ্ছে; রেলগাড়িতে বসে আছি, নিকট
দিয়ে অন্য গাড়ি অতিক্রম করার সময় মনে হবে যে, আমার গাড়িটিই চলছে। চলন্ত
গাড়ি থেকে বাহিরে দৃষ্টিপাত করলে বৃক্ষরাজি সবকিছুকে চলমান মনে হবে। এটা
হলো দৃষ্টির ত্রæটি। তেমনিভাবে শ্রবণশক্তি, আস্বাদনশক্তি ইত্যাদি ইন্দ্রীয়
থেকেও ত্রæটি হয়ে থাকে। যেমন পিত্ত/প্লীহাবৃদ্ধির কারণে মধু তিক্ত মনে হবে,
এবং জন্ডিসগ্রস্তের নিকট সকল বস্তু হলুদ মনে হবে। ট্যারা ব্যক্তি একটিকে
দুটি দেখতে পায়। সুতরাং ভুল-ত্রুটি থেকে মুক্ত কেবল তা-ই হতে পারে যা অহী
দ্বারা প্রমাণিত। খবরে মুতাওয়াতির যদিও নির্ভরযোগ্য কিন্তু তা আবার অনুভূতি
পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। অনুভূতিহীনের ক্ষেত্রে তার নির্ভরোগ্যতা আবশ্যম্ভাবী
নয়।
আউলিয়াগণের
কাশ্ফও কিন্তু বিভিন্ন হয়ে থাকে। পৃথিবীর সর্বাধিক পূত-পবিত্র দল হলো
সাহাবায়ে কিরামের দল তারা ও কিন্তু মতবিরোধ থেকে মুক্ত থাকতে পারেননি।
কেবলমাত্র
আম্বিয়া (আ.) -এর দলই এমন একটি দল যাদের মধ্যে কোনো মৌলিক মতবিরোধ
পরিলক্ষিত হয়নি। শাখাগত বিষয়াদিতে তাঁদের মধ্যে যে মতবিরোধ দেখা যায় তাও
মূলত মতবিরোধ নয়; বরং সেগুলি যুগ বা কালের বিভিন্নতার কারণে পরিলক্ষিত
হয়েছে। (যাকে মতবিরোধ বলা যায় না) এর উদাহরণ এমন মনে করুন যে, কোনো একজন
রোগী ডাক্তারের নিকট গেল। ডাক্তার মনস্থির করলেন যে, প্রথমে কয়েকদিন তাকে
পেট শক্ত করার ঔষধ দিবেন, অতঃপর পেট নরম করার ঔষধ, অতঃপর ঠাণ্ডা করার ঔষধ
এবং তারপর শক্তিবর্ধক ঔষধ দিবেন। ডাক্তার তাকে প্রথম প্রকার ঔষধ দেওয়ার
পরপরই ডাক্তার মারা গেলেন; এখন লোকটি অপর ডাক্তারের নিকট গেলে ডাক্তার তাকে
দ্বিতীয় প্রকারের ঔষধ দিবেন, এরপর তৃতীয় ডাক্তারের কাছে গেলে তিনি তাকে
তৃতীয় প্রকারের ঔষধ দিবেন, এবং চতুর্থ ডাক্তারের কাছে গেলে তিনি তাকে
শক্তিবর্ধক ঔষধ দিবেন। বাহ্যত রোগী মনে করবে প্রতিটি নতুন ডাক্তার তার
পূর্ববর্তী ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন পাল্টে দিয়েছে, এবং সে বলবে এ সকল
ডাক্তারদের চিকিৎসায় বিভিন্নতা রয়েছে। অথচ বাস্তবে তাদের মাঝে কোনো মতবিরোধ
বা বিভিন্নতা নেই। প্রথম ডাক্তারের চিকিৎসাই যদি অব্যাহত থাকত তাহলে তিনিও
স্বীয় মনস্থিরকৃত চিত্র অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের পর প্রেসক্রিপশন পরিবর্তন
করে দিতেন। মোটকথা আম্বিয়া (আ.)গণের মাঝে বস্তুত কোনো মতবিরোধ নেই। হাদীসে
আছেঃ (الأنْـبِـيَـاء اخْـوَة لِـعَـلات امـهَـاتِـهِـم شَـتـي
ودِيْـنُـهُـم واحِـد (مـتـفـق عـلـيـه) (নবীগণ বৈমাত্রেয় ভ্রাতৃতুল্য,
কিন্তু তাদের দীন একই) অর্থাৎ নবীগণের ফয়েযের উৎস একইÑ তা হলো আল্লাহ
প্রদত্ত অহী। এ কারণে মূলনীতিতে কোনো মতবিরোধ নেই; তবে উম্মতের স্বভাবের
বিভিন্নতার কারণে বিচ্ছিন্ন ও শাখাগত বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। এ কারণেই এটা
সম্ভবপর নয় যে, এক নবী অপর নবীর শরীয়তের ছিদ্রান্বেষণ বা মিথ্যায়ন করবে।
যেমনটা অন্যান্য দলের মতবিরোধের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে, যে তারা একে অপরের
মতবাদকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে থাকে।
মোটকথা
যতক্ষণ পর্যন্ত অহীর সাথে সম্পৃক্ততা না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো বিষয়ের
বিশুদ্ধতার প্রতি আস্থা স্থাপন করা যায় না। নবীর মতামতও কেবল তার ব্যক্তিগত
মত হিসেবে তা গ্রহণযোগ্য নয়, যদিনা অহীর সাথে সম্পৃক্ত হয়। যেমন হযরত
বারীরা (রা.)-এর ঘটনা এবং খেজুর গাছে পরাগায়নের ঘটনা দ্বারা তা সুস্পষ্ট।
সুতরাং বিশ্বজাহানের সৃষ্টিকর্তা মহান রব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি ও
অসন্তুষ্টি জানার জন্যে অকাট্য, সর্বব্যাপী, বিশ্বজনীন হিদায়েতের প্রয়োজন
রয়েছে, এবং সেটি অহী ব্যতীত অন্য কিছুই নয়। কেবলমাত্র অহীই এমন জিনিস যা
অকাট্য, সুনিশ্চিত, বিশ্বজনীন সফলতার জিম্মাদার হতে পারে। আল্লাহ রব্বুল
আলামীনের ইরশাদঃ
واِنـهُ
لَـكِـتـب عَـزِيـز لا يَأتِـيـهِ الـبَاطِـلُ مِـنْ بَـيْـنِ يَـدَيْـهِ
ولا مِـنْ خَـلْـفِـهِ تَـنْـزِيـلٌ مِـنْ حَـكِـيـمٍ حَـمِـيـد
এ
কুরআন বড় মর্যাদাপূর্ণ গ্রন্থ। যাতে অবাস্তব কোনো বিষয় সামনের দিক থেকে
এবং পিছনের দিক থেকে আসতে পারে না। এটি প্রজ্ঞাবান প্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ
থেকে নাযিলকৃত। (পারাঃ ১৪)
এ কারণেই ইমাম বুখারী (র.) بَـاب كَـيْـفَ كَـانَ بَـدْأالـوَحْـيِ إلَـي رَسُـولِ الـلـه صـ দ্বারা কিতাবের সূচনা করেছেন।
আল্লামা
কাশমিরী (র.) এর একটি অতি সূক্ষ কারণ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, অহীর
সূচনা দ্বারা কিতাব শুরু করা দ্বারা ইমাম বুখারীর উদ্দেশ্য হলো এ কথা
সাব্যস্ত করা যে, আল্লাহ তা‘আলার সাথে বান্দার সম্পর্ক অহীর মাধ্যমেই হয়ে
থাকে। সুতরাং এ কথার প্রমাণ প্রয়োজন যে, আমরা আল্লাহর সাথে সম্পৃক্তÑআর তার
সেতুবন্ধন হলো ঈমান। আর একথাও সুস্পষ্ট যে, এ সম্পর্ক (অর্থাৎ ঈমান) আমলকে
কামনা করে, আর আমলের জন্যে ইলম আবশ্যক। এ সামঞ্জস্যতার কারণেই ইমাম বুখারী
(র.) অহীর পর কিতাবুল ঈমান এনেছেন, অতপর কিতাবুল ইলম এনেছেন, এরপর থেকে
আমলের ধারাবাহিকতা শুরু করেছেন।
মোটকথাঃ
কিতাবের সূচনা অহী দ্বারা করেছেন, অতপর অহীর বিধি-বিধান, মূলনীতি,
শাখা-প্রশাখা বর্ণনা করেছেন। এবং কিতাবের সমাপ্তি করেছেন كَـلِـمَـتَـانِ
حَـبِـيْـبَـتَـانِ اِلَـي الـرحْـمـن خَـفِـيْـفَـتَـانِ عَـلَـي
الـلـسَـان ثَـقِـيْـلَـتَـانِ فِـي الـمِـيْـزَان الـخ... এ হাদীসটি
দ্বারা, যেন অহী দ্বারা নাযিলকৃত আহকামের প্রতিদান সম্পর্কে অবহিতি হয়ে
যায়।
কোন মন্তব্য নেই