قـولـه عـن عَـائِـشـة الـخ : বাহ্যিক দৃষ্টিতে এ হাদীসটি মুরসাল।
কারণ, যখন
ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল তখন হযরত আয়েশা (র.) জন্মগ্রহণও করেননি। কিন্তু বাস্তবতা হলো
তিনি হুযুর (স.) থেকে পরবর্তীতে সরাসরি এ ঘটনাটি শ্রবণ করেছিলেন। এমতাবস্থায় এ হাদীসটি
নিঃসন্দেহে মুত্তাসিল হয়ে যাবে। কিন্তু যদি মেনে নেওয়া হয়, তিনি এটি হুযুর
(স .) থেকে শ্রবণ করেননি,
তাহলে
কোনো সাহাবী থেকে শুনে বর্ণনা করেছেন। তাতেও প্রশ্ন নেই। কারণ, সাহাবীর মুরসাল হাদীস
আমাদের নিকট গ্রহণযোগ্য।
اولُ مـا بُـدِيَ بـِـهِ : [সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ (স.)-এর উপর
যে জিনিস দ্বারা অহীর সূচনা হয়েছিল, তা ছিল নেকস্বপ্ন।] مـن الـوحـيদ্বারা বুঝা গেল যে, স্বপ্নও অহীর একটি প্রকার। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) -এর ইরশাদ
রয়েছে:رُؤيـاالانـبـيـاء وحـي
(নবীগণের স্বপ্ন অহী।) :উমদাতুল
কারী।
প্রশ্ন : আমরা জানতে পারলাম যে, নবীগণের স্বপ্ন অহী।
তাহলে হযরত ইবরাহীম (আ.) :فـانـظـرمـاذا تـريবলে ইসমাইল (আ.)-এর নিকট জিজ্ঞেস
করলেন কেন? যদি
তিনি অহী মনে করতেন তাহলে তার মতামত জানতে না চেয়ে সরাসরি তা বাস্তবায়ন করতেন।
উত্তর : হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর এই
মতামত জানতে চাওয়াটা সংশয়ের ভিত্তিতে ছিল না; বরং তার উদ্দেশ্য ছিল ইসমাঈল (আ.)-এর পরীক্ষা করা যে, তিনিও আল্লাহর নির্দেশের
সম্মুখে নিজেকে সমর্পণ করেন কিনা? আল্লাহ না করুন! যদি ইসমাঈল (আ.) অস্বীকৃতিও জানাতেন তাহলে তিনি
এ নির্দেশ পালনে বিন্দুমাত্র পিছপা হতেন না। তাছাড়া তার উদ্দেশ্য এও হতে পারে যে, জিজ্ঞেস করা দ্বারা
জবাই-এর পদ্ধতি নির্ধারণ করা, কারণ স্বেচ্ছায় জবাই ও জোরপূর্বক জবাই এর পদ্ধতি ভিন্ন।
প্রশ্ন:হযরত ইবরাহমী (আ.)-এর স্বপ্ন অহী ছিল, যেমনটি তা বাস্তবায়নে
তাঁর পদক্ষেপগ্রহণ এবং ইসমাঈল (আ.) উত্তর افـعـل مـا تـومـرদ্বারা স্পষ্ট হলো; বরং ইসমাঈল (আ.)
افـعـل مـاتـري
-এর পরিবর্তে افـعـل ماتـومـرবলা এটি একটি স্বতন্ত্র দলিল। তাহলে তা বাস্তবায়িত হলো না কেন? অর্থাৎ নির্দেশ ছিল
সন্তান জবাই করার কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। এর অনেকগুলি উত্তর দেওয়া হয়েছে:
উত্তর :
১. শায়খে আকবর (র.) জবাব দিয়েছেন
যে, স্বপ্ন
বাস্তবায়ন দুটি পদ্ধতিতে হয়ে থাকে:
ক. স্বপ্নে যা দেখবে বাস্তবেও তাই
সংঘটিত হওয়া।
খ. স্বপ্নে যা দেখেছে তার ভিন্নরূপে
তা বাস্তবায়িত হওয়া। যেমন হুযুর (স.) স্বপ্নে দেখেছেন যে, তিনি তরবারি নাড়া
দেওয়ার সাথে সাথে তরবারির কিছু অংশ ভেঙ্গে যায়। আবার নাড়া দিলে পুনরায় তা ঠিক হয়ে যায়।
তিনি একটি জবাইকৃত গাভীও দেখতে পেলেন। এর ব্যাখ্যা করলেন তিনি এভাবে যে, তরবারি ভেঙ্গে যাওয়ার
ব্যাখ্যা হলো উহদে মুসলামনাদের সাময়িক পরাজয়। তরবারি ঠিক হয়ে যাওয়ার ব্যাখ্যা হলো অবশেষে
মুসলমানদের বিজয়। আর জবাইকৃত গাভীর ব্যাখ্যা হলো মুসলমান শহীদগণ।
হযরত ইউসূফ (আ.) স্বপ্নে দেখেছিলেন
:اِنـي رَأيـتُ اَحَـدَ عَـشَـرَ كَـوْكَـبًـا
والـشمْـسَ والـقَـمَـرَ رَأيْـتُـهُـم لـي سَـاجِـدِيـنএখানে ১১টি নক্ষত্রের ব্যাখ্যা হয়েছে ১১ ভাই এবং সূর্য ও চন্দ্রের
ব্যাখ্যা হয়েছে পিতামাতা। তেমনিভাবে اِنـي ارنِـي اَعْـصِـرُ خَـمْـرًا - انِـي
ارنِـي اَحْـمِـلُ فَـوقَ رَأسِـي خُـبْـزًا تَـأكُـلُ الـطـيـرُ مِـنْـهُ - اِنـي
ارى سَـبْـعَ بَـقَـرَات سِـمَـان يَـأكُـلُـهُـن سَـبْـع عِـجَاف وسَـبْـعَ سُـنْـبُـلـت
خُـضْـر وَاُخَـرَ يـبِـسـتএ
সমস্ত স্বপ্নের ব্যাখ্যা পবিত্র কুরআনেই বর্ণিত হয়েছে।
তাছাড়া হুযুর (স.) দুধের ব্যাখ্যা
করেছেন ইলম দ্বারা এবং জামার ব্যাখ্যা করেছেন দীন দ্বারা।
মোটকথা কখনো স্বপ্নের ব্যাখ্যা তার
বাহ্যিকতার পরিপন্থী কিছু হয়ে থাকে। তেমনিভাবে এখানে সন্তান জবাই -এর ব্যাখ্যা ছিল
দুম্বা জবাই। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশ পালনে অধিক স্বতস্ফূর্ততার কারণে হযরত ইবরাহীম
(আ) -এর ধ্যান সেদিকে ধাবিত হয়নি এবং তিনি সন্তান জবাইয়ের জন্যেই প্রস্তুত হয়ে যান।
শায়খে আকবর (র.)-এর এ জবাব সন্তোষজনক
নয়। কারণ এতে কয়েকটি সমস্যা আছে।
ক. নবী থেকে যদিও ইজতিহাদী ভুল হতে
পারে, কিন্তু
পরক্ষণেই সে ব্যাপারে সতর্ক করা হয়। কিন্তু অকারণে নবীর কর্মকে ভুল সাব্যস্তকরণ সঠিক
নয়। হ্যাঁ, তবে
যদি এর অন্য কোনো সদুত্তর না থাকত তাহলে বাধ্য হয়ে ইজতিহাদী ভুল সাব্যস্ত করার অবকাশ
ছিল।
খ. যদি দুম্বা জবাই উদ্দেশ্য হতো
তাহলে:قـد صـدقـت الـرؤيـاকেন বলা হলো?
গ. وفـديـنـه بـذبـح عـظـيـمএ কথার দলিল যে, মূল নির্দেশ ছিল
সন্তান জবাইয়েরই। দুম্বা জবাই ছিল তার ফিদিয়া ব বদলস্বরূপ।
ঘ. যদি সন্তান জবাইয়ের নির্দেশ না
হতো, তাহলে
তাকে بـلاء مـبـيـنকেন
বলা হলো? কারণ
দুম্বা জবাই তো তেমন বড় পরীক্ষার বিষয় নয়।
২. আল্লামা আনোয়ার শাহ কাম্মিরী
(র.)ও একটি সুন্দর উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেন স্বপ্নে তিনি যতটুকু দেখেছিলেন বাস্তবেও
ততটুকু সম্পাদিত হয়েছে। স্বপ্নে শুধু দেখেছিলেন:انـي اذبـحـكআমি তোমাকে জবাই করছি। জবাই হয়ে গেছে এটা তো দেখেন নি। বাস্তবেও
তিনি জবাই করা শুরু করেছিলেন, সুতরাং স্বপ্নের বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো প্রশ্ন রইল না।
তারপরও কেউ প্রশ্ন করতে পারেন যে, হযরত ইবরাহীম (আ.)
যদি জানতে পারেন যে,
তার
জবাই করা দ্বারা কোনো ফলাফল আসবে না, তাহলে তো তা بـلاء مـبـيـنহলো না। আর যদি তিনি জানতে না পারেন তাহলে তো বলা হবে যে নবী
হয়ে তিনি কিভাবে জানতে পারলেন না, এটা নবীর জন্যে একটা ত্রুটি।
এর উত্তরে বলা হবে এ প্রশ্ন উত্থাপন
সঠিক নয়। কারণ নবীর পক্ষে শরীয়ত বহির্ভূত বিষয়ের জ্ঞান না থাকা এটা কোনো ত্রুটির বিষয়
নয়। আর না তো এমন ধরনের অজ্ঞতাকে নবীর ত্রুটি বলা সঠিক হবে।
সর্বোত্তম উত্তর:
এর সুন্দর ও বিশুদ্ধ উত্তর দিয়েছেন
আল্লামা ইবনুল কাইয়িম (র) যাদুল মা‘আদ গ্রন্থে। তিনি বলেন সন্তানকে জবাই করার নির্দেশই ছিল এবং তিনি তা বুঝেছেনও এবং
উদ্বুদ্ধ হয়ে তার বাস্তবায়ন শুরুও করে দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবায়নের পূর্বেই তা রহিত
হয়ে যায়। কারণ উদ্দেশ্য তো ছিল কেবলমাত্র পরীক্ষা করা:তা হয়ে গেছে।এক্ষেত্রে বেশী থেকে বেশী এমন প্রশ্ন উত্থাপিত
হতে পারে যে, এর
দ্বারা ‘বাস্তবায়নের পূর্বে
নির্দেশ রহিত হওয়া’আবশ্যক হয়। কিন্তু
এতে কোনো সমস্যা নেই। কারণ এর অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। যেমন লাইলাতুল মিরাজে নামাজ ফরজ
হয়েছিল ৫০ ওয়াক্ত,
কিন্তু
বাস্তবায়নের পূর্বেই তা রহিত হয়ে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৫ ওয়াক্ত। (ইরশাদুল কারী, সংক্ষেপিত)
فـكـان لا يـري رؤيـا: [হুযুর (স.) স্বপ্নযোগে যা কিছু দেখতেন তা তার নিকট ভোরের শুভ্রতার ন্যায়
প্রতীয়মান হয়ে যেত।] অর্থাৎ তিনি যে স্বপ্ন দেখতেন তার ব্যাখ্যা সম্পূর্ণরূপে স্পষ্ট
হয়ে যেত। যেমনিভাবে সুবহে সাদিকের আলো স্পষ্ট হয়ে যায় এবং সকাল হওয়ার ব্যাপারে আর কোনো
সন্দেহ থাকে না। এ উত্তম স্বপ্ন ছিল নুবওয়াতের ভূমিকাস্বরূপ।
হুযুর (স.)-এর স্বপ্ন তিনটি গুণে
গুণান্বিত ছিল। صـالـحـة، صـادقـة، واضـحـةউত্তম/নেক, সত্য ও সুস্পষ্ট।
صـالـحـة : এমন স্বপ্ন যার বাহ্যিক দিকও বরকতময় এবং যার ব্যাখ্যাও সুন্দর হয়।
যাতে ক্ষতির কোনো দিক থাকে না।
صـادقـة : এমন স্বপ্ন যা সত্য হয় এবং যার ব্যাখ্যা বাস্তবসম্মত। চাই তা আনন্দদায়ক
হোক বা তাতে ক্ষতির দিক বিদ্যমান থাকুক। যেমন উহুদ যুদ্ধের সময় হুযুর (স.) স্বপ্নে
দেখেছেন যে, তিনি
তরবারি নাড়া দেওয়ার সাথে সাথে তরবারির কিছু অংশ ভেঙ্গে যায়। আবার নাড়া দিলে পুনরায়
তা ঠিক হয়ে যায়। তিনি একটি জবাইকৃত গাভীও দেখতে পেলেন। এর ব্যাখ্যা করলেন তিনি এভাবে
যে, তরবারি
ভেঙ্গে যাওয়ার ব্যাখ্যা হলো উহদে মুসলামনাদের সাময়িক পরাজয়। তরবারি ঠিক হয়ে যাওয়ার
ব্যাখ্যা হলো অবশেষে মুসলমানদের বিজয়। আর জবাইকৃত গাভীর ব্যাখ্যা হলো মুসলমান শহীদগণ।
এখানে বাহ্যত মুসলমানদের ক্ষতির বিষয় ছিল, তথাপি তা ছিল বাস্তবসম্মত। সুতরাং এটি صـادقـةকিন্তু صـالـحـةনয়।
তবে একটি বিষয় স্মরণ রাখতে হবে যে, আম্বিয়া (আ.)-এর ব্যাপারে সকল স্বপ্নই সত্য এবং নেক। যদিও
দুনিয়ার দিক থেকে তা সুখকর নাও হতে পারে। যেমন এখানে আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়া নিঃসন্দেহে
পরকালীন চিরন্তন জীবন লাভের উপায়, যা পার্থিব জীবন অপেক্ষা উৎকৃষ্ট ও কল্যাণকর।
واضـحـة : এমন স্বপ্ন যার ব্যাখ্যা একেবারেই স্পষ্ট। উদাহরণত অহী অবতীর্ণ হওয়ার
পূর্বে হুযুর (স.) অদৃশ্য শব্দ শ্রবণ করা, প্রস্তর ও বৃক্ষরাজি তাঁকে সালাম-কালাম করা। এমনকি নবীজী
(স.) বলেন আমি ঐ পাথরটিকে চিনতে পারি যে আমাকে সালাম দিত। এ সবকিছুই তাঁকে অহীর সাথে
ঘনিষ্ট করার জন্যে এবং অহীর বড়ত্ব ও মাহাত্ম প্রকাশ করার জন্যে। যেমন রেলগাড়ি আসার
পূর্বে স্টেশনে সিগন্যাল,
ঘণ্টি, প্লাগ ইত্যাদির ব্যবস্থাপনা
শুরু হয়ে যায়। তাছাড়া যদি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও দ্রæতগামী ট্রেন আসতে
থাকে তাহলে পূর্ব থেকেই তার জন্যে প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়।
কোন মন্তব্য নেই