Header Ads

সহীহ বুখারীঃ কিতাবুস সলাহঃ উরু প্রসঙ্গে আলোচনা

باب مَا يُذْكَرُ فِي الْفَخِذِ

পরিচ্ছেদ: উরু প্রসঙ্গে আলোচনা

وَيُرْوَى عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ وَجَرْهَدٍ وَمُحَمَّدِ بْنِ جَحْشٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রالْفَخِذُ عَوْرَةٌ  وَقَالَ أَنَسٌ حَسَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ فَخِذِهِ. وَحَدِيثُ أَنَسٍ أَسْنَدُ، وَحَدِيثُ جَرْهَدٍ أَحْوَطُ حَتَّى يُخْرَجَ مِنِ اخْتِلاَفِهِمْ. وَقَالَ أَبُو مُوسَى غَطَّى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رُكْبَتَيْهِ حِينَ دَخَلَ عُثْمَانُ. وَقَالَ زَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ أَنْزَلَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَفَخِذُهُ عَلَى فَخِذِي فَثَقُلَتْ عَلَيَّ حَتَّى خِفْتُ أَنْ تُرَضَّ فَخِذِي.

(ইমাম বুখারী বলেন) ইবনে আব্বাস, জারহাদ এবং মুহাম্মদ বিন জাহশ রাসূলুল্লাহ (সা.) হতে বর্ণনা করেছেন, الْفَخِذُ عَوْرَةٌ ‘উরু হলো সতর’। হযরত আনাস (রা.) বলেন, (খায়বারের যুদ্ধের সময়) রাসূলুল্লাহ (সা.) উরু হতে কাপড় সরিয়ে দিয়েছিলেন। ইমাম বুখারী বলেন, হযরত আনাস বর্ণিত হাদীসের সনদ অধিকতর শক্তিশালী। আর জারহাদ বর্ণিত হাদীস (দীনের বিষয়ে) অধিকতর সতর্কতামূলক। এত মতভেদ হতে বের হওয়া যায়। হযরত আবু মূসা আশ‘আরী (রা.) বলেন, হযরত ওসমান (রা.) (সেখানে) প্রবেশ করলে নবী করীম (সা.) তার হাঁটু ঢেকে ফেললেন। হযরত যায়েদ বিন সাবিত (রা.) বলেন, নবী করীম (সা.)-এর উরু আমার উরুর উপর ছিল। এ সময়ে তার উপর ওহী অবতীর্ণ হলো। তা আমার উপর এত ভারী মনে হলো যেন আমার আশঙ্কা হচ্ছিল যে, আমার উরু ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে।

হাদীস

حَدَّثَنَا يَعْقُوبُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، قَالَ حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ ابْنُ عُلَيَّةَ، قَالَ حَدَّثَنَا عَبْدُ الْعَزِيزِ بْنُ صُهَيْبٍ، عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم غَزَا خَيْبَرَ، فَصَلَّيْنَا عِنْدَهَا صَلاَةَ الْغَدَاةِ بِغَلَسٍ، فَرَكِبَ نَبِيُّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَرَكِبَ أَبُو طَلْحَةَ، وَأَنَا رَدِيفُ أَبِي طَلْحَةَ، فَأَجْرَى نَبِيُّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي زُقَاقِ خَيْبَرَ، وَإِنَّ رُكْبَتِي لَتَمَسُّ فَخِذَ نَبِيِّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم، ثُمَّ حَسَرَ الإِزَارَ عَنْ فَخِذِهِ حَتَّى إِنِّي أَنْظُرُ إِلَى بَيَاضِ فَخِذِ نَبِيِّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم، فَلَمَّا دَخَلَ الْقَرْيَةَ قَالَ ‏"‏ اللَّهُ أَكْبَرُ، خَرِبَتْ خَيْبَرُ، إِنَّا إِذَا نَزَلْنَا بِسَاحَةِ قَوْمٍ فَسَاءَ صَبَاحُ الْمُنْذَرِينَ ‏"‏‏.‏ قَالَهَا ثَلاَثًا‏.‏ قَالَ وَخَرَجَ الْقَوْمُ إِلَى أَعْمَالِهِمْ فَقَالُوا مُحَمَّدٌ ـ قَالَ عَبْدُ الْعَزِيزِ وَقَالَ بَعْضُ أَصْحَابِنَا ـ وَالْخَمِيسُ‏.‏ يَعْنِي الْجَيْشَ، قَالَ فَأَصَبْنَاهَا عَنْوَةً، فَجُمِعَ السَّبْىُ، فَجَاءَ دِحْيَةُ فَقَالَ يَا نَبِيَّ اللَّهِ، أَعْطِنِي جَارِيَةً مِنَ السَّبْىِ‏.‏ قَالَ ‏"‏ اذْهَبْ فَخُذْ جَارِيَةً ‏"‏‏.‏ فَأَخَذَ صَفِيَّةَ بِنْتَ حُيَىٍّ، فَجَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا نَبِيَّ اللَّهِ، أَعْطَيْتَ دِحْيَةَ صَفِيَّةَ بِنْتَ حُيَىٍّ سَيِّدَةَ قُرَيْظَةَ وَالنَّضِيرِ، لاَ تَصْلُحُ إِلاَّ لَكَ‏.‏ قَالَ ‏"‏ ادْعُوهُ بِهَا ‏"‏‏.‏ فَجَاءَ بِهَا، فَلَمَّا نَظَرَ إِلَيْهَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏"‏ خُذْ جَارِيَةً مِنَ السَّبْىِ غَيْرَهَا ‏"‏‏.‏ قَالَ فَأَعْتَقَهَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم وَتَزَوَّجَهَا‏.‏ فَقَالَ لَهُ ثَابِتٌ يَا أَبَا حَمْزَةَ، مَا أَصْدَقَهَا قَالَ نَفْسَهَا، أَعْتَقَهَا وَتَزَوَّجَهَا، حَتَّى إِذَا كَانَ بِالطَّرِيقِ جَهَّزَتْهَا لَهُ أُمُّ سُلَيْمٍ فَأَهْدَتْهَا لَهُ مِنَ اللَّيْلِ، فَأَصْبَحَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَرُوسًا فَقَالَ ‏"‏ مَنْ كَانَ عِنْدَهُ شَىْءٌ فَلْيَجِئْ بِهِ ‏"‏‏.‏ وَبَسَطَ نِطَعًا، فَجَعَلَ الرَّجُلُ يَجِيءُ بِالتَّمْرِ، وَجَعَلَ الرَّجُلُ يَجِيءُ بِالسَّمْنِ ـ قَالَ وَأَحْسِبُهُ قَدْ ذَكَرَ السَّوِيقَ ـ قَالَ فَحَاسُوا حَيْسًا، فَكَانَتْ وَلِيمَةَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم‏.‏

 

অনুবাদ: হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসূল (সা.) খায়বার অভিযানে বের হলেন এবং আমরা সেখানে পৌঁছ ভোরে ফজরের নামায আদায় করলাম। তারপর আল্লাহর নবী (সা.) সওয়ারীর পিঠে আরোহণ করলেন। আবু তালহা সওয়ারীর পিঠে আরোহন করলেন এবং আমি আবু তালহার পিছনে বসলাম। আল্লাহর নবী (সা.) খায়বারের গলি পথ দিয়ে দ্রুত চলতে থাকলেন এবং আমার হাঁটু তাঁর উরু স্পর্শ করতে লাগলো। এমন সময় আল্লাহর নবী (সা.)-এর উরু থেকে তহবন্দ সরে গেল। আমার মনে হচ্ছে আমি এখনও তাঁর উরুর শুভ্রতা লক্ষ্য করছি। তিনি শহরে প্রবেশ করে বললেন, আল্লাহ মহান, খায়বার ধ্বংস হোক। আমরা এমন লোক, যখন কোন জাতির এলাকায় উপস্থিত হই, তখন তাদের সতর্ককারীদের আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। এই কথা তিনি তিনবার বললেন। বর্ণনাকারী বলেন, লোকজন তাদের কাজে বের হলো। তারা বলে উঠলো, মুহাম্মাদ এসে গেছে। আব্দুল আযীয বলেছেন, আমাদের কতক সাথীদের মতে তারা বলে উঠলো মুহাম্মাদ তার সেনাবাহিনীসহ এসেছে। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা যুদ্ধ করে খায়বার জয় করলাম। বন্দীদেরকে জমা করা হলো। দেহইয়া এসে বললো, হে আল্লাহর নবী! আমাকে বন্দীদের মধ্য থেকে একটি দাসী দিন। তিনি (রাসূল) বললেন, যাও এবং একটি দাসী নাও। সে সুফিয়া বিনতে হুইকে নিল। এমন সময় একজন লোক আল্লাহর নবী (সা.)-এর কাছে এসে বললো, হে আল্লাহর নবী। আপনি কুরাইযা ও নযীর বংশের নেতৃস্থানীয় নারী সুফিয়া বিনতে হুইকে দেহইয়ার হাতে তুলে দিলেন। সে একমাত্র আপনারই যোগ্য। তিনি বললেন, তাকে সুফিয়াসহ ডাকো। দেহইয়া তাকে নিয়ে এলো। নবী (সা.) সুফিয়াকে দেখে বললেন, দেহইয়া তুমি বন্দীদের মধ্য থেকে অন্য একটি দাসী নাও। বর্ণনাকারী বলেন, নবী (সা.) তাকে স্বাধীন করে দেবার পর বিয়ে করেন। সাবেত আবু হুরাইরাকে বলেন, হে আবু হামযা, সুফিয়ার দেন মোহর কি ধার্য করা হলো? তিনি বললেন, তাকে স্বাধীন করার পর বিয়ে করা তার জন্য দেন মোহর স্বরূপ ছিল। তারপর উম্মে সুলাইম (আনাসের মা) রাস্তায় তাকে বধূ সাজিয়ে রাতে রাসূল (সা.)-এর কাছে পেশ করলেন। সকালে আল্লাহর রাসূল (সা.) বর বেশে উঠে বললেন, তোমাদের যার কাছে যা আছে নিয়ে এসো। তিনি দস্তরখান বিছালেন। কেউ খেজুর, কেউ ঘি এবং বর্ণনাকারীর ধারণায় কেউ ছাতু নিয়ে এলো এবং এসব কিছু মিলিয়ে তারা হাইস নামক এক প্রকার খাদ্য প্রস্তুত করলো। এটিই ছিল রাসূল (সা.)-এর ওয়ালীমা।

হাদীসের সামঞ্জস্য: শিরোনামের সাথে হাদীসের সামঞ্জস্য ثُمَّ حَسَرَ الإِزَارَ عَنْ فَخِذِهِ -এর সাথে।

হাদীসের পুনরাবৃত্তি: হাদীসটি বুখারী শরীফে ৫৩-৫৪, ৮৬, ১২৯, ২৯৭, ২৯৮, ৪০৪, ৪০৫, ৪১৩, ৪১৪, ৪২০, ৪৩৪, ৫১৫, ৬০৩, ৬০৪, ৬০৬ ৭৬১, ৭৭৫, ৭৭৭, ৮১১, ৮১৬, ৮৮২, ৯১৩, ৯৪১ পৃষ্ঠসমূহে বর্ণিত হয়েছে।

শিরোনামের উদ্দেশ্য: ইমাম বুখারী (রা.) এখানে শিরোনাম সংক্ষেপ করেছেন। তাঁর নিয়ম হলো, যদি কোনো বিরোধপূর্ণ মাসআলায় অকাট্য দলীল না থাকে সেখানে কোনো সিদ্ধান্তমূলক শিরোনাম কায়েম করবেন না। যেমন এখানেও باب الفخذ عورة অথবা باب الفخذ ليست بعورة ইত্যাদি কোনো সিদ্ধান্তমূলক কিছু বলেননি; বরং অস্পষ্টভাবে বলেছেন باب ما يذكر في الفخذ

ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ

উরু/রান সতর কিনা তার আলোচনা باب مايستر من العورة অধ্যায়ে একটু পূর্বে আলোচিত হয়েছে। আল্লামা আইনী ও আসকালানী (র.) লিখেছেন যে, সকল তাবেয়ী, ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেকের বিশুদ্ধতম মত, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহমদের বিশুদ্ধতম মত, ইমাম আবু ইউসুফ এবং ইমাম মুহাম্মদ (র.) প্রমুখের মতে উরু সতরের অন্তর্ভূক্ত। পক্ষান্তরে ইবনে আবু যি’ব, দাউদ, ইমাম আহমদের এক কওল, ইসতাখরী, শাফেয়ী ও ইবনে হাযমের এক মতানুসারে উরু সতর নয়। কেউ কেউ ইবনে জারীরকে দাউদে যাহেরীর সাথে উলে­খ করেছেন। হাফিজ আসকালানী (র.) বলেন, ইবনে জারীর হতে ইহা প্রমাণের বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, তিনি এ মাসআলাটি তার রচিত কিতাব ‘তাহযীব’-এ উলে­খ করে যার একে সতর বলেননি তাদের মত খণ্ডন করেছেন।

শায়খুল মাশায়েখ শাহ ওয়ালিউল্লাহ লিখেন, এ বিষয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। অর্থাৎ ইমাম শাফেয়ী এবং ইমাম আবু হানিফার মতে উরু সতর। নাভী ও হাঁটু নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালেক বলেন, উরু সতর নয়। এ বিষয়ে হাদীস বিরোধপূর্ণ। হাদীসের রেওয়ায়েত অনুযায়ী ইমাম মালেক (র.)-এর মত শক্তিশালী।

আল্লামা ইবনে রুশদ মালেকী (র.) লিখেন, ইমাম মালেক, ইমাম আবু হানিফা এবং ইমাম শাফেয়ী (র.) সতরের সীমা নির্ধারণ করেছেন নাভী হতে হাঁটু পর্যন্ত। কেউ কেউ শুধুমাত্র লজ্জাস্থান দুটিকে সতর সাব্যস্ত করেছেন।

উপরের আলোচনা দ্বারা যেমনিভাবে ইবনে জারীর (র.) সম্পর্কে ভুল ধারণা কেটে যায়, তেমনিভাবে ইমাম মালেক (র.) সম্পর্কেও ভুল ধারণা কেটে যায়। কারণ, ইবনে রুশদ মালেকী তিন ইমামেরই এক মাযহাব উলে­খ করেছেন। আর দ্বিতীয় মাযহাব নাম উলে­খ না করেই কিছু সংখ্যক লোকের উলে­খ করেছেন। অন্যান্যরাও ইমাম মালেকের মত ইমাম আবু হানিফা এবং ইমাম শাফেয়ীর মতানুসারে উলে­খ করেছেন।

তাই শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রা.)-এর একথা বলা যে, ‘ইমাম মালেকের মতে নিঃশর্তভাবে উরু সতর নয়’ এবং তাকে আবার রেওয়ায়েত হিসেবে শক্তিশালী বলা তাহকীকের পরিপন্থি।

আল্লামা আইনী বলেন, উরু সতর না হওয়া বা না হওয়ার ব্যাপারে ইমাম বুখারী কোনো সিদ্ধান্ত দেননি; বরং তিনি সাহাবাদের থেকে যে তিনটি তা’লীক উলে­খ করেছেন সেগুলোর মধ্যে গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করা  যেতে পারে। প্রথমটি হল, নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেছেন: الفخذ عورة আর এ হাদীসের জন্য হাদীসের বিভিন্ন কিতাবে মুত্তাসিল সনদ সহকারে বর্ণিত হয়েছ। যেমন হযরত ইবনে আব্বাস বর্ণিত হাদীসের জন্য তিরমিযী শরীফের দ্বিতীয় খণ্ডের ১০৩ পৃষ্ঠা দেখা যেতে পারে। সেখানে স্পষ্ট উলে­খ রয়েছে, ان النبي (ص) قال الفخذ عورة; দ্বিতীয় তা’লীকটি হযরত জারহাদ (রা.)-এর। এটিও তিরমিযী শরীফের দ্বিতীয় খণ্ডের ১০৩ পৃষ্ঠায় পৃথক সনদে উলে­খ রয়েছে, যার সারকথা হল, নবী করীম (সা.) হযরত জারহাদকে বলেছেন: غط فخذك فانها من العورة আর তৃতীয় রেওয়ায়েতটি হল মুহাম্মদ বিন জাহশ (রা.)-এর। যা তাবারানী শরীফে মুত্তাসিল সনদ সহকারে উলে­খ হয়েছে। নবী করীম (সা.) হযরত মা’মার (রা.)-কে বলেছেন, তোমার উরুদ্বয় ঢেকে রাখ। কারণ, উভয়টি সতর। এ রেওয়ায়েতটি ইমাম আহমদ (র.) তার মুসনাদে এবং ইমাম হাকেম (র.) তার মুসতাদরাকে উলে­খ করেছেন।

ইমাম বুখারী উভয় প্রকার রেওয়ায়েত উলে­খ করার পর বলেন, হযরত আনাস (রা.) বর্ণিত হাদীসটি সনদের দিক থেকে অধিক শক্তিশালী। আর জারহাদের রেওয়ায়েতটি অধিক সতর্কতামূলক। অর্থাৎ আমলের দিক দিয়ে এ হাদীসে অধিকতর সতর্কতা রয়েছে। এ কথা বলে তিনি ওলামায়ে কেরামের মতভেদ থেকে বেঁচে গেলেন। কারণ, ওলামায়ে কেরাম মতভেদের সময় ঐ সূরতের উপর আমল করা অধিকতর যুক্তিযুক্ত ও মুনাসিব যা সর্বজনসম্মত হয়। কাজেই সতর্কতা ইহাই যে, উরুকে সতর মেনে নিয়ে ঢেকে রাখা হবে।

এতে প্রতীয়মান হয় যে, ইমাম বুখারী (রা.)-এর ঝোঁক জুমহূরের দিকেই। আর احوط দ্বারা উদ্দেশ্য যদি হয় তাকওয়া ও পরহেযগারী, তাহলে উরু যদিও সতর নয়; কিন্তু সতর্কতা এতেই যে, তা খুলবে না।

বিরোধীদের দলীলের জবাব:

১.    তাদের দলীল হলো হযরত আনাস (রা.)-এর রেওয়ায়েতে আছে: وَإِنَّ رُكْبَتِي لَتَمَسُّ فَخِذَ نَبِيِّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ثُمَّ حَسَرَ الإِزَارَ عَنْ فَخِذِهِ বিরোধী মতাবলম্বীরা এর দ্বারা দু’ভাবে দলীল পেশ করেন। এক. নবী করীম (সা.)-এর উরুর সাথে আনাস (রা.)-এর হাঁটু স্পর্শ করছিল। দুই. حسر الازار তথা নবী করীম (সা.) তার উরু হতে কাপড় সরিয়ে ফেললেন।

জবাব: প্রথম দলীল এ কারণে সঠিক নয় যে, অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে وقدمي تمس قدم رسول الله (ص) অর্থাৎ আমার পা নবী করীম (সা.)-এর পায়ের সাথে স্পর্শ হচ্ছিল। বুঝা গেলرواية بالمعني-এর কারণে কদম বা পা উদ্দেশ্য। সুতরাং যখন একাধিক সম্ভাবনা থাকে তখন দলীল বাতিল হয়ে যায়।

দ্বিতীয়তঃ কাপড়ের উপর দিয়ে স্পর্শ করার সম্ভাবনাও রয়েছে, যা সতর খোলাকে আবশ্যক করে না। তাই এ দলীল গ্রহণযোগ্য নয়।

২. তাদের দ্বিতীয় দলীল حسر الازار  দ্বারা দেওয়া হয়েছিল। জুমহূর এর উত্তর দিয়েছেন এভাবে যে, শব্দটি حُسِرَ তথা মুজহূলের সীগাহ। অর্থ অনিচ্ছাকৃতভাবে খুলে/সরে গিয়েছিল। এর সমর্থন পাওয়া যায় মুসলিম শরীফের প্রথম খণ্ডের ৪৫৮ পৃষ্ঠার একটি হাদীস দ্বারা। সেখানে বর্ণিত হয়েছ: وانحسر الازار عن فخذ النبي (ص)  অর্থাৎ নবী করীম (সা.)-এর উরু হতে লুঙ্গি সরে গিয়েছিল: তিনি সরাননি।

আর যদি বুখারীর বর্ণিত শব্দই حسر الازار গ্রহণ করা হয় এবং এর কর্তা নবী করীম (সা.)-কে সাব্যস্ত করা হয়, তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। কারণ, আরবি অভিধান ‘কামূস’-এর লিখকের মতে حسر শব্দটি نصر এবং ضرب উভয় বাব হতে لازم এবং মুতাআদ্দি উভয়ভাবেই ব্যবহৃত হয়। আবার ‘মিসবাহুল­ুগাত’ কিতাবেও উভয় অর্থ লিখা হয়েছে। অর্থ খোলা, খুলে যাওয়া। সুতরাং যদি এখান হতে لازم-এর অর্থ গ্রহণ করা হয় তাহলে অন্যান্য হাদীসের সাথে মিলে যায়। এক রেওয়ায়েতে আছে فاجري نبي الله (ص) في زقاق خيبر اذ خر الازار الخ এখানে خر শব্দের অর্থ হলো উপর নিচে পড়ে যাওয়া। হাদীসের অর্থ হলো, নবী করীম (সা.) খায়বারের গলিতে ঘোড়া দৌড়ালেন, দ্রæত দৌড়ানোর কারণে অসাবধানতাবশত লুঙ্গি সরে গিয়ে উরু প্রকাশ হয়ে পড়েছিল।

এখানে একটি প্রশ্ন থেকে যায়, অনিচ্ছাকৃতভাবে লুঙ্গি সরে গিয়ে থাকলেও উরু সতর হওয়ার কারণে নবী করীম (সা.)-এর উচিত ছিল দ্রæত তা ঢেকে ফেলা। তিনি তা করেননি। যেমন রাবী বলছেন: حتي اني نظرت الي بياض فخذه আর নাতো পরবর্তিতে তিনি সতর্ক করেছেন।

উত্তর হলো, কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করতে হলে বিষয়ের এবং পরিস্থিতির গুরুত্ব এবং অবস্থা বিবেচনা করতে হয়। নবী করীম (সা.) শত্রæ এলাকায় জিহাদের জন্য গিয়েছেন, তাদের গলির ভিতর ঢুকে পড়েছেন, মনের মধ্যে তখন শুধুমাত্র জিহাদেরই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি মনোযোগ থাকার কারণে যদি এ দিকে মনোযোগ আসতে একটু বিলম্ব হয় তাহলে তা অসম্ভব?

দ্বিতীয়তঃ জুমহূরের পক্ষ হতে দ্বিতীয় উত্তর হলো উরু/রানকে সতর অস্বীকারকারীদের রেওয়ায়েতে হলো فعلي (কর্মগত) পক্ষান্তরে হযরত ইবনে আব্বাস ও হযরত জারহাদ (রা.)-এর হাদীস হলো قولي বা উক্তিগত। আর قولي হাদীস فعلي হাদীসের উপর অগ্রগণ্য হয়। তাছাড়া হযরত আনাস (রা.) বর্ণিত হাদীসে লুঙ্গি সরে যাওয়ার বিষয়টি হলো একটি সাময়িকী এবং বিক্ষিপ্ত ঘটনা। পক্ষান্তরে হযরত জারহাদ (রা.) প্রমুখ বর্ণিত হাদীস হলো كلي বা একটি সামগ্রিক বিষয়। তাছাড়া কোনো বিক্ষিপ্ত ঘটনা নবী করীম (সা.)-এর বৈশিষ্ট্য হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সম্ভবত এ সমস্ত কারণেই ইমাম বুখারী (র.) স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে, আমলের দিক থেকে হযরত জারহাদ (রা.)-এর হাদীস সতর্কতামূলক।

খায়বার যুদ্ধ সম্পর্কিত বিস্তারিত বিবরণের জন্য দেখুন নাসরুল বারী কিতাবুল মাগাযী


কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.