অর্থাৎ যে সমস্ত কাজ
আল্লাহর হাম্দ তথা আলহামদুলিল্লাহ দ্বারা শুরু করা না হয় তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
এবার প্রশ্ন হল ইমাম
বুখারী (র.) তার এ মহিমাম্বিত গ্রন্থ সহীহুল বুখারীকে حـمـد দ্বারা কেন শুরু করলেন না?
উত্তরঃ
كُـل امـر ذِي بَـالএ হাদীসটির শব্দে বিভিন্নতা রয়েছে। কোনোটিতে আছে
باسم اللهআবার কোনোটিতে আছে بحمدالله
এ কারণেই অনেকে একে হাদীসদ্বয়ের
মাঝে দ্ব›দ্ব মনে করেছেন, আবার কেউ মনে করেছেন
এগুলি বিন্ন ভিন্ন হাদীস। অথচ মূলত হাদীস একটিই।এবং হাদীসটির শব্দের বিভিন্নতাসত্তে¡ও হাফিয আবু আমের
বিন আসসালাহ (র.) একে حَدِيْثٌ حَسَنٌ বা হাসান হাদীস সাব্যস্ত করেছেন। আর তিনি হলেন ইমাম
নবভনী (রন.) এর শাইখ।
১.প্রথমতঃ এ অভিযোগ (بـسـم الـلـه দ্বারা শুরু করেন নি) স্বীকার্য নয়। কারণ তিনি স্বীয়
জ্ঞানের গভীরতা ও দূরদর্শিতার আলোকে بـسـم الـلـه দ্বারা শুরু করে حـمـد الـلـه -এর হাদীসের উপরও আমল করেছেন।
সেটা এভাবে যে, بسـم الـلـه الـرحـمـن الـرحِـيـم -এর মাঝে রয়েছেالـرحـمـن و الـرحِـيـم উভয়টি হলো আল্লাহর গুণবাচক শব্দ। حـمـد দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সুমহান গুণাবলী প্রকাশ
করা। আর একথা সুস্পষ্ট যে, এ উদ্দেশ্য بـسـم الـلـه الـرحـمـن الـرحِـيـم দ্বারাতেও উত্তমরূপে প্রকাশিত হয়ে যায়। অতএব, প্রশ্নের অবকাশ থাকে না। আর যদি প্রশ্নটি মেনে নেওয়া হয় তখন তার উত্তর বিভিন্নভাবে
দেওয়া হয়ে থাকে।
২.সর্বাধিক বিশুদ্ধ উত্তর হলো, এ রিওয়ায়েতটি বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত হয়েছে, কোনো রিওয়ায়েতে আছে
بـسـم الـلـه দ্বারা শুরু করার কথা, আবার কোনো রিওয়ায়েতে আছে حـمـد الـلـهদ্বারা শুরু করার কথা, আবার কোনো রিওয়ায়েতে আছে ذِكْـرُ الـلـه
-এর কথা। আল্লামা নবভী (র.) শব্দত্রয়কে সামনে রেখে সমন্বয় করেছেন এভাবে যে, এখানে যৌথ অংশীদারিত্ব,অর্থাৎ ذِكْـرُ الـلـه -এর বাস্তবায়ন উদ্দেশ্য।
এই ذِكْـرُ الـلـه বা আল্লাহর স্মরণ حـمـدُ الـلـه বা ذِكْـرُالـلـه উভয়টি দ্বারাই হতে পারে। তাই ইমাম বুখারী (র.) এখানেبـسـم الـلـهকেই যথেষ্ট মনে করেছেন। এর
সারমর্ম এই পাওয়া গেল যে, নবী করীম (স.) শুধুমাত্র একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন, আরসেটি ছিল ذِكْـرُ الـلـهবা اسـم الـلـه এর ব্যাপক শব্দ, যার মধ্যে حـمـد ও شـهـادتও অন্তভুক্ত হয়ে যায়। কেননা হুযুর (স.)-এর উদ্দেশ্য ছিল ذِكْـرُ الـلـه (আল্লাহর স্মরণ) দ্বারা সূচনা
করা। তাই কোনো বর্ণনাকারী তাকে حـمـد
দ্বারা ব্যক্ত করেছেন আবার
কেউ شـهـادَت দ্বারা ব্যক্ত করেছেন।
মোটকথা গুরুত্বপূর্ণ
বিষয়ের সূচনা ذِكْـرُ الـلـه বা আল্লাহর স্মরণে হওয়া বাঞ্চনিয়, তা যে কোনো সূরতেই হোকনা কেন। তবে সুন্নত তরিকা হলো খুতবা, বক্তৃতা ইত্যাদির সূচনা حـمـد
দ্বারা করা, আর লেখালেখির সূচনা اسـم الـلـه দ্বারা করা।কেননা হুযুর (স.) -এর সাধারণ নিয়ম এটাই ছিল।
আল্লামা যুরকানী
(র.) মুয়াত্তার ব্যাখ্যাগ্রন্থে উল্লেখ করছেন, হুযুর (স.) -এর আমল
অনুসন্ধান করে আমরা যা পেয়েছি তা হলো খুতবা বা বক্তৃতার সূচনা তিনি হাম্দ দ্বারা এবং
লেখালেখি ও চিঠিপত্রের সূচনা তিনি করতেন বিসমিল্লাহ দ্বারা। যেমন হিরাক্ল প্রমুখের
নিকটপ্রেরিত চিঠিপত্র এবং হুদায়বিয়ার সন্ধিনামা
বিসমিল্লাহ দ্বারা শুরু করেছেন।
৩.পবিত্র কুরআনের প্রথম আয়াত إِقْـرَأ بِـاسْـمِ ربـكِ الـذِي خَـلَـق
যাতে আল্লাহর নামে পঠনের নির্দেশ
রয়েছে; হামদের নির্দেশ নেই। আর সহীহুল বুখারীও যেহেতু একটি
কিতাব, তার ক্ষেত্রে সমীচিন এটিই যে, তাতেও রাসূল (স.)-এর চিঠিপ্রত্র, কিতাবাদি ও কুরআনের
অনুসরণ তথা বিসমিল্লাহ দ্বারা শুরু করা হবে।
৪.তদুপরি দুটির মধ্যে যে কোনো একটি অবলম্বনের ক্ষেত্রে
بـسـمِ الـلـه কে গ্রহণ করার নিয়মই চলে আসছে।
পূর্ববর্তী আম্বিয়া
(আ.) গণের চিঠিপত্রেও বিসমিল্লাহ লেখা হতো। পবিত্র কুরআনে হযরত সুলাইমান (আ.)-এর চিঠির
বিবরণ রয়েছে, যা ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত, পর্যাপ্ত অর্থবহ ও তাৎপর্যপূর্ণ। এমন অলঙ্কারপূর্ণ ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ চিঠি এ
পৃথিবীর বুকে নবী ব্যতীত আর কেউ রচনা করেননি। তিনি লিখেন:
এরই কাছাকাছি বাদশা
হারুন-রশীদের ঐতিহাসিক চিঠি যা তিনি রোমসম্রাট ইয়াকফূর মতান্তরে নাকফূরের নিকট প্রেরণ
করেছিলেন। সে (ইয়াকফূর) করপ্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়ে হারুন রশিদের নিকট লিখেছিল, আমার পূর্ববর্তী রাণী নারীসূলভ দুর্বলতা ও অজ্ঞতাবশত জিযিয়া-কর প্রদান করে আসছিল।
আমার চিঠি আপনার নিকট পৌঁছামাত্র রাণীপ্রদত্ত এ যাবৎকালের সমুদয় অর্থ ফেরত প্রদানের
জন্যে নির্দেশ প্রদান করা হলো, নতুবা আমার পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা রইল।
বাদশা হারুন রশিদ
সেই চিঠির অপর পৃষ্ঠে তার উত্তের লিখলেন এভাবে:
(এ চিঠিটি আমিরুল মুমিনীন হারূনের পক্ষ থেকে রোমের
কুকুর ইয়াকফূরের নিকট, হে কাফেরের সন্তান! আমি তোমার পত্র পাঠ করেছি, এবং এর জবাব তুমি শুনবে না; বরং প্রত্যক্ষ করবে”) এবং তাকে উচিৎ শিক্ষা প্রদানের জন্যে সেদিনই এক দুর্ধর্ষ বাহিনী নিয়ে তিনি বেরিয়ে
পড়েন। (ইরশাদুল কারী, সূত্রঃ তারীখুল খুলাফা লিসসুয়ূতী)
৫.হাম্দ দ্বারা কিতাব শুরা না করার কারণ হিসেবে কেউ
কেউ বলেছেন এ হাদীসটির সনদ দুর্বল। তবে একথাটি বুখারীর শানের পরিপন্থী, যিনি কিনা প্রতিটি হাদীস লেখার পূর্বে গোসল করতেন, দু রাক‘আত নফল আদায় করতেন এবং ইসতিখারা করতেন। অথচ ঐ সমস্ত
বিষয়ে কোনো দুর্বল হাদীসও নেই। তাহলে ফাযায়েলের ক্ষেত্রে হাম্দ দ্বারা সূচনার হাদীসকে
দুর্বল ভেবে বর্জন করবেন এটা ভাবা যুক্তিসঙ্গত নয়। তদুপরি চারজন হাদীসবিশারদ অর্থাৎ
হাফিয ইবনে সালাহ, আবু আওয়ানাহ, ইবনে হিব্বান ও তাজুদ্দীন
সুবকী এ হাদীসকে সহীহ সাব্যস্ত করেছেন।
৬.কেউ কেউ এ উত্তরও দিয়েছেন যে, হাম্দ লিখা শর্ত নয়; বরং মুখে উচ্চারণই যথেষ্ট। আল্লামা খতীব (র.) জামি’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম আহমদ (র.) হাদীস লিখার সময় হুযুর (স.) -এর
নাম পর্যন্ত পৌঁছলে দরূদ শরীফ লিপিবদ্ধ না করে কেবলমাত্র মুখে উচ্চারণ করে নিতেন।
(ফতহুল বারী: খঃ ১. পৃ: ৭)
কোন মন্তব্য নেই