Header Ads

সহীহ বুখারীঃ কিতাবুল আজানঃ ইমাম আমীন জোরে বলার বর্ণনা।

 باب جَهْرِ الإِمَامِ بِالتَّأْمِينِ

وَقَالَ عَطَاءٌ آمِينَ دُعَاءٌ. أَمَّنَ ابْنُ الزُّبَيْرِ وَمَنْ وَرَاءَهُ حَتَّى إِنَّ لِلْمَسْجِدِ لَلَجَّةً. وَكَانَ أَبُو هُرَيْرَةَ يُنَادِي الإِمَامَ لاَ تَفُتْنِي بِآمِينَ. وَقَالَ نَافِعٌ كَانَ ابْنُ عُمَرَ لاَ يَدَعُهُ وَيَحُضُّهُمْ، وَسَمِعْتُ مِنْهُ فِي ذَلِكَ خَيْرًا

حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ، وَأَبِي، سَلَمَةَ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ أَنَّهُمَا أَخْبَرَاهُ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏"‏ إِذَا أَمَّنَ الإِمَامُ فَأَمِّنُوا فَإِنَّهُ مَنْ وَافَقَ تَأْمِينُهُ تَأْمِينَ الْمَلاَئِكَةِ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ‏"‏‏.‏ وَقَالَ ابْنُ شِهَابٍ وَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏"‏ آمِينَ ‏"‏‏.‏

পরিচ্ছেদ: ইমাম আমীন জোরে বলার বর্ণনা। হযরত আতা (র.) বলেন, আমীন হলো দোয়া। হযরত ইবনে যুবায়ের (রা.) এবং যারা তার পিছনে ছিল (মুক্তাদিরা) এত জোরে আমীন বলেছিল যে, মসজিদ গুঞ্জরিত হয়েছিল। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) ইমামকে আওয়াজ দিতেন (বলে দিতেন) যে, (এদিকে খেয়াল রাখবেন) যেন আমার আমীন ছুটে না যায়। হযরত নাফে’ বলেন, ইবনে ওমর (রা.) নিজে আমীন বলা ছাড়তেন না, এবং লোকদেরকে উদ্ধুদ্ধ করতেন। এবং আমি তার থেকে এ ব্যাপারে একটি হাদীস শুনেছি।

অনুবাদ: হযরত আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, নামাজে ইমাম যখন আমীন বলে, তখন তোমরাও আমীন বলো। কারণ, যার আমীন ফিরিশতাদের আমীনের সাথে মিলে যাবে তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। ইবনে শিহাব বর্ণনা করেছেন, (নামাজে) আল্লাহর রাসূল (সা.) আমীন বলতেন।

প্রাসঙ্গিক আলোচনা

হাদীসের সামঞ্জস্য: শিরোনামের সাথে হাদীসের সামঞ্জস্য إِذَا أَمَّنَ الإِمَامُ فَأَمِّنُوا -এর সাথে। এখানে নবী করীম (সা.) লোকদের ইমাম আমীন বলার সময় আমীন বলতে নির্দেশ দিয়েছেন।  

হাদীসের পুনরাবৃত্তি: হাদীসটি বুখারী শরীফে ১০৮, ৯৪৭ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে।

শিরোনামের উদ্দেশ্য: শিরোনাম দ্বারা ইমাম বুখারীর উদ্দেশ একেবারেই স্পষ্ট। তা হলো ইমাম ও মুক্তাদি উভয়ের জন্য জোরে আমীন বলা প্রমাণ করা। এ উদ্দেশ্য প্রমাণের জন্য তিনি কয়েকটি আছার এবং হাদীস উলে­খ করেছেন। কিন্তু তিনি যে দলীলগুলি পেশ করেছেন, তা দ্বারা তিনি তার উদ্দেশ্য হাসীলে অসফল হয়েছেন। যা হাদীসের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে জানা যাবে।

ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ

آمين সম্পর্কে সাতটি আলোচনা রয়েছে। ১. آمين শব্দটি আরবী না অনারবী? ২. কুরআনের অংশ কিনা? ৩. শাব্দিক বিশ্লেষণ, ৪. آمِين-এর অর্থ, ৫. এর হুকুম কি? অর্থাৎ ইমামগণের মাযহাব কি? ৬. কিভাবে বলা হবে? ৭. স্বশব্দে পড়বে না নিঃশব্দে? আর এ সপ্তমটি হলো ব্যাপাক মতভেদপূর্ণ বিষয়।

এবার প্রত্যেকটির ব্যাখ্যা নিম্নে প্রদত্ত হলো।

১.    শব্দটি আরবী না অনারবী? কেউ কেউ বলেছেন এটি আরবী শব্দ। তাদের মতে এটি اسـم فـعـل যার বিশ্লেষণ ৩ নং আলোচনায় করা হবে। কেউ কেউ বলেছেন এটি ফারসী শব্দ। যা همين থেকে আরবীকরণ করা হয়েছে। মুফতী তকী উসমানী (দাঃবাঃ) লিখেছেন যে, বিশুদ্ধ মত হলো এটি সুরয়ানী ভাষার শব্দ। এর সমর্থন হলো এই যে, বায়বেলের বিভিন্ন কপিতে এ শব্দটি হুবহু এভাবেই বিদ্যমান আছে। ইবনে হাজার আসকালানী (র.) ও আল মাতালিবুল আলিয়া নামক গ্রন্থে এরূপ একটি রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন যে, একজন ইহুদি ব্যক্তি রাসূল (সা.) -এর মুখে آمـيـن آمـيـن শব্দ শুনার পর মুসলমান হয়েছিলেন।: দরসে তিরমিযী

২.    কুরআনে অংশ কিনা? আল্লামা আইনী (র.) বলেন: لا خلاف ان آمين ليس من القرآن حتي قالوا بارتداد من قال انه منه আমীন কুরআনের অংশ না হওয়ার ব্যাপারে সকলের ঐকমত্য রয়েছে। এমনকি যারা একে কুরআনের অংশ বলবে তারা মুরতাদ হয়ে যাবে। : উমদাতুল কারী

৩.    آمين শব্দের উচ্চারণ: এর কয়েকটি পদ্ধতি রয়েছে। যথা: ১. آمِّيْن হামযায় মদ সহকারে, আর মীম তাশদীদ সহকারে। ২. হামযায় মদ ছাড়া, আর মীম তাশদীদবিহীন, ৩. হামযা মদসহ, আর মীম তাশদীদবিহীন। এটিই প্রসিদ্ধ ও বিশুদ্ধতর। وفي آمين لغتان المد والقصر والمد افصح (شرح مسلم)  আর প্রথম কেরাতটি হলো বিরল ও প্রত্যাখ্যাত। আল্লামা আইনী লিখেছেন: ان للتشديد لعن العوام وهو خطأ في المذاهب الاربعة তাছাড়া কেউ  কেউ বলেছেন এমতাবস্থায় তার নামায ফাসেদ হয়ে যাবে। যদিও মুফতাবিহী কওল অনুযায়ী নামায ফাসেদ হবে না। এ শব্দটি কুরআনে এসেছে: ولا آمِّيْنَ البيت الحرام আর মাসআলা হলো যদি কুরআন মাজীদের শব্দ হয় এবং অর্থে কোনো বিকৃতি না হয় তাহলে নামায নষ্ট হয় না।

৪.    آمِين শব্দের অর্থ: আল্লামা কুসতুল্লানী লিখেছেন: ومعناه عند الجمهور اللَّهُمَّ استجب (হে  আল্লাহ“ তুমি কবুল কর) وقيل هو اسم من اسماء الله تعالي আবার কেউ কেউ বলেছেন এটি আল্লাহর নামসমূহের একটি।

৫.    শরীয় বিধান কি? জুমহূরের নিকট সকল নামাযে আমীন বলা সুন্নত। : وانه مسنون في حق المنفرد والامام والماموم والقاري خارج الصلوة الخ (عمدة)  অর্থাৎ (ইমাম আজম, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহমদ ও ইমাম মালেকের এক রেওয়ায়েত অনুযায়ী) সূরা ফাতিহা খতম করে আমীন বলা মুনফারিদ, ইমাম ও মুক্তাদি সকলের জন্যই সুন্নত।

কিন্তু ইমাম মালেক (র.)-এর দ্বিতীয় মত, এবং অধিক প্রসিদ্ধ তাহলো আমীন বলা শুধু মুকতাদীর কাজ ইমামের কাজ নয়; তার দলীল হলো হযর আবু হুরায়রা (রা.)-এর হাদীস:

ان رسـول اللـه ﷺ قـال اذا قـال الامـام غـيـر الـمـغـضـوب عـلـيـهـم ولا الـضـالـيـن فـقـولـوا آمـيـن ـ

 রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- ইমাম যখন غـيـرالـمـغـضـوب عـلـيـهـم ولا الـضـالـيـن বলেন, তখন তোমরা آمـيـن বলো। ইমাম মালেক (রা.) বলেন, এ হাদীসে কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। ইমামের কাজ হলো সে ولا الـضـالـيـن বলবে। আর মুকতাদীর কাজ হলো সে আমীন বলবে। আর বন্টন যৌথতার বিপরীত।

ইমাম মুহাম্মদ (র.) মুয়াত্তায় ইমাম আবূ হানীফা (র)-এর মাযহাব ইমাম মালেকের মাযহাবের অনুরূপ বলে উলে­খ করেছেন। এবং তিনিই কিতাবুল আসারে বলেছেন, ইমাম আবূ হানীফা মাযহাব জমহুরের মাযহাবের অনুরূপ। কিতাবুল আসারে তিনি লিখেছেন:

عـن ابـى حـنيـفـة عـن حـمـاد عـن ابـراهـيـم اربـع خـافـت بـهـاالامـام سـبـحـانـك اللـهـم وبـحـمـدك والـتـعـوذ مـن الـشيطـان وبـسـم اللـه الـرحـمـن الـرحـيـم وآمـيـن - ইমাম আবূ হানীফা হাম্মাদ হতে, তিনি ইবরাহীম হতে, চারটি বিষয় ইমাম নিচু স্বরে বলবে। এক. সুবাহানাকাল্লাহুম্মা অর্থাৎ, ছানা।  দুই. আউযুবিল্লাহ, তিন. বিস্মিল্লাহ, চার. আমীন। এর পর ইমাম মুহাম্মদ (র.) লেখেন: وبـه نـاخـذ وهـو قـول ابـى حـنيـفـه আমরা এমতই পোষণ করি এবং এটা ইমাম আবূ হানীফারও উক্তি। কিতাবুল আসারের ভাষ্যকে জাহেরুর রেওয়ায়েত সাব্যস্ত করে মতন লিখকগণ ব্যাপকভাবে তা গ্রহণ করেছেন। এবং এ মত অনুযায়ীই ফতোয়া।

ইমাম মালেক (র.)-এর এ দলিলের জবাবে জমহুর বলেন, প্রকৃতপক্ষে কাজ বন্টন করা এ হাদীসের উদ্দেশ্য নয়। বরং হাদীসের উদ্দেশ্য হলো ইমাম মুকতাদী উভয় যেন এক সময়ে আমীন বলে। آمـيـن বলার পদ্ধতি বর্ণনা করতে বলা হয়েছে যে, ইমাম যখন ولا الـضـالـيـن বলে শেষ করবে, তখনই তোমরা আমীন বলে ফেলবে। যাতে ইমাম-মুকতাদী দু’জনেরই এক সাথে আমীন বলা হয়। কারণ, ইমামও তখনই আমীন বলে থাকে। তাই নাসায়ী শরীফের এক বর্ণনায় এরূপ শব্দও রয়েছে: فـان الـمـلائـكـة تـقـول آمـين وان الامـام يقـول آمـيـن কেননা তখন ফেরেস্তারা আমীন বলে, ইমামও আমীন বলে। তাছাড়া হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) হতে মারফ‚‘ রেওয়ায়েতও এসেছে যে, اذا امـن الامـام فـامـنوا ইমাম যখন আমীন বলে, তোমরাও তখন আমীন বল। এ হাদীসে ইমামের আমীন বলার বিষয়টি স্পষ্ট করেই উলে­খ হলো। আর পরিচ্ছেদে বর্ণিত হাদীসেও একথা স্পষ্ট উলে­খ আছে যে, নবী (সা.) নিজও আমীন বলেছেন, অতএব এ সকল হাদীস জমহুরের মাসলাকের পক্ষে সুস্পষ্ট দলিল।

واجبه الظاهرية الخ অর্থাৎ অধিকাংশ জাহেরীরা একে ওয়াজিব সাব্যস্ত করেছেন। আর ইমামিয়া স¤প্রদায় আমীন বলা বেদআত বলেছেন। কারণ এটি হলো মানুষে কথা, তাই নামায ফাসেদ হয়ে যাবে।

আবার ইবনে হাযাম জাহেরী বলেছেন যে, ইমামের জন্য সুন্নত আর মুক্তাদিদের জন্য ফরয। (উমদাহ)

৬.    উপরোক্ত বক্তব্য দ্বারা এ বিষয়েরও জবাব হয়ে গেল যে, আমীন বলা ইমাম, মুক্তাদি, মুনফারিদ, সকলের কাজ, এবং সকলের জন্যই তা সুন্নত।

৭.    সশব্দে বা নিঃশব্দে আমীন বলা সম্পর্কিত আলোচনা:  এ ব্যাপারে ঐকমত্য রয়েছে যে, আমীন সশব্দে ও নিঃশব্দে দু’ভাবে বলাই জায়েজ আছে। কিন্তু মতানৈক্য হলো উত্তম ও অনুত্তম হওয়া নিয়ে। এবং এ ব্যাপারেও ঐকমত্য রয়েছে যে, সিররী নামাযে আমীন আস্তে বলতে হবে, আর মতভেদ শুধুমাত্র  জেহরী নামাযের ক্ষেত্রে যে,  জেহরী নামাযে আমীন আস্তে বলা উত্তম না জোরে?

ইমাম আবূ হানীফা ও সুফিয়ান সাওরী  ও কূফার সকল ফোকাহা এবং ইমাম শাফেয়ীর নতুন কওল মতে আমীন নিঃশব্দে বলা উত্তম। যেমন তিনি কিতাবুল উম্মে লিখেছেন: ولا احب ان يجهروابها الخ  অর্থাৎ আমীন এমনভাবে বলবে যেন তা নিজ কানে শোনা যায়। এবং আমার নিকট এটা পছন্দনীয় নয় যে, আমীন সশব্দে বলা হবে। আবার সশব্দে বললেও কোনো সমস্যা নেই।

উলে­খ্য যে, কিতাবুল উম্ম হলো ইমাম শাফেয়ীর সর্বশেষ কিতাব, এটা তখন লিখেছিলেন যখন তিনি মিশর এসেছিলেন, এখানেই তিনি শেষ জীবন কাটান। যেমনটি ইমামের পিছনে কেরাত পড়ার আলোচনায় বলা হয়েছে।

ইমাম শাফেয়ীর প্রাচীন কওল হলো আমীম জোরে বলার পক্ষে। অতঃপর যখন তিনি মিশর চলে আসেন তখন তিনি তার প্রাচীন মত থেকে ফিরে আসেন। প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে পরবর্তীতে তিনি ইমাম আবু হানিফার মতের ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করেন তখন তিনি তার মত পরিবর্তন করে ফেলেন, অথবা যে কোনো কারণেই হোক তার মত পরিবর্তনটা প্রমাণিত।

আফসোস!  শাফেয়ী মতাবলম্বীদের জন্য, তারা ইমাম শাফেয়ীর সর্বশেষ ও নতুন কওল ছেড়ে দিয়ে প্রাচীন কওল নিয়ে মতভেদ জিইয়ে রেখেছেন: فيا للعجب

وقال جماعة يخفيها وهو قول ابي حنيفة والكوفيين واحد قولي مالك والشافعي في الجديد وفي القديم يجهر (عمدة)

ঘাফিয আসকালানী বলেন, ইমাম শাফেয়ীর প্রাচীন কওল হলো জেহরী নামাযে আমীন সশব্দে বলা।

والجهر للماموم ذهب اليه الشافعي في القديم وعليه الفتوي (فتح)

মোটকথা, ইমামাইনিল হুমামাইন (আবু হানিফা ও মালেক) আমীন নিঃশব্দে বলার প্রবক্তা। আর হাম্বলীরা সশব্দে বলার প্রবক্তা।

ইমাম বুখারী মাযহাব হলো ইমাম মুক্তাদি উভয়ের উপর জেহরী নামাজে সশব্দে বলবে।

ইমাম বুখারী তার দাবীর স্বপক্ষে কয়েকটি আছার এবং একটি মারফূ’ হাদীস পেশ করেছেন। সেগুলির উত্তর নিম্নে প্রদত্ব হলো।

প্রথম দলীল: হযরত আতার কওল وَقَالَ عَطَاءٌ آمِينَ دُعَاءٌ আমীন হলো দোয়া।

জবাব: একথা স্পষ্ট যে, দোয়ার মূল হলো আস্তে করা। কারণ আল্লাহ বাণী: اُدعوا ربكم تضرعا وخفية বুঝা গেল আমীন যেহেতু দোয়া, তাই তা আস্তে করাই শ্রেয়। বুঝা গেল ইমাম বুখারীর সশব্দে আমীন বলা সম্পর্কিত এ দলীলটি বিস্ময়ক; বরং এটি হানাফীদের দলীলে পরিণত হলো।

দ্বিতীয় দলীল-أَمَّنَ ابْنُ الزُّبَيْرِ : ইমাম বুখারীর উলি­খিত দলীলসমূহের মধ্যে এই একটি আছরই আছে, যাতে সশব্দে আমীন বলার কথা স্পষ্ট আছে। অর্থাৎ এ আছর দ্বারা সশব্দে আমীন বলার প্রমাণ রয়েছে।

উত্তর: সশব্দে আমীন বলার কেউই অস্বীকারকারী নয়। আলোচনা তো উত্তমতার ব্যাপারে। যা এ আছর দ্বারা প্রমাণিত নয়।

কারণ, ইমাম বুখারী হযরত ইবনে যুবায়ের (রা.()-এর আমল পেশ করেছেন যে, امن ابن زبير ;

উত্তর:২: আল্লামা কাশ্মিরী (র.) বলেন:لعله حين كان يقنت في الفجر الخ  সম্ভবত এটি তখনকার ঘটনা যখন আব্দুল মালিক বাদশার বিরুদ্ধে ফজরের নামাজে কুনূতে নাজেলা পড়া হাচ্ছিল; অন্যদিকে বাদশা আব্দুল মালিকও তাদের বিরুদ্ধে কুনূতে নাজেলা পাড়াচ্ছিলেন। অর্থাৎ উভয় পক্ষ থেকেই কুনূতে নাজেলা পড়ানো হচ্ছিল। এমনি এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে সকলে জোরেশোরে আমীন বলে থাকতে পারেন, যা দ্বারা মসজিদ গুঞ্জরিত হয়ে উঠেছিল।

দ্বিতীয়ত কিছু রেওয়ায়েতে দ্বারা এমনও জানা যায় যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা.)-এর খেলাফতকালে কিছু লোক আমীন বলাকে বিদআত মনে করে, আমীন বলা সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করেছিল তাই হতে পারে এদের বিরোধিতার উদ্দেশ্যে তিনি সশব্দে আমীন বলতে আরম্ভে করেছিলেন। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। যা হোক, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের ও ওয়ায়েল ইবনে হজর ব্যতীত অন্য কোনো সাহাবী হতে জোরে আমীন বলার আমল প্রমাণিত নেই। উক্তিগত ভাবেও নয়, কার্যতও নয়। সাথে সাথে এ দু’জনের রেওয়ায়েতও ব্যাখ্যাযোগ্য। যেমনটি পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে। অতএব, এটা কি এ বিষয়ের অকাট্য দলিল নয় যে, আমীন সশব্দে বলা উত্তম নয়। বরং নিঃশব্দে বলাই উত্তম।

উত্তর: ৩: তাছাড়া হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা.)-এর এ আছরটি হযরত ওমর, আলী ও ইবনে মাসঊদ (রা.)-এর আছরের প্রতিদ্ব›দ্বী হতে পারে না।

উত্তর: ৪: হযরত ইবনে যুবায়ের (রা.)-এর কিছু ব্যক্তিগত মতামত আছে, যা আকাবিরে সাহাবা থেকে ভিন্ন। উদাহরণত}ঃ দুই ঈদের নামাজে আজান-ইকামতের তিনি প্রবক্তা ছিলেন। সুতরাং হতে পারে সশব্দে আমীন বলাও তার একটি নিজস্ব মতামত।

তৃতীয় দলীল: وَكَانَ أَبُو هُرَيْرَةَ يُنَادِي الإِمَامَ : আল্লামা আইনী (র.) বলেন, এ তা’লীকটি মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাতে মুউসূলরূপে বর্ণিত হয়েছে। তা হলো: عن ابي هريرة انه كان يؤذن بالبحرين الخ আবু হুরায়রা বাহরাইনে মুয়াযযিন ছিলেন, তার ইমাম ছিল ‘আলা বিন হাযরামী। বায়হাকীর রেওয়ায়েতে আছে আবু হুরায়রা মারওয়ানের মুয়াযযিন ছিল। ঘটনা হলো এরকম যে, মারওয়ান যখন মদিনার গভর্নর নিযুক্ত হলো তখন আবু হুরায়রাকে মুয়াযযিন নিযুক্ত করল। মারওয়ান (যিনি ইমামও ছিলেন)-এর অভ্যাস ছিল সে ইকামত হওয়ার সাথে সাথেই তাড়াতাড়ি করে সূরা ফাতিহা পড়ে ফেলতেন। এদিকে আবু হুরায়রা কাতার সোজা করা ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত থাকতেন। কারণ, এগুলি মুয়াযযিনেরই কাজ। তাই হযরত আবু হুরায়রা মারওয়ানকে বললেন, আমি মুয়াযযিন হতে এ শর্তে যে, আপনি এত তাড়াতাড়ি করতে পারবেন না যে, আমার আমীন বলা ফওত হয়ে যায়। প্রশ্ন হলো এর দ্বারা সশব্দে আমীন কিভাবে প্রমাণিত হলো? এর দ্বারা আমীন বলার গুরুত্ব বুঝা গেল, যার কেউ অস্বীকারকারী নেই। সশব্দে বলা এর দ্বারা কোনোভাবেই প্রমাণিত হয় না।

মুক্তাদির উপর সূরা ফাতিহা ওয়াজিব নয়: হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর এ ঘটনা দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয়ে গেল যে, ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পড়া ওয়াজিব নয়। নতুবা আবু হুরায়রা শুধুমাত্র আমীনের শর্তারোপ করে ক্ষান্ত হতেন না; বরং সূরা ফাতিহারও শর্তারোপ করতেন। বুঝা গেল ফাতিহা মুক্তাদির উপর ওয়াজিব নয়। বরং آمين-ই এমন কাজ যাতে মুক্তাদিও ইমামের সাথে শরীক হয়।

চতুর্থ দলীল: وَقَالَ نَافِعٌ كَانَ ابْنُ عُمَرَ لاَ يَدَعُهُ : এর দ্বারাও সশব্দে আমীন বলার প্রমাণ করা সম্ভব নয়। তবে আমীন বলা অবশ্যই প্রমাণিত হয়, যার কেউ অস্বীকারকারী নয়।

وَسَمِعْتُ مِنْهُ فِي ذَلِكَ خَيْرًا : এর দুটি কেরাত আছে। ১. خَيْرًا তখন অর্থ হবে আমি ইবনে ওমর হতে এর ফযীলত শুনেছি। ২. خَبْرًا তখন অর্থ হবে এ সম্পর্কে আমি ইবনে ওমর হতে একটি হাদীস শুনেছি। : ওমদাতুল কারী

পঞ্চম দলীল: إِذَا أَمَّنَ الإِمَامُ فَأَمِّنُوا : ইমাম যখন আমীন বলবে তোমরাও তখন আমীন বল। কারণ, যার আমীন বলা ফেরেশতাদের আমীন বলার সাথে মিলে যাবে তার পিছনের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।

এ হাদীসটি নিঃসন্দেহে সহীহ। কিন্তু এর দ্বারা আসল উদ্দেশ্য আমীন জোরে বলার ফযীলত বর্ণনা করা, এবং মুক্তাদিদেরকে আমীন বলতে উদ্ধুদ্ধ করা হচ্ছে। যেমন ইমাম তিরমিযী এ হাদীসকে باب مام جاء في فضل التامين-এর অধীনে এনেছেন। এবং এর দ্বারা আমীন বলার ফযীলতই উদ্দেশ্য নিয়েছেন। এর দ্বারা সশব্দে আমীন বলার দলীলগ্রহণ করা সঠিক নয়।

যদি ইমাম বুখারীর পক্ষ থেকে এ ব্যাখ্যা করা হয় যে: إِذَا أَمَّنَ الإِمَامُ فَأَمِّنُوا-র অর্থ হলো ইমাম আমীন জোরে বলেন, যেন মুক্তাদিরা ইমামের আমীন বলা জানতে পারে।

তার উত্তর হলো এটি একটি সর্বজন স্বীকৃত মূলনীতি যে: الحديث يفسر بعضه بعضا স্বয়ং ইমাম বুখারী এক বাব পরে হযরত আবু হুরায়রার এই হাদীসটিই বর্ণনা করেছেন: {‏غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلاَ الضَّالِّينَ‏}‏ قَالَ ‏"‏ إِذَا قَالَ الإِمَامُ‏  فَقُولُوا آمِينَ‏.‏  বুঝা গেল যে, ইমাম ولا الضالين পড়া দ্বারা মুক্তাদিরা ইমামের আমীন বলার সময় সম্পর্কে অবহিত হতে পারবে। সুতরাং জোরে বলা জরুরী নয়।

২. এ হাদীসের স্পষ্ট উদ্দেশ্য হলো اذا امن الامام اي اذا ارادالامام التامين فامِّنوا  যেমন اذا قرأت فاستعذ بالله -এর অর্থ হলো اذا اردت القرأن الخ  তাছাড়া اذا ققتم الي الصلوة اي اذا اردتم الي الصلوة وغيره

ইমাম নবভী বলেন, انه ينبغي ان يكون تامين الماموم مع تامين الامام لا قبله ولا بعده لقوله (ص) واذا قال ولاالضالين فقولوا آمين واما رواية اذا امن فامنوا فمعناها اذا اراد التامين (شرح مسلم)  এ অর্থ গ্রহণ করলে সকল হাদীসের মাঝে সমন্বয়ও হয়ে যাবে।

৩.    ইমাম বুখারী এ বাবে হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর হাদীস পেশ করেছেন। এ হাদীসে রয়েছে: من وافق تامينه تامين الملائكة غفر له الخ

এর দ্বারাও স্পষ্ট বুঝা গেল যে, আমীন বলার ক্ষেত্রে ফেরেশতাদের সামঞ্জস্যতা অনেক ছওয়াবের কাজ যে, এর দ্বারা সমস্ত গুনাহ ক্ষমা হয়ে যাবে। আর একথা স্পষ্ট যে, ফেরেশতারা আমীন আস্তে বলেন। তাহলে ফেরেশতাদের আমীন বলার সাথে পূর্ণাঙ্গ সামঞ্জস্যবিধানের দাবী হলো যথাসম্ভব সময় ও কর্মগত সামঞ্জস্যের পাশাপাশি গুণগত সামঞ্জস্যও হবে। আর তা হলো ফেরেশতারা আমীন আস্তে বলে, সুতরাং মুক্তাদিরাও আমীন আস্তে বলবে।  

এখানে একটি বিষয় স্মরণ রাখা চাই। তা হলো মুজতাহিদ ইমামগণ বিশেষত}ঃ অনুসরণীয় ইমাগণের মতভেদ হাদীসের মতভেদেরই প্রতিবিম্ব হয়ে থাকে। রেওয়ায়েতের বিভিন্নতার কারণে ইমামগণের মতামতও বিভিন্ন হয়ে থাকে।

এখানে সশব্দে ও নিঃশব্দে আমীন বলা সম্পর্কেও উভয় ধরনের রেওয়ায়েত রয়েছে। ইমামগণ স্ব-স্ব উসূল বা মূলনীতি অনুযায়ী একটিকে আসল সাব্যস্ত করে অপরটির ব্যাখ্যা প্রদান করেন।

হানাফীগণের মূলনীতি হলো তারা মতভেদপূর্ণ রেওয়ায়েতসমূহের মধ্যে যেটি اوفق بالقرآن [কুরআনের সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ] সেটিকে তারা গ্রহণ করেন।

ইমাম মালেকের মূলনীতি হলো তারা মদিনাবাসীদের আমলকে গ্রহণ করে থাকেন। কারণ, মদিনা হলো ওহীর অবতরণস্থল।

শাফেয়ী ও হাম্বলীগণের উসূল হলো যে রেওয়ায়েতের সনদের মাধ্যম কম তার বিশুদ্ধতা ও শক্তি বিবেচনায় নিয়ে সেটিকে গ্রহণ করেন। সুতরাং ইমামগণ স্ব-স্ব উসূল ও মূলনীতির আলোকে নিজ নিজ উসূল অনুযায়ী একটিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।

নিঃশব্দে আমীন বলার দলীলসমূহ:

ইমামুল হুমামাইন (ইমাম আজম ও ইমাম মালেক (র.)-এর মতে আমীন নিঃশব্দে বলা উত্তম। তাদের দলীল হলো:

১. নিঃশব্দে আমীন বলাটা কুরআনের সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেমন আল্লাহর বাণী: ادعوا ربكم تضرعا وخفية انه لا يحب المعتدين ‘তোমরা আল্লাহকে বিনয় ও গোপনে ডাক, নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীকে ভালোবাসেন না’। আর এব্যাপারে সকলেই একমত যে, আমীন হলো দোয়া।

২. দ্বিতীয় দলীল হলো হযরত সামুরা বিন জুনদুবের হাদীস: انه حفظ عن رسول الله صلي الله عليه وسلم سكتتين سكتة اذا كبر وسكتة اذا فرغ من قراءة غير المغضوب عليهم ولا الضالين الخ (ابو داؤد اول في باب السكتة عند الافتتاح) وترمذي اول، ومسند احمد بن حنبل

অর্থাৎ হরত সামুরা বিন জুনদুব বলেন আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট থেকে দুটি সাকতা স্মরণ রেখেছি, একটি সাকতা হলো তাকবীরে তাহরীমার পর, (যখন ছানা পড়া হয়) আর দ্বিতীয় সাকতা হলো غير المغضوب عليهم ولا الضالين-এর পরে। এ সাকতাটি ছিল আমীন বলার জন্য।

এর দ্বারা স্পষ্ট বুঝা গেল যে: ولا الضالين-এর পরে সাকতা (নীরবতা) করা হতো। যদি সশব্দে আমীন বলা হতো তাহলে সাকতার কোনো অর্থই থাকে না। তাছাড়া এটাও বলা যায়না যে, ولا الضالين-এর পরে যে সাকতা ছিল তা ইমামের জন্য আমীন বলার জন্য ছিল না; বরং শ্বাস ঠিক করার জন্য ছিল। আর এটা বলা যে, ইমাম সশব্দে আমীন বলবে উক্ত সাকতার পরে। তখন তো ইমামের পূর্বে মুক্তাদি আমীন জোরে বলা আবশ্যক হয়। অর্থাৎ প্রথমে মুক্তাদি আমীন বলবে, তারপরে ইমাম আমীন বলবে। এটা তো সহীহ ও সরীহ হাদীসের পরিপন্থি, যা বুখারীর এই (১০৮) পৃষ্ঠায় হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত হবে যে ইমাম: غير المغضوب ولاالضالين পড়ার পর فقولوا آمين তোমরা আমীন বলবে। এখানে فا অবিলম্বে পরক্ষণের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ তোমরাও আমীন বল। তাহলে যখন মুক্তাদির আমীন বলাটা সূরা ফাতিহা সমাপ্ত হওয়ার ইমামের সাকতার সময় হয়ে যাবে। আর ইমাম ঐ সাকতার পর আমীন বলবে। তাহলে তো ইমামের আগে মুক্তাদি আমীন বলা আবশ্যক হবে, যা সকলের নিকটই নিষিদ্ধ। সুতরাং এটা মানতেই হবে যে, এ সাকতাটা আমীনের জন্য ছিল।

তৃতীয় দলীল হলো হযরত ওয়ায়েল বিন হাজর (রা.)-এর হাদীস, যা দুটি সনদে বর্ণিত হয়েছে।

এক. হযরত সুফিয়ান ছাওরী (রা.)-এর হাদীস, যাতে আছে : ومد بها صوته আর হযরত শো’বার রেওয়ায়েত যা ইমাম তিরমিযীর রেওয়ায়েতে আছে وخفض بها صوته

শাফেয়ী ও হাম্বলীরা সুফিয়ান ছওরীর রেওয়ায়েতকে প্রাধান্য দিয়ে শো’বার রেওয়ায়েতকে ছেড়ে দিয়েছেন। আর হানাফী ও মালেকীরা শো’বার রেওয়ায়েতকে মুল সাব্যস্ত করে সুফিয়ান ছওরীর রেওয়ায়েতের মধ্যে তাবীল করেছেন।  এখানে مَدَّ দ্বারা উদ্দেশ্য جهر নয়; বরং উদ্দেশ্য হলো আমীনকে টেনে পড়া। ২. আমীনের ইয়াকে টেনে পড়েছেন। আবার এ সম্ভাবনাও রয়েছে যা, শাফেয়ীরা বলেন যে, আমীন সশব্দে বলেছেন। সুতরাং বুঝা গেল যে, এখানে তিনটি সম্ভাবনা রয়েছে। فاذا جاء الاحتمال بطل الاستدلال

পক্ষান্তরে خفض بها صوته এর একটিই অর্থ নির্ধারিত।

ইমাম তিরমিযী সুফিয়ান ছওরীর রেওয়ায়েতকে প্রাধান্য  দেয়ার জন্য শো’বার রেওয়ায়েতের উপর চারটি অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। তন্মধ্যে তিনটি অভিযোগ এ স্থানেই অর্থাৎ باب جاء في التامين অধ্যায়ে। আর একটি অভিযোগ অর্থাৎ চতুর্থ অভিযোগটি ইমাম তিরমিযী তার রচিত علل كبير নামক গ্রন্থে এনেছেন। সেই অভিযোগগুলি হলো:

১. শু‘বা সালামা ইবনে কুহায়লের উস্তাদের নাম বর্ণনার ক্ষেত্রে ভুল করেছেন। তার নাম হলো রাসূল ইবনে আম্বাস। সুফিয়ানের রেওয়ায়েতে এরূপই আছে। কিন্তু শু‘বা বলেছেন হুজর আবুল আম্বাস, অথচ তার উপনাম আবুল আম্বাস নয়। তার উপনাম হলো আবুস্ সাকান।

২. শু‘বা, হুজর ইবনে আম্বাস ও ওয়ায়েল ইবনে হুজরের মাঝে আলকামার নামও বৃদ্ধি করেছেন। অথচ এখানে আলকামার মধ্যস্থতা নেই। যেমনটি সুফিয়ানের রেওয়ায়েতে দেখা যায়।

৩. শু‘বা তার হাদীসের মতনে مـد بـهـا صـوتـه -এর স্থলে خـفـض بـهـا صـوتـه শব্দ বর্ণনা করেছেন। অথচ সহীহ রেওয়ায়েত হলো ومـد بـهـا صـوتـه

৪. الـعـلل الـكـبـيـر নামক গ্রন্থে ইমাম তিরমিযী চতুর্থ আপত্তিটি এ বর্ণনা করেছেন যে, আলকামার পিতা ওয়ায়েল ইবনে হুজর হতে আলকামার হাদীস শোনার বিষয়টি প্রমাণিত নয়। কারণ, ইমাম বুখারী (র.)-এর কথা মোতাবেক আলকামা তার পিতার মৃত্যুর ছয় মাস পরে জন্ম লাভ করেছেন।

আপত্তিসমূহের উত্তর: আল্লামা আইনী (র.) উমদাতুল কারীতে এ সকল আপত্তির বিস্তারিত জবাব দিয়েছেন। প্রথম আপত্তির জবাব হলো এই যে, প্রকৃতপক্ষে হুজর এর পিতা ও ছেলে উভয়ের নাম আম্বাস ছিল। সে হিসেবে তাকে হুজর আবুল আশ্বাসও বলা যায়। হুজর ইবনে আ¤¦াসও বলা যায়। যেমন- আল্লামা ইবনে হিবক্ষান তার كـتـاب الـثـقـات এ স্পষ্টভাবে উলে­খ করেছেন। তাকে হুজর আবুল আম্বাসও বলা হয়, হুজর ইবনে আম্বাসও বলা হয়। হাফিজ ইবনে হাজার আসকালীন (র.)ও تهـذيب الـتـهـذيب নামক গ্রন্থে বিষয়টি স্বীকার করেছেন। একারণে তার নাম রেওয়ায়েতসমূহে দু’ভাবেই উলে­খ করা হয়েছে। ইমাম আবূ দাঊদও এ হাদীসটি সুফিয়ানের তরীকে বর্ণনা করেছেন এবং সেখানেও হুজর ইবনে আম্বাসের পরিবর্তে হুজর আবুল আম্বাস উলে­খ করেছেন। যেমন রয়েছে শু‘বার রেওয়ায়েতে। এর বিপরীতে ইমাম ইবনে হিব্বান হাদীসটি শু‘বার তরীকে বর্ণনা করেছেন। এবং সেখানে হুজর আবুল আম্বাসের পরিবর্তে হুজর ইবনে আম্বাস উলে­খ করেছেন। ইমাম দারাকুতনীও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, তার শব্দ হলো এরূপ:عـن حـجـر ابـى الـعـنبـس وهـوابـن عـنبـس হুজর আবুল আম্বাস হতে এবং তিনিই ইবনে আম্বাস। এ সমস্ত আলোচনা দ্বারা এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, এ দুটি নাম একই ব্যক্তির। অতএব, আবুল আম্বাস বলার কারণে শু‘বার রেওয়ায়েতের উপর কোনো আপত্তি করা যায় না।

দ্বিতীয় আপত্তির জবাব হলো এই যে, এমনটি প্রায় সময়ই হতে দেখা যায় যে, একজন রাবী কোনো একটি রেওয়ায়েত একবার কারো মাধ্যমে শুনেন, আরেকবার কারো মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি শুনে থাকেন। আবার রেওয়ায়েত করার সময়ও দুভাবেই রেওয়ায়েত করে থাকেন। এখানেও এমনটিই হয়েছে। রাসূল ইবনে আম্বাস রেওয়াতেটি দু’ভাবেই শুনেছেন। একবার তিনি সরাসরি ওয়ায়েল ইবনে হুজর হতে শুনেছেন। যেটি সুফিয়ান বর্ণনা করেছেন। আরেকবার শুনেছেন ওয়ায়েল ইবনে হুজর এর মাধ্যমে। যেটি শু‘বা রেওয়ায়েত করেছেন। এর দলিল হলো এই যে, আবূ দাঊদ তায়ালিছী (র.)ও রেওয়ায়েতটি তাখরীজ করেছেন। সেখানে সালামা ইবনে কুহায়েল বলেছেন:سـمـعـت جـهـرا ابـاالـعـنبـس قـال سـمـعـت عـلقـمـة بـن وائـل يحـدث عـن وائـل وسـمـعـت مـن وائـل অতএব এখানে হুজর ইবনে আম্বাস নিজেই স্পষ্ট করে দিলেন যে, তিনি এ রেওয়ায়েতটি দুভাবে শুনেছেন। তা ছাড়া আল্লামা নীমাবী (র.) উলে­খ করেছেন যে, মুসনাদে আহমদ ও সুনানে আবূ মুসলিম আল কাজীতে একথা স্পষ্ট উলে­খ আছে যে, রাসূল ইবনে আম্বাস এ রেওয়ায়েতটি দু’ভাবে শুনেছেন। ইমাম দারাকুতনীও এ রেওয়ায়েতটি ইয়াযীদ ইবনে যুরায়য়ের তরীকে বর্ণনা করেছেন। সে তরীকে ইয়াযীদ বলেন:

حـجـرابـى الـعـنبـس عـن عـلـقـمـة ثـناوائـل اوعـن وائـل بـن حـجـر ـ حدثـنا شـعـبـة عـن سلـمـة بـن كـهـيـل  

এভাবে দ্বিতীয় আপত্তিটিও পণ্ড হয়ে যায়।

তৃতীয় আপত্তির জবাব: বাকি থাকল তৃতীয় আপত্তি। তবে পূর্বোক্ত দু’টি আপত্তি পণ্ড হওয়ার পর এ তৃতীয় আপত্তিটি নিজে নিজেই পণ্ড হয়ে যায়। কেননা, জগতের হাদীস বিশারদগণ শু’বাকে হাদীসের ভ‚বনে আমীরুল মুমিনীন খেতাবে ভ‚ষিত করেছেন। অতএব তিনি ইমাম হওয়াও নির্ভরযোগ্য হওয়ার ব্যাপারটি সর্বস্বীকৃত। এমতাবস্থায় তার সম্পর্কে এমন কুধারণা পোষণ করা নিঃসন্দেহে ভিত্তিহীন যে, তিনি রেওয়ায়েতের মধ্যে তাসরুফ করে مـدبـهـا -এর স্থলে خـفـض بـهـا বর্ণনা করে দিয়েছেন।

এর জবাবে শাফেয়ী পন্থিগণ বলে থাকেন, শু‘বার ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণ এরূপ ধারণা প্রকাশ করেছেন যে, কখনো কখনো তার ভুল হয়ে যায়। পক্ষান্তরে সুফিয়ান সাওরী বেশ উপযুক্ত।

এর জবাব এই যে, শু‘বা সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণের উপরোক্ত ধারণা কেবলই সনদের সাথে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ, লোকদের নাম বর্ণনার ক্ষেত্রে কখনো কখনো শু‘বার ভুল হয়ে যেত। কিন্তু হাদীসের মতনসমূহ মুখস্থ রাখার ক্ষেত্রে শু‘বা খুবই নির্ভরযোগ্য। বরং সনদের মধ্যে ভুল হওয়ার কারণ হচ্ছে এই যে, মতনের প্রতি তার মনোযোগ বেশি থাকা। তাই কখনো কখনো সনদ বর্ণনার ক্ষেত্রে তার ভুল হয়ে যায়। তুহফাতুল আহওয়াযীর লেখকও এ বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, রাবীদের নাম বর্ণনার ক্ষেত্রে যদিও কখনো কখনো শু‘বার ভুল হয়ে যায়, কিন্তু এ ভুলের কারণ হলো তিনি তার স্মৃতিশক্তির বেশির ভাগ ব্যয় করে থাকেন মতনের জন্য। এমতাবস্থায় মতন সম্পর্কিত এত বড় ভুলটি শু‘বার উপর চাপিয়ে দেওয়া অত্যাধিক বাড়াবাড়ি ও অন্যায়। (বিস্তারিত) আসারুস সুনান, পৃ: ৯৮ দ্রষ্টব্য)

অতএব আলোচনা পর্যালোচনার পরেও একথা মনে রাখা উচিত যে, এ মাসআলায় ইখতেলাফ শুধু উত্তম বা অনুত্তম হওয়া নিয়ে। অন্যথায়, সশব্দে নিঃশব্দে দু’ভাবেই আমীন বলা জায়েজ হওয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত। অতএব, এ নিয়ে বিবাদে জড়ানো কোনক্রমেই ঠিক নয়।

واللـه اعـلـم وعـلـمـه اتـم واحـكـم


কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.