অনুবাদ : হযরত উম্মে আতিয়াহ (রা.) বলেন, আমাদেরকে আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর যুগে কোনো মৃত লোকের জন্য তিন দিনের অধিক শোক পালন করতে নিষেধ করা হয়েছিল। কিন্তু স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন। আমরা এ সময় সুরমা ও সুগন্ধি ব্যবহার করতাম না এবং সাধারণ রঙীন সূতার কাপড় ব্যতীত অন্য কোনো প্রকার রঙিন কাপড় পরতাম না। তবে আমাদেরকে ঋতুর গোসলের সময় সামান্য সুগন্ধি ব্যবহার করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। আমাদেরকে জানাযার অনুগমন করতে নিষেধ করা হয়েছিল।
শিরোনামের উদ্দেশ্য : ইমাম বুখারী পূর্বের শিরোনামের হাদীস দ্বারা হায়েযের কাপড় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার বিধান বর্ণনা করেছিলেন, যাকে বলা হয়تنظيف ; এখন এ বাবে তিনি এটা বর্ণনা করছেন যে, হায়েযের গোসল করার সময় নির্দিষ্ট স্থানের দুর্গন্ধ দূর করার জন্য মহিলারা সুগন্ধি ব্যবহৃত করতে পারবে, এমনকি শোকের সময়ও হায়েযের গোসল করার প্রয়োজন দেখা দেয় তখনও হায়েযের রক্তের দুর্গন্ধ দূর করার জন্য সুগন্ধি ব্যবহৃত করতে পারবে। যাকে বলা হয়:تطيييب ; সুতরাং এখানে তিনি تنظيف-এর পর تطييب-এর আলোচনা করেছেন। আল্লামা কিরমানী বলেন এর জন্য মহিলা ইহরাম বাঁধা অবস্থায় না হওয়া শর্ত।
ব্যাখ্য-বিশ্লেষণ
বুখারী শরীফের উলেখযোগ্য ব্যাখ্যাগ্রন্থ যেমন ওমদাতুল কারী, ফতহুল বার ইত্যাদিতে সনদে قال حدثنا حماد بن زيد عن ايوب عن حفصة-এর পরে রয়েছে: قال ابو عبد الله او هشام بن حسان عن حفصة عن ام عطية عن النبي (ص) الخ ; তবে قال ابو عبد الله او هشام হতে পরবর্তী ইবারত শুধুমাত্র কয়েকটি কপিতে (যেমন, মুসতামলী, কারীমায়) রয়েছে। আর ابو عبد الله দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ইমাম বুখারী।
উদ্দেশ্য হলো, ইমাম বুখারী বলেন যে, হাম্মাদের এ সন্দেহ হয়েছে যে, এ দু’জন শায়খ আইয়ুব এবং হিশাম হতে যে কোনো একজনে এ রেওয়ায়েতটি হাফসা হতে বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী এ হাদীসটি এ সনদেই কিতাবুত্তালাক পৃষ্ঠা ৮০৪-এ উলেখ করেছেন। কিন্তু সেখানে সন্দেহ প্রকাশক কোনো ইবারত নেই।
وَكُنَّا نُنْهَى : কোনো সাহাবী যদি কোনো ক্ষেত্রে امرنا অথবা نهينا বলেন তখন অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতে সেই হাদীস মারফূ’-এর হুকুমে বিবেচিত হয়।
عَنْ حَفْصَةَ : এখানে হাফসা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো হাফসা বিনতে সিরীন আনসারী। তাঁর উপনাম উম্মুল হুযাইল। ওমদাতুল কারী পৃভৃতিতে এরূপই রয়েছে। মাওলানা ওয়াহিদুজ্জামান সাহেব তাইসীরুল বারী কিতাবের প্রথম খণ্ডে অনুবাদ করার সময় ভুলবশতঃ উম্মুল মুমিনীন লিখে দিয়েছেন। মূলতঃ তিনি উম্মুল মুমিনীন হাফসা নন।
نُحِدَّ : শব্দটি বাবে ইফআল হতে ব্যবহৃত। অর্থ- সাজসজ্জা ত্যাগ করা, শোক পালন করা।
عَصْبٍ : ثَوْبَ عَصْبٍ এমন কাপড়কে বলা হয় যার সুতার মধ্যে কয়েকটি গিরা দেওয়া হত, অতঃপর এ অবস্থায়ই রং করার পর তা বুনন করা হয়। সুতরাং গিরার স্থানগুলোতে রং লাগত না; বরং সাদা থেকে যায়। সম্ভবত এ কারণেই কেউ কেউ عصب অর্থ করেছেন রেখাবিশিষ্ট চাদর।
হাদীসের মর্ম হলো শোক অবস্থায় এমন কাপড় পরিধান করা নিষেধ যা সাজসজ্জার জন্য রঙ করা হয়। ইমাম নবভী লিখেছেন : قال ابن المنذر اجمع العلماء علي انه لا يجوز للمحادة لبس الثياب المعصفر الخ ইবনুল মুনযির বলেন, ওলামায়ে কেরামের এ বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে যে, শোকপালনকারিণীর জন্য কালো রঙ দ্বারা রঙীন কাপড় ব্যতীত অন্য রঙের কাপড় বা হলদে কাপড় পরিধান করা জায়েয নয়। এর দ্বারা জানা গেল যে, শোকপালনকারিণীর জন্য কালো পোশাক পরিধান করা জায়েয। তাই عصب সম্ভবত ফিকে কালো রঙের হবে। কারণ, রেখাবিশিষ্ট চাদর ইয়েমেনের উন্নতমানের কাপড় হিসেবে গণ্য, যা সম্ব্রান্ত, নেতৃস্থানীয় ও ধনাঢ্য লোকেরা পরিধান করে থাকে। যেমন আল্লামা ইবনে হুমাম বলেন, আমাদের মতে শোক পালনকারিণী عصب পরিধান করবে না।
এখানে এতটুকু কথা মনে রাখা চাই যে, ثوب عصبও যদি উত্তম হয় এবং সাজ-সজ্জার কারণ হয় তাহলে তা ব্যবহার করা জায়েয হবে না। কারণ নাসাঈ শরীফের রেওয়ায়েত এভাবে রয়েছে: لا تلبس ثوبا مصبوغا ولا ثوب عصب الخ এর দ্বারা স্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, অন্যান্য রঙীন কাপড়ের মত ثوب عصبও নিষিদ্ধ। অর্থাৎ যে কাপড়ই সাজসজ্জার ও শোভাবর্ধনের কারণ হবে তাই বর্জনীয়।
نُبْذَةٍ : শব্দটি একবচন, বহুবচনে انباذ অর্থ; কিছু; সামান্য; কিঞ্চিত; অল্প পরিমাণ; এখানে উদ্দেশ্য হলো অংশ।
كُسْتِ أَظْفَارٍ : এ শব্দটি বিভিন্ন হাদীসে বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। যেমন:
كُسْتِ أَظْفَارٍ ইযাফত সহকারে:আতফ ব্যতীত। যেমন এখানে এবং বুখারীর ৮০৪ পৃষ্ঠায়।كُسْتِ ظِفَار আলিফ ব্যতীত। যেমন বুখারীর তালাক পরিচ্ছেদে।قُسْط اَوْ اَظْفَار মুসলিম শরীফে, ইবনে মাজাহ ছানী ১৫২ পৃষ্ঠায়, কিতাবুত্তালাক। এখানে او হরফে আতফ এবং ق বর্ণে ব্যবহৃত রয়েছে। قُسْط و اَظْفَار মুসলিমেরই অপর এক রেওয়ায়েতে এবং আবু দাউদ ৩১৫, নাসাঈ ছানী ১০১। এগুলিতে ওয়াও হরফে আতফ যোগে এবং ك-এর পরিবর্তে ق বর্ণে ব্যবহৃত রয়েছে।
মোটকথা, শব্দটি চারভাবে বর্ণিত আছে:
১. كُسْتِ أَظْفَار ইযাফত সহকারে ও আলিফযোগে।
২. قُسْط و اَظْفار ওয়াও হরফে আতফ যোগে।
৩. قُسْط اَوْ اَظْفار অর্থাৎ اَوْ হরফে আতফ যোগে।
উলেখ্য যে, كست শব্দটি ك-এর পরিবর্তে ق এবং ت-এর পরিবর্তে ط দিয়েও লেখা হয়। যেমন ইমাম বুখারী কিতাবুত্তালাকে লিখেছেন:يقال الكُست و القُسظ ، الكافور و القافور
কোনটি সঠিক?
হযরত গাংগুহি (র.) বলেন, সর্বোত্তম ব্যাখ্যা হলো এখানে হরফে আত্ফ উহ্য রয়েছে। এরূপ উহ্য থাকাটা আহলে আরবদের মধ্যে ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। এ দুটি তথা কুস্ত ও আযফার থেকে যা হয় বা এ ধরনের সুগন্ধিযুক্ত বস্তু হতে ধুনি নেওয়া যেতে পারে।
كست হলো কুস্তে হিন্দী বা ধূপ। اظفار আলিফযোগে, একপ্রকার সুগন্ধি কাঠ যা আবরণবিশিষ্ট নখের ন্যায়। অথবা এমন কাঠ নখের মত কেটে আতর তৈরি করা হয়। ইহাকে أطفار الطيبও বলা হয়। এ নামেই আতর ব্যবসায়ীদের নিকট পাওয়া যায়।
আল্লামা আইনী বলেন, ইবনুত্তীন বলেছেন: صوابه قسط ظفار অর্থাৎ সঠিক হলো قسط ظفار যা ظفار-এর দিকে সম্বন্ধকৃত। যিফার হলো আদনের একটি উপকূল। কুরতুবী বলেন তা হলো ইয়েমেনের একটি শহর। তবে মুসলিমে যে قسط و اظفار আছে তা বিশুদ্ধতম। এবং তা হলো দুটি: ‘কুস্ত’ ও ‘যিফার’। যা একপ্রকার কালো আতর এবং তার অংশ হলো যফরসদৃশ, যা হলো ধূপের ন্যায়। যা হায়েযের গোসলকারীর ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে, যাতে হায়েযের দুর্গন্ধ দূর হয়ে যায়।
মোটকথা, গোসলের এ সুগন্ধিগুলো হতে যে কোনো একটি সুগন্ধি ব্যবহার করতে হবে যেন দুর্গন্ধ দূর হয়ে যায়। পরবর্তীতে যেন এগুলোর কল্পনা দ্বারা মন-মানসিকতায় ঘৃণা বা মলিনতার সৃষ্টি না হয়।
কোন মন্তব্য নেই