Header Ads

সহীহ বুখারীঃ কিতবুল আজানঃ ইমাম ও মুক্তাদির জন্য সফরে বা নিবাসে নামাজে কেরাত ওয়াজিব হওয়া

 باب وُجُوبِ الْقِرَاءَةِ لِلإِمَامِ وَالْمَأْمُومِ فِي الصَّلَوَاتِ كُلِّهَا فِي الْحَضَرِ وَالسَّفَرِ وَمَا يُجْهَرُ فِيهَا وَمَا يُخَافَتُ

حَدَّثَنَا مُوسَى، قَالَ حَدَّثَنَا أَبُو عَوَانَةَ، قَالَ حَدَّثَنَا عَبْدُ الْمَلِكِ بْنُ عُمَيْرٍ، عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ، قَالَ شَكَا أَهْلُ الْكُوفَةِ سَعْدًا إِلَى عُمَرَ ـ رضى الله عنه ـ فَعَزَلَهُ وَاسْتَعْمَلَ عَلَيْهِمْ عَمَّارًا، فَشَكَوْا حَتَّى ذَكَرُوا أَنَّهُ لاَ يُحْسِنُ يُصَلِّي، فَأَرْسَلَ إِلَيْهِ فَقَالَ يَا أَبَا إِسْحَاقَ إِنَّ هَؤُلاَءِ يَزْعُمُونَ أَنَّكَ لاَ تُحْسِنُ تُصَلِّي قَالَ أَبُو إِسْحَاقَ أَمَّا أَنَا وَاللَّهِ فَإِنِّي كُنْتُ أُصَلِّي بِهِمْ صَلاَةَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَا أَخْرِمُ عَنْهَا، أُصَلِّي صَلاَةَ الْعِشَاءِ فَأَرْكُدُ فِي الأُولَيَيْنِ وَأُخِفُّ فِي الأُخْرَيَيْنِ‏.‏ قَالَ ذَاكَ الظَّنُّ بِكَ يَا أَبَا إِسْحَاقَ‏.‏ فَأَرْسَلَ مَعَهُ رَجُلاً أَوْ رِجَالاً إِلَى الْكُوفَةِ، فَسَأَلَ عَنْهُ أَهْلَ الْكُوفَةِ، وَلَمْ يَدَعْ مَسْجِدًا إِلاَّ سَأَلَ عَنْهُ، وَيُثْنُونَ مَعْرُوفًا، حَتَّى دَخَلَ مَسْجِدًا لِبَنِي عَبْسٍ، فَقَامَ رَجُلٌ مِنْهُمْ يُقَالُ لَهُ أُسَامَةُ بْنُ قَتَادَةَ يُكْنَى أَبَا سَعْدَةَ قَالَ أَمَّا إِذْ نَشَدْتَنَا فَإِنَّ سَعْدًا كَانَ لاَ يَسِيرُ بِالسَّرِيَّةِ، وَلاَ يَقْسِمُ بِالسَّوِيَّةِ، وَلاَ يَعْدِلُ فِي الْقَضِيَّةِ‏.‏ قَالَ سَعْدٌ أَمَا وَاللَّهِ لأَدْعُوَنَّ بِثَلاَثٍ، اللَّهُمَّ إِنْ كَانَ عَبْدُكَ هَذَا كَاذِبًا، قَامَ رِيَاءً وَسُمْعَةً فَأَطِلْ عُمْرَهُ، وَأَطِلْ فَقْرَهُ، وَعَرِّضْهُ بِالْفِتَنِ، وَكَانَ بَعْدُ إِذَا سُئِلَ يَقُولُ شَيْخٌ كَبِيرٌ مَفْتُونٌ، أَصَابَتْنِي دَعْوَةُ سَعْدٍ‏.‏ قَالَ عَبْدُ الْمَلِكِ فَأَنَا رَأَيْتُهُ بَعْدُ قَدْ سَقَطَ حَاجِبَاهُ عَلَى عَيْنَيْهِ مِنَ الْكِبَرِ، وَإِنَّهُ لَيَتَعَرَّضُ لِلْجَوَارِي فِي الطُّرُقِ يَغْمِزُهُنَّ‏.‏

পরিচ্ছেদ: ইমাম ও মুক্তাদির জন্য সফরে বা নিবাসে নামাজে কেরাত ওয়াজিব হওয়ার বর্ণনা, সশব্দে কেরাতবিশিষ্ট নামাজ হোক বা নিঃসব্দে কেরাতবিশিষ্ট নামাজ হোক।

অনুবাদ: হযরত জাবির ইবনে সামুরাহ (রা.) বলেন, কুফাবাসীগণ উমারের কাছে সা'আদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে তিনি তাঁকে পদচ্যুত করে আম্মারকে তাদের শাসনকর্তা নিযুক্ত করলেন। কুফাবাসীগণ সা'আদের বিরুদ্দে অনেক অভিযোগ পেশ করলো। এমনকি তারা বললো যে, তিনি নামাজও ভালোভাবে আদায় করেন না। সুতরাং ওমর তাঁকে ডেকে পাঠালেন। তিনি এলে ওমর বললেন, হে আবু ইসহাক! এরা আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে যে, আপনি নামাজও ভালোভাবে আদায় করেন না। এ কথা শুনে সা'আদ বললেন, আমি যথার্থভাবে নামাজ আদায় করি না। তাহলে শুনুন আমি তাদের সাথে নিয়ে আল্লাহর রাসূল (সা.) যেভাবে নামাজ আদায় করতেন, ঠিক সেইভাবেই নামাজ আদায় করতাম। আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর নামাজ থেকে কোন কিছুই বাদ দিতাম না। আমি ইশার নামাজ এভাবে আদায় করতাম যে, প্রথম দুই রাকাআতে সময় লাগাতাম। কিন্তু শেষ দুই রাকআত তাড়াতাড়ি শেষ করতাম। এ কথা শুনে ওমর বললেন, হে আবু ইসহাক, আপনার সম্পর্কে আমার এটিই ধারণা ছিল। সুতরাং ওমর সা'আদের সাথে একজন বা কয়েকজন লোককে কুফায় পাঠালেন কুফাবাসীদের কাছ থেকে তাঁর সম্পর্কে জানার জন্য। এ তদন্তে তারা কুফার কোনো মসজিদ বাদ না দিয়ে সকল মসজিদে উপস্থিত হলো। মুসল­ীদের কাছে সা'আদ সম্পর্কে প্রশ্ন করলো এবং সব জায়গার লোকই তার ভুয়সী প্রশংসা করলো। অবশেষে বনী আবাসের মসজিদে উপস্থিত হলে এক ব্যক্তি যাকে উসামাহ ইবনে কাতাদাহ বলে ডাকা হতো এবং উপনাম ছিল আবু সাদাহ সে বললো, যখন তোমরা আমাদেরকে শপথ করালে, তখন শোন, সা'আদ জিহাদে অংশগ্রহণ করতেন না, গণীমাতের সম্পদ সমভাবে অর্থাৎ বিধান মতো বন্টন করতেন না এবং বিচার ফয়সালায় ইনসাফ করতেন না। সব কথা শুনে সা'আদ বললেন, এরপর যেহেতু আমার বলার কিছু নেই, আমি তোমাকে তিনটি বদদোয়া দিচ্ছি। এরপর তিনি বললেন, হে আল্লাহ, তোমার এই বান্দা যদি মিথা কথা বলে থাকে, আর প্রদর্শনী ও প্রচারের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে তার হায়াত দীর্ঘায়িত করে দাও এবং দারিদ্র্য ও অভাব বৃদ্ধি করে দীর্ঘায়িত করে দাও এবং তাকে ফিতনা ও অশান্তিতে নিমজ্জিত করে দাও। পরবর্তীকালে যখন এ ব্যক্তিকে তার অবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে বলতো, আমি দীর্ঘ বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত, ফিতনা ও অশান্তিতে নিমজ্জিত এক বৃদ্ধ। আমার ওপর সা'আদের বদদোআ কার্যকরী হয়েছে। আবদুল মালেক বলেন, পরবর্তীকালে আমি লোকটিকে দেখেছিলাম। অতিবৃদ্ধাবস্থায় পৌঁছার কারণে তার চোখের ওপরের ভ্র“-যুগল চোখের ওপর ঝুলে পড়েছিল। সে পথে যুবতীদেরকে উত্যক্ত করতো এবং তাদের প্রতি হস্ত প্রসারিত করতো।

প্রাসঙ্গিক আলোচনা

হাদীসের সামঞ্জস্য: শিরোনামের সাথে হাদীসের সামঞ্জস্য فَإِنِّي كُنْتُ أُصَلِّي بِهِمْ صَلاَةَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَا أَخْرِمُ عَنْهَا -এর সাথে।

শিরোনামের ব্যাখ্যা: এটি ৬টি মাসআলা সম্বলিত একটি ব্যাপক শিরোনাম।

উলে­খ্য যে, শিরোনামে ছয়টি অংশ রয়েছে। ১. ইমামের উপর কেরাত ওয়াজিব হওয়া, ২. মুক্তাদির উপর কেরাত ওয়াজিব হওয়া, ৩. নিবাসে কেরাত ওয়াজিব হওয়া, ৪. সফরে কেরাত ওয়াজিব হওয়া, ৫. جهري নামাজে কেরাত ওয়াজিব হওয়া, ৬. سِرِّي নামাজে কেরাত ওয়াজিব হওয়া।

আল্লামা আইনী (র.) বলেন: ولا نزاع في قراءة النبي (ص) في صلوته دائما وهو يدل علي وجوب القراءة الخ

অর্থাৎ এ ব্যাপারে তো কোনো মতপার্থক্য নেই যে, নবী করীম (সা.) নামাজে কেরাত পড়তেন। যা ওয়াজিব হওয়ার দলীল। এবং এটি শিরোনামের প্রথমাংশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

وما اخرم عنها : আমি নবী করীম (সা.)-এর নামাজে অবহেলা করিনা। এর দ্বারা শিরোনামের পঞ্চম ও ষষ্ঠ অংশ প্রমাণ হয়ে গেল। অর্থাৎ جهري নামাজে সশব্দে আর سري নামাজে নিঃসব্দে কেরাত পড়া।

এবং এতে কোনো মতভেদ নেই যে, নবী করীম (সা.) সফরে ও নিবাসে সকল নামাজেই কেরাত পড়তেন। এটা শিরোনামের তৃতীয় ও চতুর্থ অংশের দলীল। অর্থাৎ তৃতীয় ও চতুর্থ মাসআলা প্রমাণিত হয়ে গেল। কারণ, নবী করীম (সা.) থেকে কেরাত বর্জন করার প্রমাণ নেই।

এখন রয়ে গেল শুধুমাত্র দ্বিতীয় অংশটি। অর্থাৎ মুক্তাদির কেরাত পড়বে কিনা? এটা হাদীসের কোনো অংশ দ্বারা -ই প্রমাণ হয় নি।  

হাদীসের পুনরাবৃত্তি: হাদীসটি বুখারী শরীফে ১০৪, ১০৫, ১০৬ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে।

حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، قَالَ حَدَّثَنَا الزُّهْرِيُّ، عَنْ مَحْمُودِ بْنِ الرَّبِيعِ، عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ "‏ لاَ صَلاَةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ ‏"‏‏.‏

অনুবাদ: হযরত উবাদাতা ইবনে সামেত (রা.) বলেন যে, আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, যে লোক (নামাজে) সূরা ফাতিহা পড়লো না, তার নামাজই হলো না।

প্রাসঙ্গিক আলোচনা

হাদীসের সামঞ্জস্য: আল্লামা আইনী (র.) বলেন, শিরোনামের সাথে হাদীসের সামঞ্জস্য অস্পষ্ট। কারণ, শিরোনাম হলো عام; সূরা ফাতিহা হোক বা অন্য কোনো সূরা। কিন্তু হাদীসে আছে নির্দিষ্টভাবে সূরা ফাতিহার কথা, যা হলো خاص ;

হাদীসের পুনরাবৃত্তি: হাদীসটি বুখারী শরীফে ১০৪ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে।

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ، قَالَ حَدَّثَنَا يَحْيَى، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ، قَالَ حَدَّثَنِي سَعِيدُ بْنُ أَبِي سَعِيدٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم دَخَلَ الْمَسْجِدَ، فَدَخَلَ رَجُلٌ فَصَلَّى فَسَلَّمَ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَرَدَّ وَقَالَ ‏"‏ ارْجِعْ فَصَلِّ، فَإِنَّكَ لَمْ تُصَلِّ ‏"‏‏.‏ فَرَجَعَ يُصَلِّي كَمَا صَلَّى ثُمَّ جَاءَ فَسَلَّمَ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ ‏"‏ ارْجِعْ فَصَلِّ فَإِنَّكَ لَمْ تُصَلِّ ‏"‏ ثَلاَثًا‏.‏ فَقَالَ وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ مَا أُحْسِنُ غَيْرَهُ فَعَلِّمْنِي‏.‏ فَقَالَ ‏"‏ إِذَا قُمْتَ إِلَى الصَّلاَةِ فَكَبِّرْ، ثُمَّ اقْرَأْ مَا تَيَسَّرَ مَعَكَ مِنَ الْقُرْآنِ، ثُمَّ ارْكَعْ حَتَّى تَطْمَئِنَّ رَاكِعًا، ثُمَّ ارْفَعْ حَتَّى تَعْتَدِلَ قَائِمًا، ثُمَّ اسْجُدْ حَتَّى تَطْمَئِنَّ سَاجِدًا، ثُمَّ ارْفَعْ حَتَّى تَطْمَئِنَّ جَالِسًا، وَافْعَلْ ذَلِكَ فِي صَلاَتِكَ كُلِّهَا ‏"‏‏

অনুবাদ: হযরত আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসূল (সা.) (এক সময়) মসজিদে গেলেন। সে সময় অন্য এক ব্যক্তিও মসজিদে প্রবেশ করলো এবং নামাজ আদায় করে আল্লাহর নবী (সা.)-কে এসে সালাম জানালো, তিনি তার সালামের জবাব দিয়ে বললেন, পুনরায় নামাজ আদায় করো। কারণ, তুমি নামাজ আদায় করোনি। লোকটি গিয়ে পূর্বের মতই নামাজ আদায় করলো এবং ফিরে এসে আল্লাহর নবী (সা.)-কে সালাম দিল। তিনি পুনরায় বললেন, গিয়ে আবার নামাজ আদায় করো। কারণ, তোমার নামাজ আদায় হয়নি। এমন তিনবার বললেন। এরপর লোকটি বললো, সেই মহান সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য বিধানসহ প্রেরণ করেছেন, এর চেয়ে ভাল করে নামাজ আদায় করতে আমি জানি না। সুতরাং আমাকে শিখিয়ে দিন। তখন আল্লাহর নবী (সা.) বললেন, যখন তুমি নামাজ আদায় করতে দাঁড়াবে, তাকবীর তাহরীমা বলে শুরু করবে এবং কোরআনের যেখান থেকে তোমার জন্য সহজ হয়, সেখান থেকে পড়বে। তারপর রুক‚ করবে এবং তৃপ্তি সহকার রুক‚ করবে। এরপর উঠে ঠিকভাবে দাঁড়াবে। এরপর সিজদায় গিয়ে তৃপ্তি সহকারে সিজদা করবে। তারপর সিজদা থেকে মাথা উঠিয়ে তৃপ্তি সহকারে বসবে। আর এভাবেই সকল নামাজ আদায় করবে।

প্রাসঙ্গিক আলোচনা

হাদীসের সামঞ্জস্য: শিরোনামের সাথে হাদীসের সামঞ্জস্য ثُمَّ اقْرَأْ مَا تَيَسَّرَ مَعَكَ مِنَ الْقُرْآنِ -এর সাথে। যেহেতু এটা খাল্লাদ বিন রাফে’ -র ঘটনা। আর এটি ছিল দিনের নামাজ। সুতরাং শিরোনামের ষষ্ঠ অংশ ما يخافت -এর সাথে সামঞ্জস্য হয়ে গেল। অর্থাৎ سري নামাজে নবী করীম (সা.) কেরাতের হুকুম দিয়েছেন।

হাদীসের পুনরাবৃত্তি: হাদীসটি বুখারী শরীফে ১০৪ -১০৫, ১০৯, ৯২৪, ৯৮৬ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে।

শিরোনামের উদ্দেশ্য: ইমাম বুখারীর উদ্দেশ্য একেবারেই স্পষ্ট। অর্থাৎ সফরে বা নিবাসে সকল নামাজেই ইমাম মুক্তাদি উভয়ের উপর কেরাত পড়া ওয়াজিব প্রমাণ করা।

ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ

شَكَا أَهْلُ الْكُوفَةِ : اهل الكوفة অর্থাৎ بعض اهل الكوفة কতিপয় কূফাবাসী।

الْكُوفَةِ : কূফা শব্দটির অর্থ হলো বালির গোলাকার লাল টিলা। যেহেতু যারা এখানে বসবাস করছে এখানে পূর্ব যুগে গোলাকার লাল টিলা ছিল তাই এর নামা কূফা হয়ে গেছে। এ কূফা ইরাকের একটি প্রসিদ্ধ শহরের; বরং ইরাকের সর্বাধিক বৃহৎ শহর। যা বাগদাদ হতে ৩০ ক্রোশ অর্থাৎ আনুমানিক ৯০ মাইল দূরত্বে অবস্থিত। এটিই সেই গুরুত্বপূর্ণ স্থান যাকে হযরত আলী (রা.) রাজধানী বানিয়েছিলেন, এবং সেখানেই তিনি ইন্তেকাল করেন।

سَعْدًا : হযরত সা’দ বিন আবী ওয়াক্কাস (রা.) : হযরত সা’দ (রা.) ১৭ হিজরীতে কূফার গভর্নর নির্বাচিত হন। ২১ বা ২০ হিজরীতে তিনি সেখানে থেকে বরখাস্ত হন।

তাঁর সম্পর্কে আরো জানতে দেখুন নাসরুল বারী প্রথম খণ্ড, পৃ. ২৭৩

أَبَا إِسْحَاقَ : এ আবু ইসহাক হযরত সা’দ বিন আবী ওয়াক্কাস (রা.) -এর উপনাম। তার বড় ছেলের নামের দিকে নিসবত করে তাকে এ নামে ডাকা হত।

فَعَزَلَهُ : কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল লোক ওমর ফারূক (রা.) -এর নিকট তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে। যার পরিপ্রেক্ষিতে ওমর (রা.) তাকে বরখাস্ত করেন। বুঝা গেল মাসলাহাতের কারণে বিনা তদন্তেও কাউকে বরখাস্ত করা যায়। : ওমদাতুল কারী

মাসলাহাত এখানে এই ছিল যেন ফেতনা মাথাচাড়া পেতে না পারে; বরং ফেতনা যেন দমে যায়। আবার কেউ  কেউ বলেন, হযরত ওমর (রা.) -এর নীতি ছিল তিনি কাউতে ৪ বছরের অধিক গভর্নর পদে বহাল রাখেন না। তবে এ উক্তিটি সঠিক বলে মনে হাচ্ছেনা। কেননা, হযরত মুয়াবিয়া (রা.) ১৭ হিজরীতে ওমর (রা.)-এর পক্ষ হতে সিরিয়ার গভর্নর নিযুক্ত হন, এবং ওমর (রা.) -এর পূর্ণ জীবন পর্যন্ত তিনি গভর্নর পদে বহাল থাকেন। ওমর (রা.) ২৩ হিজরীতে শহীদ হন।

مَا أَخْرِم : অর্থাৎ لا ان انقص আমি কম করিনা।

فَأَرْكُدُ فِي الأُولَيَيْنِ : প্রথম দু’রাকাতে দীর্ঘক্ষণ বিলম্ব করি, অর্থাৎ কেরাত দীর্ঘ করি।

وَأُخِفُّ فِي الأُخْرَيَيْنِ‏ : এবং শেষ দু’রাকাতে হালকা করি, অর্থাৎ সংক্ষেপ করি।

ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ

لاَ صَلاَةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ :

ইমামের পিছনে সূরা ফাতেহা পাঠ করার বিষয়টি শুরু যমানা থেকেই বিতর্কিত এবং খুব আলোচনার বিষয় হিসেবে চলে আসছে। নামাজের বিতর্কিত মাসআলাসমূহের মধ্যে এ মাসআলাটিই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এ মাসআলার মধ্যে বিতর্কটা উত্তম অনুত্তমের নয়; এটি জায়েজ নাজায়েজ বরং ওয়াজিব ও হারামের মতভেদ। যার ফলে এ মাসআলা নিয়ে লেখনী ও মৌখিক বিতর্কের বাজার খুব গরম থেকেছে এবং এ বিষয়ে উভয় পক্ষ থেকে এত পরিমাণে কিতাব রচনা করা হয়েছে যেগুলো নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থাগার তৈরি হতে পারে।

আমাদের জানা মতে এ বিষয়ে সর্বপ্রথম ‘জুযউল কিরাআতি খলফাল ইমাম’ নামে ইমাম বুখারী (র.) কিতাব লিখেছেন। তাঁর পরে ইমাম বায়হাকী (র.) এ বিষয়ে ‘কিতাবুল কিরাআত’ কিতাবটি লিখেছেন। সে প্রাথমিক যুগে কোনো হানাফী আলেম এ বিষয়ে আলাদা কিতাব লিখেছেন বলে উলে­খ পাওয়া যায় না। তবে ইমাম বায়হাকী (র.) তার ‘কিতাবুল কিরাআতে’ এক হানাফী আলেমের বিরুদ্ধে খুব বলতে থাকেন। এ থেকে বুঝা যায় হানাফী আলেমগণের কেউ একজন ইমাম বায়হাকীর আগে হয়তো এ বিষয়ে কিতাব লিখেছিলেন।

অতঃপর পরবর্তী যমানার গায়রে মুকালি­দ স¤প্রদায় যখন এ মাসআলাটি নিয়ে খুব শোরগোল শুরু করে এবং একে কেন্দ্র করে হানাফীগণের বিরুদ্ধে একটা প্ল্যাটফরম তৈরি করে তাদের নামাজ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় তখন হিন্দুস্তানের ওলামায়ে কেরাম তাদের জবাবে কয়েকটি কিতাব রচনা করেছেন। সে সুবাদে আল্লামা আব্দুল হাই লাখনোভী (র.) ‘ইমামুল কালাম ফীল কিরাআতি খলফাল ইমাম’ রচনা করেছেন। এমনিভাবে হযরত মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম সাহেব নানুতবী (র.) ‘আদ-দালীলুল মুহকাম ফী তরকিল কিরাআতি লিল মুঅতাম’ অথবা ‘তাওসীকুল কালাম ফী তরকিল কিরাআতি খলফাল ইমাম’ লিখেছেন।

হযরত মাওলানা রশীদ আহমদ সাহেব গাঙ্গুহী (র.) ‘হেদায়াতুল মু‘তাদী ফী কিরাআতিল মুকতাদী’, হযরত মাওলানা আহমদ আলী সাহেব সাহারানপুরী (র.) ‘আদদালীলুল কভী আলা তারকিল কিরাআতি মুকতাদী’, এবং শায়েখ মুহাম্মদ হাশেম সিন্ধী (র.) ‘তানকীহুল কালাম ফীল কিরাআতি খলফাল ইমাম এবং আল্লামা যহীর হাসান নীমভী (র.) একাধিক কিতাব রচনা করেছেন।

এরপর শাহ সাহেব (র.) ‘ফাসলুল খিতাব ফী মাসআলাতি উম্মিল কিতাব’ নামে ফারসীতে একটি কিতাব এবং ‘খাতিমাতুল খিতাব ফী মাসআলাতি ফাতিহাতিল কিতাব’ নামে আরেকটি আরবি কিতাব রচনা করেন। এরপর ‘ই‘লাউস সুনান’ কিতাবের রচয়িতা হযরত মাওলানা যফর আহমদ উসমানী সাহেব ‘ফাতিহাতুল কালাম ফীল কিরাআতি খলফাল ইমাম’ কিতাবটি রচনা করেছেন। পরিশেষে আমাদের কালে এসে হযরত মাওলানা সারফারায খান সফদার সাহেব ‘আহসানুল কালাম ফী তরকিল কিরাআতি খলফাল ইমাম’ নামে এ বিষয়ের উপর দুই খণ্ডের একটি কিতাব রচনা করেছেন। যাকে এ বিষয়ক সর্বোচ্চমানের সমষ্টি বলা যায়। আমরা এখানে আলোচ্য মাসআলার জরুরী বিশ্লেষণ সংক্ষেপে তুলে ধরছি।

মাযহাবসমূহের বিশদ আলোচনা

আলোচ্য মাসআলায় মাযহাবসমূহের তফসীল নিম্নরূপ:

১.    হানাফীগণের মতে সশব্দ ও নিঃশব্দ সকল নামাজে ইমামের পেছনে সূরা ফাতেহা পাঠ করা মাকরূহে তাহরীমী। সুফিয়ান ছওরী, ইমাম যুহরী, ইমাম শা’বী, ইবরাহীম নখয়ী, ইবনে আবী লাইলা, ইমাম আহমদের এক রেওয়ায়েত ইমাম আওযায়ীরও এক রেওয়ায়েত হানাফীদের অনুকূল।

ইমাম মুহাম্মদ (র.) মুয়াত্তায় লিখেছেন:

قال محمد لا قراءة خلف الامام فيما جهر فيه ولا فيما لم يجهر بذلك جاءت عامة اللآثار وهو قول ابي حنيفة  ইমামের পিছনে কেরাত না পাড় চাই, ইমাম সশব্দে কেরাত পড়–ক না নিঃশব্দে। সকল আছার ও দলীল এটিকেই সমর্থন করে, এবং এটিই ইমাম আবু হানিফার মাযহাব।

ফায়েদা: এ দ্বারা ইমাম মুহাম্মদ (র.) -এর মাযহাবও স্পষ্ট হয়ে গেল যে, ইমাম মুহাম্মদ (র.)ও কোনো নামাজে ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পড়ার প্রবক্তা ছিলেন না। এটিই তার রচিত কিতাবুল আছারেও (পৃ. ২১) বর্ণিত হয়েছে। মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ দ্বারা এ বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে গেল কেউ কেউ বলেন যে, ইমাম মুহাম্মদ ইমামের পিছনে মুক্তাদির সূরা ফাতিহা পড়াতে সতর্কতামূলক জায়েয ও মুস্তাহাব মনে করেন। তাদের এ মত সঠিক নয়। আল্লামা ইবনে হুমাম লিখেছেন: الاصح ان قول محمد كقولهما

আল্লামা ইবনে হুমাম (রা.) -এর এ কওল দ্বারা ইমাম আবু ইউসুফ (র.) -এর মাযহাবও স্পষ্ট হয়ে গেল যে, তিনিও সকল নামাজে ইমামের পিছনে মুক্তাদির সুরা ফাতিহা পড়ার প্রবক্তা ছিলেন না।

২.    অপরদিকে ইমাম শাফেয়ীর মতে সশব্দ ও নিঃশব্দ উভয় প্রকার নামাজে ইমামের পেছনে ফতেহা পাঠ করা ওয়াজিব।

৩.    ইমাম মালেক ও ইমাম আহমদ (র.) এ বিষয়ে একমত যে, সশব্দ কেরাতবিশিষ্ট নামাজে ইমামের পেছনে ফাতেহা পাঠ করা ওয়াজিব নয়। এরপরে তাদের থেকে বিভিন্ন রকমের বর্ণনা রয়েছে। কোনো বর্ণনায় ইমামের পেছনে ফাতেহা পাঠকে মাকরূহ বলা হয়েছে, কোনো বর্ণনায় জায়েজ, আবার কোনো বর্ণনায় মুস্তাহাব বলা হয়েছে। আর নিঃশব্দ নামাজের ব্যাপারেও তাদের থেকে তিনটি বর্ণনা রয়েছে। একটি হচ্ছে ওয়াজিব, দ্বিতীয়টি হচ্ছে মুস্তাহাব এবং তৃতীয়টি হচ্ছে জায়েজ।

এ তফসীল থেকে একথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, সশব্দ কেরাতবিশিষ্ট নামাজে ইমামের পেছনে ফাতেহা পাঠ ওয়াজিব হওয়ার মতটি শুধুমাত্র ইমাম শাফেয়ীর; বরং এটাও তাঁর প্রসিদ্ধ মত হিসেবে, নচেৎ বাস্তবতা হলো ইমাম শাফেয়ী ও সশব্দ নামাজে ইমামের পেছনে ফাতেহা পাঠকে ওয়াজিব বলেন না। ‘আলমুগনী’তে ইবনে কুদামার কথা থেকে এটাই বোঝা যায়। এমনিভাবে ‘কিতাবুল উম্ম’ এ খোদ ইমাম শাফেয়ীর কথা থেকেও এটাই বুঝে আসে। কেননা সেখানে ইমাম শাফেয়ী (র.) বলেন: ونـحـن نـقـول كـل صـلاة صـلـيـت خـلـف الامـام والامقـام يـقـرأ قـراءة لايـسـمـع فـيـهـا قـرأ فـيـهـا

‘আর আমরা বলি, প্রত্যক্ষ ঐ নামাজ যা আমরা ইমামের পেছনে পড়ি, ইমাম তেলাওয়াত করেছেন কিন্তু শোনা যায় না এমতাবস্থা তেলাওয়াত করবে।’

উলে­খ্য ‘কিতাবুল উম্ম’ ইমাম শাফেয়ীর নতুন কিতাবগুলোর একটি, পুরাতনগুলো থেকে নয়। যেমন হাফেজ ইবনে কাছীর (র.) ‘আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ’ গ্রন্থে এবং অল্লামা সুয়ূতী  (র.) ‘হাসানুল মুহাযারা’ গ্রন্থে (১/১২২) একথা স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, ইমাম শাফেয়ী (র.) মিসরে স্থানান্তর হওয়ার পর ‘কিতাবুল উম্ম’ লিখেছেন। তাই এটি তাঁর শেষ পর্বের রচনা, যার দাবি হচ্ছে, এ মতটি তাঁর নতুন ও পরবর্তী মত, আগের ও পূর্ববর্তী মত নয়।

এর দ্বারা একথা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, সশব্দ তেলাওয়াতবিশিষ্ট নামাজে ইমামের পেছনে ফাতেহা পাঠ ওয়াজিব হওয়া শুধুমাত্র আমাদের যামানার গায়রে মুকালি­দ গোষ্ঠীর মাযহাব। এমনকি দাউদ যাহেরীর মতও এটা নয়। আল্লামা ইবনে তাইমিয়াও সশব্দ নামাজে ইমামের পেছনে ফাতেহা পাঠ না করার প্রবক্তা। আর নিঃশব্দ নামাজেও সম্ভবত তিনি ফাতেহা পাঠ মুস্তাহাব হওয়ারই পক্ষে।

তবে ইমাম বুখারী ও গায়রে মুকালি­দ গোষ্ঠী এ মতের প্রবক্তা।

গায়রে মুকালি­দরা বলে, ইমামের পিছনে যদি মুক্তাদি সূরা ফাতিহা পাঠ না করে তাহলে তার নামাজ বাতিল হয়ে যাবে।

তাদের জবাবে প্রথমতঃ এতটুকুই বলার আছে যে, জুমহূর ওলামায়ে ইসলাম ও আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের তাহকীক অনুযায়ী বুঝা গেল যে, তাদের এ একেবারেই ভুল ও ভিত্তিহীন। তাই তাদের মতবাদ খণ্ডন করার পিছনে সময় ব্যয় করা বোকামী বৈ কিছুই নয়।

দ্বিতীয়তঃ এ স¤প্রদায় কুরআন কারীমে চিন্তা-ভাবনা করা থেকে বঞ্চিত, তাছাড়া তারা হাদীস দেখে -পড়ে ঠিকই; কিন্তু তা নিয়ে গবেষণা করা থেকে বঞ্চিত।

তবে ইমাম বুখারীর দাবী ও দলীলটি পর্যবেক্ষণ করা দরকার।

ইমাম বুখারীর দাবী ও দলীল: ইমাম বুখারী স্বীয় দাবী প্রমাণ করার জন্য যে তিনটি হাদীস পেশ করেছেন, তন্মধ্য হতে প্রথম হাদীসটি হযরত সা’দ বিন আবী ওয়াক্কাস (রা.) -এর কেরাত করা প্রসঙ্গে। অর্থাৎ এ রেওয়ায়েতটি শুধুমাত্র ইমামের জন্য প্রযোজ্য, মুক্তাদির সাথে এর দূরতম কোনো সম্পর্কও নেই।

তৃতীয় হাদীসের সম্পর্ক হলো শুধুমাত্র منفرد -এর জন্য।

তবে দ্বিতীয় হাদীসটি যা উবাদা বিন সামিত হতে বর্ণিত لاَ صَلاَةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ ইমাম বুখারীর নিকট শুধুমাত্র এ একটি সহীহ ও শক্তিশালী দলীলই রয়েছে।

এর সাফ জবাব হলো এই যে, এ হাদীসের সম্পর্ক শুধুমাত্র ইমাম ও মুনফারিদের সাথে। মুক্তাদির জন্য এ হুকুম নয়। কারণ, হযরত জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা.) -এর হাদীস রয়েছে: من كان له امام فقراءة الامام له قراءة

আর মুক্তাদির জন্য হুকুম হলো যা হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত: قال رسول الله (ص) انما جعل الامام ليؤتم به فاذا كبر فكبروا واذا قرأ فانصتوا (ابن ماجه)

ইমামের পেছনে ফাতেহা পাঠের প্রবক্তাগণের দলিলসমূহ

হযরত উবাদা ইবনে সামেত (রা.)-এর হাদীস : ইমাম শাফেয়ী ও ইমামের পেছনে ফাতেহা পাঠের পক্ষের লোকদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী দলিল হচ্ছে, আলোচ্য অধ্যায়ে বর্ণিত হযরত উবাদা ইবনে সামেতের হাদীসটি:

عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ "‏ لاَ صَلاَةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ ‏"‏‏.‏

হযরত উবাদাতা ইবনে সামেত (রা.) বলেন যে, আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, যে লোক (নামাজে) সূরা ফাতিহা পড়লো না, তার নামাজই হলো না।

এ হাদীসটি শাফেয়ী মাযহাবের পক্ষে সুস্পষ্ট হলেও সহীহ নয়। যার দরুন ইমাম আহমদ (র.) এ হাদীসকে ইল­তযুক্ত বলেছেন। ইবনে তাইমিয়া তার ফতোয়ায় একথা উলে­খ করেছেন। এমনিভাবে হাফেজ ইবনে আব্দুল বার ও আরো অন্যান্য মুহাদ্দিসীনও এটিকে ‘মা‘লূল’-ইল­তযুক্ত বলেছেন। এর তফসীল হচ্ছে, হযরত উবাদা ইবনে সামেতের হাদীসটি তিনটি সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।

১. সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মারফূ বর্ণনায়:

ان رسـول الـلـه ﷺ قـال : لا صـلاة لـمـن لـم يـقـرأ بـفـاتـحـة الـكـتـاب ـ (لـفـظـه لـلـبـخـارى)

অর্থাৎ রাসূল (সা.)   বলেছে: ‘যে সূরা ফাতোহা পড়ে না তার নামাজ হয় না।’

২. ইবনে আবী শাইবাহ মুসান্নাফে তাহাভী আহকামুল কুরআনে এবং আল্লামা ইবনে তাইমিয়া তার ফতোয়া গ্রন্থে মাহমূদ ইবনুর রবী‘ থেকে বর্ণনা করেছেন:

قـال : صـلـيـت صـلوة والـى جـنـبـى عـبـادة بـن الـصـامـت، قـال : فـقـرأ بفـاتـحـة الـكـتـاب، قـال : فـقـلـت لـه : يـا ابـا الـولـيـد! الـم اسـمـعـك تـقـرأ بـفـاتـحـة الـكـتـاب؟ قـال : اجـل، انـه لاصـلاة الابـهـا ـ (لـفـظـه لابـن ابـى شـيـبـة)

‘তিনি বলেন, আমি এক নামাজ পড়েছি, তখন আমার পাশে উবাদা ইবনে সামেত ছিলেন। তিনি বলেন, তখন তিনি সূরা ফাতেহা পাঠ করেছেন, তিনি বলেন, আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আবুল ওলীদ! আমি যেন আপনাকে সূরা ফাতেহা পাঠ করতে শুনতে পেলাম? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাছাড়া নামাজ হয় না। (হাদীসের শব্দাবলি ইবনে আবি শাইবার)

ফতোয়ায়ে ইবনে তাইমিয়ার বর্ণনায় خلـف الامـام (‘ইমামের পেছনে’) শব্দেরর উলে­খও রয়েছে।

৩. তিরমিযীর হাদীসটি।

এ তিনটি সূত্রের মধ্যে প্রথম সূত্রটি সর্বসম্মতিক্রমে সহীহ। কিন্তু তা দ্বারা প্রতিপক্ষের দলিল দেয়া সঠিক নয়। কারণ হানাফীগণ এর ব্যাখ্যা করেন, এ হুকুম একাকী নামাজ আদায়কারী ও ইমামের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এছাড়া অন্যান্য জবাব ও এর তফসীল সামনে আসছে।

আর দ্বিতীয় বর্ণনাসূত্রটিও সহীহ, কিন্তু এর দ্বারাও শাফেয়ী প্রমুখের মাযহাবের উপর কোনো সুস্পষ্ট মারফূ‘ দলিল প্রমাণিত হয় না। কেননা তা হযরত উবাদার নিজস্ব ইজতেহাদ। অর্থাৎ لا صـلاة لـمـن لـم يـقـرأ হাদীসটিকে তিনি ইমাম মুক্তাদী সবার জন্য ব্যাপক মনে করেছেন। তাই তা থেকে এ বিধান বের করেছেন যে, মুক্তাদীর জন্যও সূরা ফাতেহা পাঠ করা ওয়াজিব, কিন্তু তার এ ইজতিহাদ অন্যান্য মারফূ‘ হাদীসের বিপরীত দলিল হতে পারে না।

বরং এ হাদীস থেকে হানাফীগণের পক্ষে সমর্থন মিলে। কেননা এ থেকে প্রমাণিত হয়, অধিকাংশ সাাহবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীন ইমামের পেছনে ফাতেহা পাঠ না করার আমলই করতেন। যার দলিল হচ্ছে, যদি এমন না হতো তাহলে হযরত উবাদাহকে ফাতেহা পড়তে দেখে হযরত মাহমূদ ইবনে রবী‘ এতটা অবাক হতেন না এবং প্রশ্ন করতেন না। তাঁর অবাক হওয়া এবং প্রশ্ন করাটা এ কারণেই প্রমাণ যে, হযরত উবাদার এ আমলটি সাহাবা ও তাবেয়ীনের সাধারণ আমলের পরিপন্থি। এছাড়া হযরত মাহমূদ ইবনে রাবী‘ যে ফাতেহা পাঠ করেননি এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এরপরও হযরত উবাদা তাকে নামাজ পুনরায় পড়ার হুকুম দেননি। এর দ্বারা বোঝা যায়, হযরত উবাদার দৃষ্টিতেও মুক্তাদীর জন্য ফাতেহা পাঠ ওয়াজিব ছিল না।

এখন থেকে যায় শুধুমাত্র তৃতীয় সূত্রটি। অর্থাৎ তিরযিমীর আলোচ্য অধ্যায়ের হাদীসটি। এ হাদীসটি নিঃসন্দেহে শাফেয়ীগণের মাযহাবের পক্ষে সুস্পষ্ট। কিন্তু এটি সহীহ নয়। ইমাম আহমদ (র.), আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (র.), হাফেজ ইবনে আব্দুল বার (র.) ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ নিম্নোক্ত আপত্তিগুলোর ভিত্তিতে এ হাদীসকে ইল­তযুক্ত এবং গায়রে সহীহ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।

১.     মুহাদ্দিসীনে কেরামের ধারণায় কোনো বর্ণনাকারী ভুলবশত প্রথম দুই বর্ণনাকে মিলিয়ে তৃতীয় বর্ণনাটি তৈরী করেছে। এ ভুলের দায়দায়িত্ব মাকহুলের উপর ফেলা হয়। এর কারণ হচ্ছে, হযরত উবাদা ইবনে সামেতের এ হাদীসটি মাহমূদ ইবনে রবী‘-এর বহু শাগরেদ বর্ণনা করেছেন। তাদের মধ্যে কেউই ইমামের পেছনে ফাতেহা পড়ার হুকুমটি স্পষ্টভাবে হযরত মুহাম্মদ  (সা.)  -এর কথা বলে উলে­খ করেননি। এ কাজ শুধুমাত্র মাকহুলই করেছেন এবং হাদীসটিকে তৃতীয় সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

আর মাকহুল (র.) সামগ্রিক বিবেচনায় যদিও নির্ভরযোগ্য, কিন্তু মুহাদ্দিসীন ও জারহ-তাদীলের ইমামগণ তার ব্যাপারে স্পষ্ট মন্তব্য করেছেন যে, বর্ণনা করার ক্ষেত্রে কখনো তাঁর ভুল হয়ে যায়। এখানেও বাহ্যত বর্ণনা করতে গিয়ে তাঁর ভুল হয়ে গেছে এবং তিনি দু’তিনটি বর্ণনাকে একত্র করে একটি আলাদা বর্ণনা বানিয়ে ফেলেছেন। আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (র.) তার  ফতোয়ায় এর পূর্ণ বিবরণ উলে­খ করেছেন। এমনিভাবে ইমাম তিরমিযী (র.) এ হাদীসটি বর্ণনা করার পর হযরত উবাদার এ হাদীসটি ইমাম যুহরীর মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন, যার মধ্যে শুধুমাত্র لا صـلاة لـمـن لـم يـقـرأ بـفـاتـحـة الـكـتـاب শব্দ রয়েছে। এরপর তিনি বলেছেন وهـذا اصـح ‘আর এটিই সর্বাধিক সহীহ।’

২.     এ হাদীসের সনদে বড় ধরনের এখতেলাফ রয়েছে যার কারণসমূহ নিম্নরূপ:

ক.     কোনো বর্ণনাসূত্র এই: مـكـحـول عـن عـبـادة بـن الـصـامـت অর্থাৎ ‘উবাদা ইবনে সামেত থেকে মাকহুল’ ইনকেতা‘ বা বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে فـان مـكـحـول لـم يـسـمـع عـن عـبـادة بـالاتـفـاق ‘কারণ সর্বসম্মতিক্রমে মাকহুল উবাদা থেকে কোনো হাদীস শুনেনি।’

খ.    কোনো কোনো সূত্রে: عـن مـكـحـول عـن مـحـمـود بـن الـربـيـع عـن عـبـادة بـن الـصـامـت এভাবে বর্ণিত আছে। যেমন তিরমিযীর এ অধ্যায়ে রয়েছে।

গ.     একটি সূত্র এভাবে বর্ণিত হয়েছে: مـكـحـول عـن نـافـع بـن مـحـمـود عـن عـبـادة بـن الـصـامـت যেমন: আবূ দাউদে এ বর্ণনাটি আছে।

ঘ.     কোনো কোনো বর্ণনাসূত্রে এভাবে আছে: مـكـحـول عـن نـافـع بـن مـحـمـود عـن مـحـمـود بـن الـربـيـع عـن عـبـادة بـن الـصـامـت

ঙ.     আর কোনো সূত্রে مـكـحـول عـن مـحـمـود عـن ابى نـعـيـم انـه سـمـع عـبـادة بـن الـصـامـت عـن الـنبـى ﷺএভাবে আছে।

চ.     কোনো কোনো সূত্রে মাকহুল (র.) এ হাদীসটি রাজা ইবনে হাইওয়াহর মাধ্যমে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণনা করেন। মারদীনী (র.)-এর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। :মা‘আরিফুস সুনান : ৩/২০৩

ছ.     একসূত্রে মাকহুল (র.) সরাসরি আব্দুল্লাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণনা করেন। এ সূত্রটিও মারদীনী (র.) উলে­খ করেছেন। :মা‘আরিফুস সুনান: ৩/২০৩

জ.     একসূত্রে রাজা হাদীসটি মাহমূদ ইবনে রবী‘ এর মাধ্যমে উবাদার মওকূফ হাদীস হিসাবে বর্ণনা করেন। যেমন তহাভী (র.) তার আহকামে বর্ণনা করেছেন। মারদীনী এ কথা উলে­খ করেছেন। মা‘আরিফুস সুনান ৩/২০৩

সনদের ইযতেরাবের এ আটটি দিক নিয়ে চিন্তা করলে বোঝা যায়, এ হাদীসটি মারফূ‘ না মওকূফ -এ বিষয়েও ইযতেরাব রয়েছে। মুত্তাসিল না মুনকাতি‘ এ নিয়েও ইযতেরাব রয়েছে এবং এ নিয়েও ইযতেরাব রয়েছে যে, উবাদা থেকে এ হাদীসটি বর্ণনাকারী কি নাফে‘ ইবনে মাহমূদ, না মাহমূদ ইবনে রবী‘ না আবু নু‘আইম। এরপরে এ নিয়েও ইযতেরাব রয়েছে যে, এ ঘটনাটি হযরত উবাদার ঘটনা নাকি আব্দুল্লাহ ইবনে ওমরের ঘটনা। وهـل بـعـد هـذا الاضـطـراب الـشـديـد يـكـون الـحـديـث حـجـة ‘এমন জটিল ইযতেরাবের পরও কি কোনো হাদীস দলিল হওয়ার যোগ্য হতে পারে?!

৩.     এ হাদীসের মতনের মধ্যে ইযতেরাব রয়েছে, হযরত শাহ সাহেব (র.) ‘ফাসলুল কিতাব’ গ্রন্থে যা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সেখান থেকে দেখে নেয়া যেতে পারে।

৪.     মাকহুলের ব্যাপারে একথা প্রসিদ্ধ আছে যে, তিনি মুদালি­সগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আর এ হাদীসটি তিনি عـن عـن পদ্ধতিতে বর্ণনা করেছেন।

৫.     এখানে মাকহুলের শাগরেদ হচ্ছেন মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক, তার ব্যাপারে এর আগে বলা হয়েছে যে, তাঁর একাকী বর্ণনা ও عـن দিয়ে বর্ণনা সন্দেহযুক্ত।

৬.     আবূ দাউদ প্রমুখের বর্ণনায় নাফে‘ ইবনে মাহমূদ এসেছে। আর তিনি ‘মাজহুল’ এবং প্রবল ধারণা হচ্ছে, তিরমিযীর বর্ণনায়ও মাকহুল তার থেকে তাদলীস করেছেন।

এসব কারণে মুহাদ্দিসগণ এ হাদীসকে ইল­তযুক্ত মা‘লূল বলেছেন। এমনকি হাফেজ শামসুদ্দীন যাহাবী (র.) যিনি শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী এবং সনদ ও ইল­ত বিষয়ে বড় মাপের পণ্ডিত হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ‘মীযানুল ই‘তেদাল’ কিতাবে মাহমূদ ইবনে রবী‘ এর জীবনীতে স্বীকার করেছেন যে, তাঁর এ হাদীসটি ইল­তযুক্ত। তাই এ হাদীস দিয়ে দলিল দেয়া সঠিক নয়।

আর কিছুক্ষণের জন্য যদি একথা মেনেও নেয়া হয় যে, এ হাদীসটি সহীহ, এরপরও এর দ্বারা শাফেয়ীগণের দলিল দেয়া সঠিক হতে পারে না। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হযরত মাওলানা রশীদ আহমদ সাহেব গাঙ্গুহী (র.) ‘হিদায়াতুল মু‘তাদী ফী কিরাআতিল মুকতাদী’ কিতাবে লিখেছেন, দলিল দেয়ার মূল জায়গায় لا تـفـعـلـوا إلا بـام الـقـران রয়েছে।

এখানে نـهـى ‘নিষেধ’ থেকে ইস্তেসনা করা হয়েছে। আর যখন  نـهـىথেকে اسـتـشـنـاء করা হয় তখন মুস্তাসনার বৈধতা প্রমাণিত হয়, (তা দ্বারা) ওয়াজিব সাব্যস্ত হয় না।

কিন্তু এর উপর আপত্তি আসে, পরবর্তীতে لا صـلاة لمن لـم يـقـرأ بـهـا শব্দও এসেছে, যা ওয়াজিব হওয়াকে প্রমাণ করেছে। হযরত গাঙ্গুহী (র.) ‘হিদায়াতুল মু‘তাদী’তে এর জবাব দিয়েছেন, এ বাক্যটি ফাতেহা পাঠের জন্য ইল­ত নয়, বরং তা হচ্ছে সমর্থক। যার অর্থ হচ্ছে, ফাতেহা পড়তে কোনো সমস্যা নেই, কেননা এর খুব গুরুত্ব রয়েছে। আর যখন এটি অন্যদের বেলায় (অর্থাৎ ইমাম ও একাকী নামাজ আদায়কারীর জন্য) ওয়াজিব তখন মুক্তাদীর জন্য তা কমপক্ষে জায়েজ হবে।

সারকথা হচ্ছে, হযরত উবাদা ইবনে সামেতের হাদীসের শুধুমাত্র প্রথম সনদটি অর্থাৎ لا صـلـوة لـمـن لـم يـقـرأ بـفـاتـحـة الـكـتـاب এটাই সহীহ। কিন্তু এর দ্বারা ইমামের পেছনে ফাতেহা পাঠের উপর দলিল দেয়া যায় না। প্রথমত এর কারণ হচ্ছে, অন্যান্য দলিলের আলোকে এ হুকুমটি ইমাম ও একাকী নামাজ আদায়কারীর জন্য বিশিষ্ট, মুক্তাদীর জন্য এ হুকুম নয়। কেননা মুক্তাদী তার অনুসারী হয়। হানাফীগণের দলিলের আলোচনায় এর তফসীল বা বিশদ আলোচনা আসবে।

দ্বিতীয়ত বিষয়টি এমন হতে পারে যে, এ হাদীসে কেরাত দ্বারা ব্যাপক কেরাত উদ্দেশ্য হবে, চাই তা হাকীকী বা বাস্তবিক কেরাত হোক যেমন ইমাম ও একাকী ব্যক্তির কেরাত, অথবা হুকমী বা রূপকার্থে যেমন মুক্তাদীর কেরাত। যেমন হযরত মুহাম্মদ  (সা.)  -এর বাণী: مـن كـان لـه امـام فـقـراءة الامـام لـه قـراءةবা রূপকার্থে থেকে এ কথাই প্রমাণিত হয়। পরবর্তীতে সে আলোচনা আসছে।

হযরত আবূ হুরায়রা (রা.)-এর হাদীস

শাফেয়ীগণ ও অন্যান্যদের দ্বিতীয় দলিল হচ্ছে, হযরত আবূ হুরায়রা (রা.)-এর হাদীস যা সহীহ মুসলিমে রয়েছে। ইমাম তিরমিযী (র.)ও তা ‘তা‘লীক’ভাবে বর্ণনা করেছেন।

عـن الـنـبـى ﷺ انـه قـال : مـن صـلـى صـلـوة لـم يـقـرأ فـيـهـا بـام الـقـرآن فـهـى خـداج غـيـر تـمـام، فـقـال لـه حـامـل الـحـديـث، انـى اكـون احـيـانـا وراء الامـام، قـال اقـرأبـهـا فـى نـفـسـك (الـلـفـظ لـلـتـرمـذى)

‘নবী করীম  (সা.)  থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি সূরা ফাতেহা না পড়ে কোনো নামাজ আদায় করল তার সে নামাজ আদায়ে প্রসব হওয়া বাচ্চার মতো অসম্পূর্ণ। হাদীস বর্ণনাকারী তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমরাতো কখনো ইমামের পেছনে থাকি। (তখন ------?) তিনি বলেছেন, তুমি তা মনে মনে পড়।’

এর জবাব হচ্ছে, এ হাদীসের দু’টি অংশ রয়েছে। একটি মারফূ‘ অংশ যার মধ্যে শুধু এতটুকু ইরশাদ রয়েছে যে, সূরা ফাতেহা ব্যতীত নামাজ অসম্পূর্ণ। কিন্তু হানাফীগণের দৃষ্টিতে অন্যান্য দলিলের আলোকে এ হুকুমটি ইমাম ও একাকী নামাজ আদায়কারীর জন্য। আর এর দ্বিতীয় অংশটি হযরত আবূ হুরায়রার উপর মওকূফ। তিনি ইমামের পেছনে ফাতেহা পাঠের ব্যাপারে বলেছেন: اقـرأ بـهـا فـى نـفـسـك ‘তুমি তা মনে মনে পড়।’

এক্ষেত্রে প্রথম কথা হচ্ছে, একথাটি হযরত আবূ হুরায়রার নিজস্ব ইজতেহাদ যা মারফূ হাদীসসমূহের বিপরীতে দলিল নয়। দ্বিতীয়ত একথাটি এ অর্থেও হতে পারে যে, উচ্চারণ করা ব্যতীত শুধু মনে মনে তা পড়া হবে। আর কেউ কেউ এর এভাবেও ব্যাখ্যা করেছেন যে, কখনো কখনো فـى نـفـسـه বাক্যটির ব্যাবহার একাকী অবস্থার ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। সে হিসেবে اقـرأ بـهـا فـى نـفـسـك-এর অর্থ হবে اقـرأ بـهـا حـال كـونـك مـنـفـردا ‘তুমি একাকী হওয়া অবস্থায় তা পাঠ কর। আর এটি এমনই যেমন হাদীসে কুদসীতে ইরশাদ হয়েছে:

فـان ذكـرنـى فـى نـفـسـه ذكـرتـه فـى نـفـسـى، وان ذكـر فـى مـلأ ذكـرتـه فـى مـلأ خـيـر منـهـم ـ

‘সে যদি আমাকে একাকী স্মরণ করে আমি তাকে একাকী স্মরণ করি। আর যদি সে আমাকে মজলিসে স্মরণ করে তাহলে আমি তাকে তাদের চাইতে উত্তম মজলিসে স্মরণ করি।’

এখানে فـى نـفـسـه শব্দকে فـى مـلأ -এর বিপরীতে ব্যবহার করার দ্বারা প্রমাণিত হয় فـى نـفـسـه দ্বারা একাকী অবস্থা উদ্দেশ্য।

আবূ কিলাবাহ (রা.)-এর বর্ণনা

শাফেয়ীগণের একটি দলিল হচ্ছে, আবূ কিলাবাহ (রা.)-এর হাদীস:

ان رسـول الـلـه ﷺ قـال لاصـحـابـه : هـل تـقـرءون خـلـف امـامـكـم؟ فـقـال بـعـض : نـعـم، وقـال بـعـض : لا، فـقـال : ان كـنـتـم لابـد فـاعـلـيـن فـلـيـقـرأ احـدكـم فـاتـحـة الـكـتـاب فـى نـفـسـه ـ

‘রাসূলুল্লাহ  (সা.)  তার সাহাবীগণকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি তোমাদের ইমামের পেছনে তেলাওয়াত কর? কেউ বললেন, হ্যাঁ। আর কেউ বললেন, না। তখন তিনি বললেন, যদি তোমাদের কেউ একান্ত পড়তেই চায় তাহলে সে যেন মনে মনে সূরা ফাতেহা পড়ে।’

এর জবাব২ হচ্ছে, এর দ্বারা তো একথা প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ  (সা.)  ইমামের পেছনে তেলাওয়াত না করাকে উত্তম বলেছেন। তাই এ হাদীসটি শাফেয়ীগণের বিরুদ্ধে দলিল। একথার উপর যদি বলা হয়, যাই হোক এ হাদীস দ্বারা ইমামের পেছনে ফাতেহা পাঠ করা বৈধ হওয়া তো সাব্যস্ত হয়, তাই এ হাদীস হানাফীগণের মতের পরিপন্থি। এর জবাব হচ্ছে, হতে পারে এ হাদীসটি নিঃশব্দ নামাজের ব্যাপারে। আর নিঃশব্দ নামাজের ব্যাপারে হানাফীগণের গ্রহণযোগ্য মাযহাব হচ্ছে, ইমামের পেছনে ফাতেহা পাঠ করা জায়েজ।

শাফেয়ীগণ ও অন্যান্যদের আরেকটি দলিল হচ্ছে, হযরত আবূ কাতাদার বর্ণনা:

ان رسـول الـلـه ﷺ قـال : أتـقـرءون خـلـفـى/ قـالـوا : نـعـم، قـال : فـلا تـفـعـلـوا الا بـفـاتـحـة الـكـتـاب ـ

এর জবাব হচ্ছে, প্রথমত এর সনদের মধ্যে মালেক ইবনে ইয়াহইয়া বর্ণনাকারী দুর্বল। দ্বিতীয়ত অন্যান্য দলিলের আলোকে এটিও নিঃশব্দ নামাজের বেলায় প্রযোজ্য হতে পারে।

শাফেয়ী প্রমুখের পক্ষে এছাড়াও আরো দলিল রয়েছে। কিন্তু সেগুলোর কোনোটিই এমন নয় যা সহীহও আবার স্পষ্টও। অর্থাৎ প্রথমত তাদের উপস্থাপিত অধিকাংশ হাদীসই দুর্বল। আর যে বর্ণনাগুলো সহীহ আছে সেগুলোও অস্পষ্ট যা ইমামতি অবস্থা বা একাকি নামাজ পড়া অবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। সেসব দলিল ও তার জবাব সবিস্তারে লিখিত কিতাবাদিতে দেখা যেতে পারে। এখানে তা বিস্তারিত বলার সুযোগ নেই।

হানাফীগণের দলিলসমূহ

কুরআনের আয়াত : হানাফীগণের সর্বপ্রথম দলিল হচ্ছে কুরআনে কারীমের এ আয়াত:

واذا قـرئ الـقـرآن فـاسـتـمـعـوا لـه وانـصـتـوا الـعـلـكـم تـرحـمـون ـ

‘যখন কুরআন পাঠ করা হয় তখন তোমরা মনোযোগের সাথে তা শ্রবণ করবে এবং নিশ্চুপ হয়ে থাকবে যাতে তোমরা দয়াপ্রাপ্ত হও।’ :সূরা আ‘রাফ: ২০৪

কুরআন তেলাওয়ারেত সময় ধ্যানের সঙ্গে শোনা এবং চুপ থাকা ওয়াজিব হওয়ার বিষয়ে এ আয়াতের বক্তব্য একেবারে স্পষ্ট। আর সূরা ফাতেহা কুরআনের অংশ হওয়ার বিষয়টি সর্বসম্মত। তাই এর দ্বারা ইমামের পেছনে সূরা ফাতেহা পাঠ নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টিও প্রমাণিত হয়।

হানাফীগণ যে এ আয়াত দিয়ে দলিল দেন এর উপর কয়েকটি আপত্তি করা হয়েছে। যেমন একটি প্রসিদ্ধ আপত্তি হচ্ছে, এ আয়াতটি নামাজের ব্যাপারে নয়; রং জুমার খুতবার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। অর্থাৎ, ইমাম যখন খুতবা দেবে যার মধ্যে কুরআনে কারীমের আয়াতও থাকে সে সময় তোমরা চুপ থাক।

এর জবাব হচ্ছে হাফেজ ইবনে জরীর তাবারনী ও ইমাম ইবনে আবী হাতেম প্রমুখ তাঁদের তাফসীরের কিতাবে এবং ইমাম বায়হাকী (র.) তাঁর ‘কিতাবুল কিরাআহ’ তে হযরত মুজাহিদ থেকে বর্ণনা করেছেন।, হযরত মুহাম্মদ  (সা.)  -এর জামানায় কোনো সাহাবী ইমামের পেছনে তেলাওয়াত করতেন, তখন সে প্রেক্ষিতে এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছে:

واذا قـرئ الـقـرآن فـاسـتـمـعـوا لـه وانـصـتـوا ـ

এ বর্ণনাটি যদিও মুরসাল, কিন্তু এটি হযরত মুজাহিদের মুরসাল যাকে اعـلـم الـنـاس بـالـتـفـسـيـر ‘তাফসীর বিষয়ে শ্রেষ্ঠ’ বলা হয়েছে। ইনি ইমামুল মুফাসসিরীন হযরত ইবনে আব্বাসের বিশেষ শাগরেদ এবং তাফসীরের ক্ষেত্রে তার উঁচু মাকাম এর দ্বারাও বোঝা যায় যে, হাফেজ আবু নু‘আইম তার ‘হিলয়াতুল আউলিয়া’ গ্রন্থে তাঁর থেকে উদ্ধৃত করেছেন, আমি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমরের কাছে বসতাম তাঁর খেদমত করার জন্য এবং তাঁর কাছ থেকে ইলম হাসেল করার জন্য। কিন্তু তিনি আমাদেরকে খেদমত করার সুযোগ না দিয়ে নিজেই আমার খেদমত করতেন। কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, হযরত ইবনে ওমর মুজাহিদের রেকাব ধরে হাঁটতেন। এ কারণেই তাফসীর বিষয়ক বর্ণনায় তাঁর মুরসাল দলিল হওয়ার যোগ্য।

এছাড়া ইবনে জারীর প্রমুখ ইয়াসীর ইবনে জাবের থেকে বর্ণনা করেছেন:

قـال : صـلـى ابـن مـسـعـود سـمـع نـاسـا يـقـرءون مـع الامـام فـلـمـا انـصـرف قـال : امـا آن لـكـم ان تـفـقـهـوا؟ امـا آن لـكـم ان تـعـقـلـوا؟ واذا قـرئ الـقـرآن فـاسـتـمـعـوا لـه وانـصـتـوا كـمـا امـركـم الـلـه - اخـرجـه الـطـبـرى ـ

‘ইবনে মাসউদ নামাজ পড়েছেন। তখন কিছু লোককে ইমামের সঙ্গে তেলাওয়াত করতে শুনেছেন। যখন নামাজ শেষ করলেন, তখন তিনি বললেন তোমাদের কি এখনো বুঝার সময় হয়নি? তোমাদের কি এখনো واذا قـرئ الـقـرآن فـاسـتـمـعـوا لـه وانـصـتـوا আয়াতটি অনুধাবন করার সময় হয়নি যেভাবে আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে আদেশ করেছেন? (তবারী)

এ বর্ণনা থেকে একথা স্পষ্ট যে, হযরত ইবনে মাসঊদের মতো ফকীহ সাহাবীও কুরআনের এ আয়াতকে নামাজের সম্পর্কে মনে করতেন। তাই বাস্তব এটাই যে, এ অয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ নামাজই, খুতবা নয়। আর জুমা এর শানে নুযূল হয় কীভাবে যখন এ আয়অতটি হচ্ছে মক্কী, আর জুমা শুরু হয়েছে মদীনায়। এছাড়া আয়াতে কুরআন তিলাওয়ারেত কথা বলা হয়েছে। আর খুতবার মধ্যে সম্পূর্ণ তিলাওয়াত হয় না। এরই বিপরীত নামাজ তিলাওয়াত, কেননা সেখানে সম্পূর্ণটাই  কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত হয়। তাই নামাজ হচ্ছে এ আয়াতের مـدلـول مـطـابـقـى বা যথাযথ প্রয়োগ-স্থান আর খুতবা  বেশির থেকে বেশি এ আয়াতের সর্বোচ্চ مـدلـول تـضـمـنـى বা সম্বাব্য প্রয়োগ-স্থান হতে পারে।

এর জবাবে শাফেয়ীগণের পক্ষ থেকে বলা হয়, খোদ হযরত মুজাহিদ থেকেই অপর এক বর্ণনায় রয়েছে এ আয়াত জুমার খুতবার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে।

এর জবাব হচ্ছে, আল্লামা সুয়ূতী (র.) ‘আল-ইতকান’কিতাবে এবং হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ ‘আল ফাউযুল কাবীর’ -এ বিষয়টি খুব স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীন কখনো কখনো কোনো আয়াতের সম্পর্কে ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে نـزلـت فـى كـذ অথবা نـزلـت الآيـة فـى كـذا এ জাতীয় শব্দাবলি ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু এর দ্বারা ঐ ঘটনা ঐ আয়াতের শানে নুযূল হওয়া উদ্দেশ্য হয় না। বরং তার দ্বারা উদ্দেশ্য হয় যে, ঘটনাটি এ আয়াতের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত।

এখানেও ব্যাপারটি তাই ঘটেছে। হযরত মুজাহিদের কথা ‘এ আয়াতটি জুমার খুতবার ব্যাপারে’ এটিও নিঃসন্দেহে এ ধরনেরই একটি কথা। অর্থাৎ এখানে তাঁর এ কথাটি শানে নুযূল বর্ণনা করার জন্য নয়। কেননা জুমার খুতবাকে যদি শানে নুযূল বলা হয় তাহলে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ, ইতঃপূর্বে বলা হয়েছে যে, আয়াতটি মক্কী এবং খোদ মুজাহিদই নামাজকে এর শানে নুযূল বলেছেন। তাই হযরত মুজাহিদের উভয় বর্ণনাকে মিলালে ফলাফল দাঁড়ায়, আয়াতের শানে নুযূল নামাজই, তবে তার ব্যাপকতার মধ্যে খুতবাও অন্তর্ভুক্ত। অতএব যে নামাজ এ আয়াতের আসল শানে নুযূল তাকে এ আয়াতের মর্ম থেকে কীভাবে বের করে দেয়া যেতে পারে?

এ সম্পর্কে আল্লামা ইবনে তাইমিয়া তার ফাতাওয়া গ্রন্থে লিখেছেন, এ আয়াতের ব্যাপারে যৌক্তিক তিনটি সম্ভাবনা রয়েছে, একটি হচ্ছে শুধু নামাজের ব্যাপারে হওয়া। এ হিসেবে আমাদের দাবি প্রমাণিত। একটি হচ্ছে, নামাজ ও খুতবা উভয়ের ব্যাপারে হবে। এ হিসেবেও আমাদের দাবি সাব্যস্ত হয়ে যায়। আরেকটি হচ্ছে, শুধুমাত্র জুমার খুতবার ব্যাপারে হবে এবং নামাজের ব্যাপারে হবে না। কেবলমাত্র এক্ষেত্রে আমাদের দাবি পুরোপুরি সাব্যস্ত হবে না।

কিন্তু এ সম্ভাবনাটি প্রত্যাখ্যাত। কেননা আয়াতটি মক্কী। আর খোদ শাফেয়ীগণও এর পক্ষে নয়। কেননা তারা নিজেই ইমামের পেছনে তেলাওয়াত না করার পক্ষে এ আয়াত দিয়ে দলিল দিয়ে থাকেন (তাঁর কথা শেষ)। যারফলে খোদ শাফেয়ীগণের মধ্যে আল্লামা সুয়ূতী একথা স্বীকার করেছেন যে, এ বিষয়ে সকল মুসলমান একমত যে, এ আয়াতের উদ্দেশ্যের মাঝে নামাজ অন্তর্ভুক্ত আছে।

উলে­খিত আয়াতের ভিত্তিতে হানাফীগণের যে দলিল তার উপর শাফেয়ীগণের দ্বিতীয় আপত্তি হচ্ছে, এর মধ্যে ধ্যানের সঙ্গে শোনার হুকুম দেয়া হয়েছে। যা সশব্দ নামাজের হতে পারে কিন্তু নিঃশব্দ নামাজে তা সম্ভব নয়।

এর জবাব হচ্ছে, হানাফীগণের মধ্য থেকে যারা নিঃশব্দ নামাজে তেলাওয়াত করাকে জায়েজ বলেন, তাদের মতের উপর এ আপত্তির কোনো প্রভাব নেই। তবে যারা নিঃশব্দ নামাজেও তেলাওয়াত না করার কথা বলেন, তারা বলেন, এ আয়াতে দু’টি হুকুম দেয়া হয়েছে। একটি হচ্ছে ধ্যানের সাথে শোনা, আরেকটি হচ্ছে চুপ থাকা। শোনার হুকুমটি হচ্ছে সশব্দ নামাজের বেলায়, আর চুপ থাকার হুকুমটি হচ্ছে নিঃশব্দ নামাজের বেলায়।

হানাফীগণের হাদীস থেকে দলিল উপস্থাপন

হযরত আবূ মূসা আশ‘আরী (রা.) ও হযরত আবূ হুরায়রা (রা.)-এর হাদীস

হানাফীগণের দ্বিতীয় দলিল হচ্ছে সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হযরত আবূ মূসা আশ‘আরী (রা.) -এর দীর্ঘ হাদীস। সে হাদীসে তিনি বলেন:

ان رسـول الـلـه ﷺ خـطـبـنـا فـبـيـن لـنـا سـنـتنـا وعـلـمـنـا صـلاتـنـا، فـقـال : اذا صـلـيـتـم فـاقـيـمـوا صـفـوفـكـم ثـم لـيـؤمـكـم احـدكـم، فـاذا كـبـر فـكـبـروا واذا قـرأ فـانـصـتـوا، واذا قـال : غـيـر الـمـغـضـوب عـلـيـهـم ولا الـضـالـيـن فـقـولـوا امـيـن الـخ ـ

‘রাসূলুল্লাহ  (সা.)  আমাদেরকে লক্ষ্য করে বক্তব্য দিয়েছেন, আমাদের জন্য জীবন চলার পদ্ধতি তুলে ধরেছেন এবং আমাদেরকে নামাজ শিখিয়েছেন। শিখাতে গিয়ে বলেছেন, তোমার যখন নামাজ পড়বে তখন কাতারগুলোকে সোজা করে নিবে। এরপর তোমাদের মধ্য থেকে একজন যেন ইমামতি করে। অতঃপর সে যখন তাকবীর বলবে তোমরাও তখন তাকবীর বলবে, আর সে যখন তেলাওয়াত করবে তোমরা তখন চুপ থাকবে। আর ইমাম যখন غـيـر الـمـغـضـوب عـلـيـهـم ولا الـضـالـيـن বলবে তখন তোমরা ‘আমীন’ বলবে।

এরকমভাবে হযরত আবূ হুরায়রার বর্ণনায় واذا قـرأ فـانـصـتـوا শব্দ এসেছে। পূর্ণ হাদীসটি নিম্নরূপ:

عـن ابـى هـريـرة قـال : قـال رسـول الـلـه ﷺ : انـمـا جـعـل الامـام يـؤتـم بـه، فـاذا كـبـر فـكـبـروا واذا قـرأ فـانـصـتـوا، واذا قـال سـمـع الـلـه لـمـن حـمـده فقـولـوا : الـلـهـم ربـنـا لـك الـحـمـد ـ

‘আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ  (সা.)  বলেছেন, ইমাম বানানো হয়েছে তার অনুসরণ করার জন্য। অতএব সে যখন তাকবীর বলবে তোমরাও তখন তাকবীর বল এবং সে যখন তেলাওয়াত করবে তখন তোমরা চুপ থাক, আর সে যখন سـمـع الـلـه لـمـن حـمـده বলবে তখন তোমরা الـلـهـم ربـنـالـك الـحـمـد বল।

এ দুটি হাদীসেই ইমামের তেলাওয়াতের সময় মুতলাকভাবে চুপ থাকার হুকুম দেয়া হয়েছে। যা ফাতেহা পাঠ ও অন্য সূরা পাঠ উভয় ক্ষেত্রে সমান বরাবর। এর মাঝে কোনো ধরনের পার্থক্য করা সঠিক নয়। কেননা হযরত মুহাম্মদ  (সা.)  এখানে একটি একটি আমলের পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন। ফাতেহা পাঠ ও অন্য সূরা পাঠের হুকুমের মধ্যে যদি কোনো প্রকার পার্থক্য থাকত তাহলে তিনি অবশ্যই তা উলে­খ করতেন। অথচ তার অর্থাৎ (পার্থক্যের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উলে­খ করার) পরিবর্তে তিনি শুধুমাত্র বলেছেন: اذا قـرأ যার স্পষ্ট দাবি হচ্ছে, ইমাম যখন তেলাওয়াত করবে মুক্তাদী তখন চুপ থাকবে।

শাফেয়ীগণ প্রমুখের পক্ষ থেকে এখানে আপত্তি উত্থাপন করা হয়: واذا قـرأ فـانـصـتـوا অতিরিক্ত অংশটুকু সহীহ নয়। কেননা এ হাদীসটিই হযরত আনাস (রা.) হযরত আয়েশা (রা.) থেকেও বর্ণিত আছে। তবে তাদের কেউই واذا قـرأ فـانـصـتـوا অংশটি উলে­খ করেন না। এমনকি আবূ মূসা আশ‘আরী (রা.)-এর বর্ণনায় সুলায়মান তাইমী কাতাদা থেকে এটি একাকী বর্ণনা করেন। তাই এ বর্ণনা দিয়ে দলিল দেয়া সঠিক নয়।

এর জবাব হচ্ছে, এ অতিরিক্ত অংশটি নিঃসন্দেহে সহীহ এবং খোদ ইমাম মুসলিম (র.) স্পষ্ট শব্দে এ হাদীসকে সহীহ সাব্যস্ত করেছেন এবং পুরা সহীহ মুসলিমে এ একটিমাত্র হাদীস যাকে ইমাম মুসলিম (র.) স্পষ্টভাবে সহীহ বলেছেন। ব্যাপারটি এভাবে হয়েছে যে, ইমাম মুসলিম যখন তাঁর ‘সহীহ’ কিতাবটি লিখতে গিয়ে আশ‘আরী (রা.)-এর এ হাদীস পর্যন্ত পৌঁছলেন যে হাদীসে واذا قـرأ فـانـصـتـوا অতিরিক্ত অংশটুকু সুলায়মান তাইমীর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে: তখন ইমাম মুসলিমের এক শাগরেদ আবূ বকর ইবনে উখতে আবীন নাযার এ হাদীসের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে প্রশ্ন করেছেন। তখন ইমাম মুসলিম জবাব দিয়েছেন: تـريـد احـفـظ مـن سـلـيـمـان ‘তুমি কি সুলায়মানের চাইতে বেশি স্মরণশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি চাও?’

আর হযরত আনাস (রা.) ও হযরত আয়েশা (রা.) -এর বর্ণনার ব্যাপারে বলা যায় সেগুলোতে যদিও واذا قـرأ فـانـصـتـوا শব্দটি নেই,  কিন্তু এটাও অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। কেননা হাদীসের ভাণ্ডারে এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যা একজন‘ সাহাবী একটি অতিরিক্ত অংশ উলে­খ করেছেন, কিন্তু অপর সাহাবী তা উলে­খ করেননি। আর এ ধরনের ক্ষেত্রের জন্যই زيـادة الـثـقـة مـقـبـولـة ‘নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর অতিরিক্ত বর্ণনা গ্রহণযোগ্য’: নীতিটি তৈরী হয়েছে।

কাতদা থেকে واذا قـرأ فـانـصـتـوا অতিরিক্ত অংশটি শুধুমাত্র সুলায়মান তাইমী একা বর্ণনা করেছেন বলে যে কথা বলা হয়েছে, সে সম্পর্কে বলা যায়, তিনি সর্বসম্মতিক্রমে ‘ছেকাহ’ নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী। আর زيـادة الـثـقـة مـقـبـولـة এ মূলনীতির আলোকে তাঁর একাকী বর্ণনা করাটা কোনো সমস্যার বিষয় নয়, ক্ষতিকারক ও নয়। তাছাড়া হযরত আবূ মূসা আশ‘আরীর হাদীসে এ অতিরিক্ত অংশটুকু বর্ণনা করার ক্ষেত্রে সুলায়মান তাইমী একাকীও নন; বরং ওমর ইবনে আমের, সাঈদ ইবনে আবী আরূবা ও আবূ উবায়দা (রা.) কাতাদা থেকে সুলায়মান তাইমীর মতো অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।

এ বিষয়ে হযরত শাহ সাহেব (র.) এক দারুন বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। যার সারমর্ম হচ্ছে, انـمـا جـعـل الامـام لـيـؤتـم بـه হাদীসটি চারজন সাহাবী থেকে বর্ণিত আছে। হযরত আবূ হুরায়রা, হযরত আবূ মূসা আশআরী, হযরত আনাস ও হযরত আয়েশা (রা.)। তাঁদের মধ্য থেকে হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) ও হযরত আবূ মূসা (রা.)-এর হাদীসে واذا قـرأ فـانـصـتـوا অতিরিক্ত অংশটি আছে। আর হযরত আনাস (রা.) ও হযরত আয়েশা (রা.) -এর হাদীসে এ অতিরিক্ত অংশটুকু নেই।

হাদীসে যাচাই বাছাই ও তা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করলে এর কারণ হিসেবে ধরা পড়ে হযরত মুহাম্মদ  (সা.)  এ হাদীসটি দুইবার ইরশাদ করেছেন। একবার واذا قـرأ فـانـصـتـوا তার অন্তর্ভুক্ত ছিল, আরেকবার তা অন্তর্ভুক্ত ছিল না। প্রথমবার তিনি হাদীসটি বলেছিলেন, ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়ার ঘটনার সময় যখন তিনি বসে নামাজ পড়িয়েছেন। সাহাবায়ে কেরাম তখন তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে শুরু করেছিল। তখন তিনি তাদেরকে বসে নামাজ পড়তে ইঙ্গিত করেছেন এবং নামাজের পর এ হাদীসটি বলেছেন এবং শেষে বলেছেন واذا صـل‍ى جـالـسـا فـصـلـوا جـلـوسـا যেমন আয়েশার  বর্ণনায় রয়েছে। আর হযরত আনাসের বর্ণনায় এসেছে واذا صـلـى قـاعـدا فـصـلـوا قـعـودا اجـمـعـون

এ সময় হযরত মুহাম্মদ (সা.)  -এর যেহেতু আসল উদ্দেশ্য ছিল এ মাসআলা বর্ণনা করা যে, ইমাম যখন বসে নামাজ পড়বে তখন মুক্তাদীদের জন্য বসে নামাজ পড়া চাই। এ কারণে তিনি এক্ষেত্রে নামাজের সবগুলো রুকন নিয়ে আলোচনা করেননি। তবে অন্তর্ভুক্তির ভিত্তিতে অন্যান্য কিছু রুকনের আলোচনাও এসে গেছে। মোটকথা এখানে যেহেতু সবগুলো রুকন নিয়ে আলোচনা করা উদ্দেশ্য ছিল না তাই তিনি এক্ষেত্রে واذا قـرأ فـانـصـتـوا অংশটি বলেননি। আর এ ঘটনার সময় যেহেতু হযরত আনাস (রা.) ও হযরত আয়েশা (রা.) উভয়ে উপস্থিত ছিলেন তাই তাঁরা উভয়ে انـمـا جـعـل الامـام لـيـوتـم بـه হাদীসটিতে واذا قـرأ فـانـصـتـوا এ অতিরিক্ত অংশ ব্যতীত বর্ণনা করেছেন।

এ ঘটনার সময় হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা.) ও হযরত আবূ হোরায়রা (রা.) মদীনা তাইয়েবায় ছিলেন না। কেননা হাফেজ ইবনে হাজার (র.)-এর বক্তব্য অনুসারে ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়ায় ঘটনাটি ঘটেছে পঞ্চম হিজরী সনে। এখনও পর্যন্ত হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হননি। কেননা তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন সপ্তম হিজরী সনে। এরকমভাবে হযরত আবূ মূসা আশ‘আরী ও তখন হাবশায় ছিলেন এবং তিনিও সপ্তম হিজরী সনে হাবশা থেকে ফিরে এসেছেন। যার দ্বারা প্রমাণিত হয় ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়ার ঘটনার সময় হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) ও হযরত আবূ মূসা আশ‘আরী (রা.) দুজনের একজনও উপস্থিত ছিলেন না।

এর দ্বারা একথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এ হযরতগণ যে হাদীসটি বর্ণনা করেন তা ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়ার ঘটনার অনেক পড়ে অর্থাৎ সপ্তম হিজরীসন অথবা তারও পরে বলা হয়েছে। আর তখন যেহেতু এ হাদীস দ্বারা শুধুমাত্র বসে নামাজ পড়ার বিধান বর্ণনা করা উদ্দেশ্য ছিল না, বরং এ মৌলিক নীতিটি বর্ণনা করা উদ্দেশ্য ছিল যে, মুক্তাদীর জন্য ইমামের অনুসরণ করা চাই, সে কারণে সকল রুকনের ক্ষেত্রে কীভাবে অনুসরণ করবে এক্ষেত্রে তিনি সে পদ্ধতিটি বর্ণনা করে দিয়েছেন এবং বলতে গিয়ে واذا قـرأ فـانـصـتـوا অতিরিক্ত অংশটুকুও বলেছেন।

সুতরাং হযরত আনাস ও হযরত আয়েশা (রা.) -এর ঘটনা সম্পূর্ণ আলাদা এবং তার বিষয়বস্তুও আলাদা ও ভিন্ন ভিন্ন। আর হযরত আবু হুরায়রা ও হযরত আবূ মূসা আশ‘আরী (রা.) হাদীসে বিষয়বস্তু ও ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর প্রথম ঘটনায় واذا قـرأ فـانـصـتـوا না থাকার দ্বারা একথাও জরুরী নয় যে, হযরত আবূ মূসা ও হযরত আবূ হুরায়রার হাদীসে এ অতিরিক্ত অংশটি দুর্বল হবে।


হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) হাদীস

হানাফীগণের তৃতীয় দলিল হচ্ছে পরবর্তী  অধ্যায়ে উলে­খিত হযরত আবূ হুরায়রা (রা.)-এর হাদীস:

ان رسـول الـلـه ﷺ انـصـرف مـن صـلاة جـهـر فـيـهـا بـالـقـراءة، فـقـال : هـل قـرأ مـعـى احـد مـنـكـم أنـفـا؟ فـقـال رجـل : نـعـم يـا رسـول الـلـه : قـال : انـى اقـول مـالـى انـازع الـقـرآن، قـال : فـانـتـهـى الـنـاس عـن الـقـراءة مـع رسـول الـلـه ﷺ فـيـمـا يـجـهـر فـيـه رسـول الـلـه ﷺ مـن الـصـلـوات بـالـقـراءة حـيـن سـمـعـوا ذلـك مـن رسول الـلـه ﷺ ـ

‘রাসূলুল্লাহ  (সা.)  সশব্দ কেরাতবিশিষ্ট এক নামাজ থেকে সালাম ফিরিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের কেউ কি একটু আগে আমার সঙ্গে কুরআন পাঠ করেছে? এক ব্যক্তি বলল, জি হ্যাঁ ইয়া রাসূলুল্লাহ! তখন তিনি বললেন, তাইতো বলি, ব্যাপার কী আমার সাথে কুরআন নিয়ে ঝগড়া করা হচ্ছে। বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলের একথা শোনার পর থেকে রাসূলুল্লাহ  (সা.)  যেসব নামাজে সশব্দে তেলাওয়াত করেন সেসব নামাজে সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ  (সা.)  -এর সঙ্গে তেলাওয়াত করা থেকে বিরত থাকেন।

এ হাদীসটি হানাফী মাযহাবের পক্ষে স্পষ্ট হওয়ার পাশাপাশি এ বিষয়টিকেও স্পষ্ট করে দিচ্ছেন যে, ইমামের পেছনে তিলাওয়াত করাকে কুরআন নিয়ে ঝগড়া-ঝাটি করা সাব্যস্ত করার পর থেকে সাহাবায়ে কেরাম ইমামের পেছনে কুরআন পাঠ ছেড়ে দিয়েছিলেন।  এ হাদীসের এ ব্যাখ্যাও করা যাবে না যে, এখানে ইমামের পেছনে অন্য সূরা পাঠ করতে নিষেধ করা হয়েছে, সূরা ফাতেহা পড়তে নিষেধ করা হয়নি। কেননা হযরত মুহাম্মদ  (সা.)  এখানে নিষেধের কারণও বর্ণনা করে দিয়েছেন। আর তা হচ্ছে কুরআন নিয়ে ঝগড়া-ঝাটি করা। আর এ কারণটি যেমনিভাবে অন্যান্য সূরা পাঠের ক্ষেত্রে পাওয়া যায় তেমনিভাবে সূরা ফাতেহা পাঠের ক্ষেত্রেও পাওয়া যায়। অতএব উভয়ের হুকুম একই।

শাফেয়ীগণের পক্ষ থেকে এ হাদীসের উপর প্রথম আপত্তি করা হয় যে এ হাদীসের বর্ণনা ইবনে উকাইমা আল-লায়ছীর উপর নির্ভরশীল। আর মিনি মাজহুল-অপরিচিত। তাই এ বর্ণনাটি দলিল হওয়ায় যোগ্য নয়।

এর জবাব হচ্ছে, ইবনে উকাইমা লায়ছী একজন নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী। অনেক মুহাদ্দিস তাঁকে ‘সিকা’ নির্ভরযোগ্য বলে দাবি করেছেন। আর মূলনীতি হচ্ছে, কোনো বর্ণনাকারীকে মুহাদ্দিসগণ নির্ভরযোগ্য বললে তাকে আর মাজহুল বলা যায় না। ইবনে উকাইমা মাজহুল না হওয়া এবং নির্ভরযোগ্য সাব্যস্ত হওয়ার জন্য এর চাইতে বড় দলিল আর কি হতে পারে যে, ইমাম মালক (র.) মুয়াত্তায় তাঁর এ হাদীস উলে­খ করেছেন। আর উম্মত এ বিষয়ে একমত যে, মুয়াত্তার সবগুলো বর্ণনাই সহীহ।

এ হাদীসের উপর শাফেয়ীগণ দ্বিতীয় আপত্তি করেছেন। এ হাদীসে فـانـتـهـى الـنـاس عـن الـقـراءة مـع رسـول الـلـه ﷺ এ অতিরিক্ত অংশটুকু ইমাম যুহরীর (ادراج) বাড়ানো।

এর জবাব হচ্ছে, প্রথমত যদি মেনে নেয়া হয় যে একথাটি ইমাম যুহরীর নিজস্ব কথা তখন এটাই স্বাভাবিক যে, ইমাম যুহরী সাহাবায়ে কেরামের আমল দেখেই একথা বলেছেন। দ্বিতীয়ত বাস্তব ঘটনা হচ্ছে, এটি ইমাম যুহরীর (ادراج) বাড়ানো নয়; বরং এটি হযরত আবূ হুরায়রার কথা। যেমন সুনানে আবূ দাউদে ইবনুস সারহ-এর বর্ণনায় একথা স্পষ্টভাবে উলে­খিত হয়েছে যে: وقال ابـن السرح فى حـديـثـه قـال معـمـر عن الزهـرى قـال ابـو هريرة : فـانـتهى الـنـاس

‘ইবনুস সারহ তাঁর বর্ণনায় বলেছেন, মা‘মার যুহরী থেকে বর্ণনা করে বলেছেন যে, আবূ হুরায়রা (রা.) বলেছেন, অতঃপর মানুষ তা থেকে বিরত হয়ে গেছে।’

এ বাক্যটি যুহরীর পক্ষ থেকে বৃদ্ধি হওয়ার ব্যাপারে কিছু মানুষের মনে যে ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়েছে এর মূল কারণ ও সুনানে আবূ দাউদ থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়। যেমন আবূ দাঊদ (র.) একটু অগ্রসর হয়ে বর্ণনা করেন:

قـال سـفـيـان وتـكـلـم الـزهـرى بـكـلـمـة لـم اسـمـعـهـا فـقـال مـعـمـر : انـه قـال : فـانـتـهـى الـنـاس ـ

যার অর্থ হচ্ছে, হযরত সুফিয়ান বলেন, ইমাম যুহরী যখন তাঁর পাঠদানের মজলিসে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন তখন مـالـى انازع الـقـرآن)-এর পরের) বাক্যটি আমি শুনতে পাইনি। তখন আমি আমার সহপাঠী মা‘মারকে জিজ্ঞেস করলাম, উস্তাদ কী বলেছেন? সে প্রেক্ষিতে মা‘মার বলেছেন: انـه قـال فـانـتهـى الـنـاس মা‘মার যেহেতু একথাটিকে ইমাম যুহরীর দিকে নিসবত করেছেন: তাঁর সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন, সে কারণে কিছু লোক বুঝে নিয়েছেন যে, একথাটি ইমাম যুহরীর নিজস্ব কথা। অথচ বাস্তবিকভাবে তা আবূ হুরায়রা (রা.) -এরই কথা।

তৃতীয়ত উত্তর হচ্ছে, হানাফীগণের দলিল উপস্থাপন করাটা জন্য فـانـتهـى الـنـاس عـن الـقـراءة অংশটির উপর নির্ভর করে না। কারণ তাদের দলিল مـال‍ى انـازع الـقـرآن দ্বারাই পরিপূর্ণ হয়ে যায়।

এ হাদীসের উপর ইমাম তিরমিযী (র.) তৃতীয় একটি আপত্তি উত্থাপন করেছেন। আপত্তি হচ্ছে, খোদ হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি ইমামের পেছনে ফাতেহা পাঠের ব্যাপারে বলেছেন اقـرأ بـهـا فـى نـفـسـك

কিন্তু এর বিস্তারিত জবাব পেছনে দেওয়া হয়েছে, আর শাফেয়ীগণের মূলনীতি হিসেবে ইমাম তিরমিযীর এ আপত্তিটি কোনোভাবেই সঠিক হয় না। কেননা শাফেয়ীগণের মূলনীতি হচ্ছে الـعـبـرة روى لا بـمـا رأى অর্থাৎ বর্ণনাকারীর ফতোয়া যদি তার বর্ণনার বিপরীত হয় তাহলে শাফেয়ীগণ বর্ণনার উপর আমল করেন, তাঁর ফতোয়াকে ছেড়ে দেন।

হযরত জাবের (রা.)-এর হাদীস

হানাফীগণের চতুর্থ দলিল হচ্ছে, হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.)-এর হাদীস:

قـال قـال رسـول الـلـه ﷺ : مـن كـان لـه امـام فـقـراءة الامـام لـه قـراءة ـ

‘রাসূলুল্লাহ  (সা.)  বলেছেন, যার ইমাম থাকবে তার ইমামের কেরাতই তার কেরাত।’

এ হাদীসটি সহীহ ও এবং হানাফী মতের পক্ষে স্পষ্টও। কেননা এর মাঝে একটি মূলনীতি বলে দেয়া হয়েছে যে, ইমামে কেরাত মুক্তাদীর জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। তাই তার জন্য কেরাতের প্রয়োজন থাকে না। এরপর এ হাদীসের মধ্যে সব ধরনের কেরাতের হুকুম বর্ণনা করা হয়েছে। সূরা ফাতেহা পাঠ ও অন্যসূরা পাঠ সবটাকেই অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাই উভয় কেরাতের ক্ষেত্রে ইমামের কেরাতকে মুক্তাদীর কেরাত মনে করা হবে। যার ফলে মুক্তাদী তেলাওয়াত না করার দ্বারা সে لا صلاة لمن لم يقـرأ بفاتحة الكتاب-এর আওতায় পড়বেনা। হানাফীগণের এ দলিলের উপর কয়েকটি আপত্তি করা হয়েছে।

১.     প্রথম আপত্তি হচ্ছে, হাফজে হাদীসগণ এ হাদীসকে জাবেরের মওকূফ হাদীস হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। আরো বলেছেন, কোনো শক্তিশালী নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি এ হাদীসটিকে মারফূ‘ হিসেবে বর্ণনা করেননি।

এর জবাব হচ্ছে, ইমাম আবূ হানীফা, সুফিয়ান ছাওরী ও শরীক প্রমুখ রাহিমাহুমুল্লাহ এ হাদীসটি মারফূ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাই এ আপত্তিটি গ্রহণযোগ্য নয়।

২.     দ্বিতীয় আপত্তি করা হয়, এ হাদীসটি আব্দুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ ইবনে হাদ: জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ সূত্রে বর্ণিত।  আর জাবের (রা.) থেকে আব্দুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ হাদীস শুনেছেন বলে সাব্যস্ত নেই।

এর জবাব হচ্ছে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ ইবনে হাদ হচ্ছেন সাহাবী। যেমন হাফেজ ইবনে হাজার (র.) ‘আল ইসাবাহ’ গ্রন্থ লিখেছেন لـه رؤيـة ‘তিনি রাসূলকে দেখেছেন।’ তাই তিনি হযরত জাবেরের সমকালীন। যদিও তিনি কম বয়সী সাহাবীগণের একজন এ হিসেবে এ হাদীসটি সহীহ মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ। আর যদি মেনেও নেয়া হয় যে, হযরত জাবের থেকে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদের হাদীস  শ্রবণ করাটা প্রমাণিত নেই, তবু এ হাদীস বেশির থেকে বেশি একজন সাহাবীর মুরসাল হাদীস হতে পারে। আর সাহাবীর মুরসাল সর্বসম্মতিক্রমে হুজ্জত দলিল।

৩.     তৃতীয় আপত্তি করা হয়, সুনানে দারাকুতনী ইত্যাদিতে হাদীসটি عبـد الـلـه بـن شـداد عـن ابـى الـولـيـد عـن جـابـر بـن عـبـد الـلـه সূত্রে বর্ণিত আছে। এর দ্বারা বোঝা যায়, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ (রা.) এ হাদীসটি সরাসরি হযরত জাবের (রা.) থেকে শুনেনি। বরং মাঝে আবুল ওলীদের মাধ্যম রয়েছে। আর আবুল ওলীদ মাজহুল।

এর জবাব হচ্ছে, আবুল ওলীদ খোদ আব্দুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদেরই উপনাম। বর্ণনাটি মূলত ছিল এর কম:

عـن عـبد الـلـه بـن شـداد بـن الـهـاد ابـى الـولـيـد عـن جـابـر ـ

কোন লিপিকার লিখতে গিয়ে ভুলে ابـو الـولـيـد-এর আগে عـن শব্দটি বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই বাস্তব সত্য এটাই যে আব্দুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ ও হযরত জাবেরের মাঝে কোনো মাধ্যম নেই।

৪.     চতুর্থ আপত্তি উত্থাপন করা হয়। এ হাদীসটি নির্ভর করছে আবূ হানীফা (র.), হাসান ইবনে উমারাহ (রা.) ’লাইছ ইবনে আবী সুলাইম (র.) ও জাবের জু‘ফী (র.)- এর উপর। আর এঁরা সবাই দুর্বল।

এর জবাব হচ্ছে, আবূ হানীফাকে যে দুর্বল বলা হয়েছে-এ আপত্তির দুর্বলতার ব্যাপারে কথা বলাটা নিষ্প্রয়োজন। এর জবাব তফসীলের সাথে ভূমিকায় উলে­খ করা হয়েছে, যার সারমর্ম হচ্ছে, ইমাম আবূ হানীফার সমালোচনা খোদ সমালোচনাকারীকেই ক্ষতবিক্ষত করে। আর হাসান ইবনে উমারার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। তবে সহীহ কথা হচ্ছে, তাঁর হাদীস ও ‘হাসান’ স্তর থেকে নিচে নয়।

লাইছ ইবনে আবী সুলাইমের অবস্থা হলো যে, তার ব্যাপারেও মতভেদ রয়েছে। আল্লামা হাইছ (র.) ‘মাজমাউয যাওয়ায়েদ’ কিতাবে কয়েক জায়গায় তাকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন এবং বলেছেন ثـقـة مـدلـس  এমনিভাবে ইমাম তিরমিযীও بـاب الـتـمـتـع  এ তার একটি হাদীসকে হাসান বলেছেন। তাই তাঁর হাদীস হাসানের চাইতে নিচে নয়।

আর জাবের জু‘ফী নিঃসন্দেহে যয়ীফ। খোদ ইমাম আবূ হানীফা তাকে যয়ীফ বলেছেন। কিন্তু হাদীসটি তার উপর নির্ভরশীল নয়। বরং আমাদের কাছে আছে তো এ হাদীসের এখন অনেক সনদ রয়েছে যেসব সনদে না জাবের জু‘ফীর মাধ্যম আর না উলে­খিত দুর্বল বর্ণনাকারীদের মধ্য থেকে কেউ আছে। এমনকি সেসব সূত্রে অবূ হানীফাও নেই। নিচে কয়েকটি সূত্র প্রদত্ত হলো:

১.     প্রথম সূত্রটি মুসান্নাফে ইবেন আবী শাইবায় বর্ণিত রয়েছে:

حـدثـنـا مـالـك بـن اسـمـاعـيـل عـن حـسـن بـن صـالـح عـن ابـى الـزبـيـر عـن جـابـر رضـى الـلـه عـنـه عـن الـنـبـى ﷺ قـال : كـل من كـان لـه امـام فـقـراءتـه لـه قـراءة ـ

এর উপর এ আপত্তি করা হয় যে, হাসান ইবনে সালেহ আবুস যুবায়ের থেকে শুনেছেন বলে প্রমানিত নেই।

এর জবাব হচ্ছে, হাসান ইবনে সালেহের জন্ম ১০০ হিজরীতে হয়েছে। আর আবুয যুবায়েরের মৃত্যু হয়েছে ১২৮ হিজরীতে। তাই তাঁরা দু’জন খেসাময়িক হলেন, ইমাম মুসলিমের দৃষ্টিতে যা হাদীস সহীহ হওয়ার জন্য যথেষ্ট।

২.     এ হাদীসের দ্বিতীয় সনদটি মুসনাদে আবদ ইবনে হুমায়েদের নিম্নোক্ত সূত্রে বর্ণিত হয়েছে:

حـدثـنـا ابـو نـعـيـم حـدثـنـا الـحـسـن بـن صـالـح عـن ابـى الـزبـيـر عـن جـابـر عـن الـنـبـى ﷺ ....... الـخ ـ

আল্লামা আলূসী (র.) এটিকে মুসলিমের শর্ত অনুসারে সহীহ বলেছেন।

৩.     মুসনাদে  আহমদ ইবনে মানী‘-এ হাদীসটি নিম্নোক্ত সূত্রে বর্ণিত হয়েছে:

اخـبـرنـا اسـحـاق الازرق حـدثـنـا سـفـيـان وشـريـك عـن مـوسـى بـن ابـى عـائـشـة عـن عـبـد الـلـه بـن شـدادا  عـن جـابـر قـال : قـال رسـول الـلـه ﷺ الـخ ـ

এ সনদটি হচ্ছে একটি সোনানী পরমারা এবং বুখারী মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহীহ। কেননা ইসহাক আল আমরাক সহীহ বুখারী মুসলিমের বর্ণনাকারী। সুফিয়ান ছাওরীর পরিচয় দেয়ার প্রয়োজন নেই। শরীক মুসলিমের একজন বর্ণনাকারী। আর মূসা ইবনে আবী আয়েশা সিহাহ সিত্তার প্রসিদ্ধ নির্ভরযোগ্য (ثـقـة) বর্ণনাকারী।

৪.     মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাকে হাদীসটি নিম্নোক্ত সূত্রে বর্ণিত হয়েছে:

عـبـد الـرزاق عـن الـثـورى عـن مـوسـى بـن ابـى عـائـشـة عـن عـبـد الـلـه بـن شـداد بـن الـهـاد الـلـيـثـى قـال : الـنـبـى ﷺ الـظـهـر والـعـصـر، فـجـعـل رجـل يـقـرأ خـلـف الـنـبـى ﷺ، ورجـل يـنـهـى، فـلـمـا صـلـى قـال : يـا رسـول الـلـه! كـنـت اقـرأ وكـان هـذا يـنـهـانـى، فـقـال لـه رسـول الـلـه ﷺ : مـن كـان لـه امـام فـان قـراءة الامـام لـه قـراءة ـ

‘আব্দুর রাযযাক ছাওরী মূসা ইবনে আবী আয়েশা- আব্দুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ ইবনুল হাদ আল-লাইহী বলেন। নবী করীম  (সা.)  যোহর অথবা আসরের নামাজ আদায় করেছেন। তখন এক ব্যক্তি নবী   (সা.)  -এর পেছনে তেলাওয়াত করতে লাগল। আর আরেকজন তাকে বাধা দিতে লাগল। অতঃপর যখন নবী  (সা.)  নামাজ শেষ করলেন তখন লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি তেলাওয়াত করছিলাম, আর এ লোক আমাকে বাধা দিচ্ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ  (সা.)  তাকে বললেন, যার মিম রয়েছে তার জন্য ইমামের তেলাওয়াতই তার তেলাওয়াত হিসেবে ধর্তব্য হবে।’ এ বর্ণনা থেকে একথাও জানা যায় যে, এ বিধানটি সশব্দ ও নিঃশব্দ উভয় প্রকারের নামাজের জন্য ব্যাপক হুকুম।

এসবগুলো সনদ পুরোপুরি সহীহ এবং এগুলোর কোনোটিতেই জাবের জু‘ফী, হাসান ইবনে উমারা ও লাইছ ইবনে আবী সুলাইম এমনকি আবূ হানীফার মাধ্যমও নেই।

এছাড়া আমরা বলে এসেছি, আবূ হানীফার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই। বরং তাঁর সমালোচনা খোদ সমালোচনাকারীর ব্যক্তিত্বকে নষ্ট করে দেয়। তাই তাঁর বর্ণনার উপরও সন্দেহ করা যায় না। আর আবূ হানীফা (র.) জাবের (রা.)-এর হাদীসটি জাবের জু‘ফী ও তার মতো অন্যান্য দুর্বল বর্ণনাকারীদের মাধ্যম ছাড়াই বর্ণনা করেছেন।

এরপর স্বয়ং হযরত জাবেরের একটি বক্তব্যের ভিত্তিতে তাঁর বর্ণনাকৃত হাদীসটি সমর্থিত হয়। যেমন ইমাম তিরমিযী (র.) বলেন:

حـدثـنـا اسـحـاق بـن مـوسـى بـن الانـصـارى حـدثـنـا مـعـن حـدثـنـا مـالـك عـن ابـى نـعـيـم وهـب بـن كـيـسـان انـه سـمـع جـابـر بـن عـبـد الـلـه  يـقـول : مـن صـلـى ركـعـة لـم يـقـرأ فـيـهـا بـأم الـقـرآن فـلـم يـصـل الا أن يـكـون وراء الامـام ـ هـذا حـديـث حـسـن صـحـيـح ـ

‘ইসহাক ইবনে মূসা ...জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ বলেছেন, যে সূরা ফাতেহা পড়া ব্যতীত এক রাক‘আত নামাজ পড়ল সে যেন নামাজ পড়েনি। তবে যদি সে ইমামের পেছনে থাকে। এ হাদীসটি ‘হাসান’, ‘সহীহ’।

এরপর খতীব বাগদাদীর ‘তারীখে বাগদাদ’ কিতাবে এ হাদীসের একটি ‘শাহেদ’ অধমের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। তিনি মুহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে যুমালাহ আল-মারওয়াযীর আলোচনায় ইবনে ওমর (রা.) থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। হাদীসের সনদ নিম্নরূপ:

اخـبـرن ابـو الـقـاسـم الازهـرى، نـا عـلـى بـن عـمـر الـخـتـلى  نـا ابـو جـعـفـر مـحـمـد بـن احـمـد بـن مـحـمـد فـضـالـة الـمـروزى نـا احـمـد بـن عـلـى بـن سـلـمـان الـمـروزى نـا مـحـمـد بـن عـبـدة نـا خـارجـة عـن ايـوب عـن نـافـع عـن ابـن عـمـر قـال : قال رسـول الـلـه ﷺ : مـن كـان لـه امـام ...... الـخ.

এ হাদীসের সনদে খারেজা পর্যন্ত সকল বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য, তবে এর নিচের বর্ণনাকারীদের অবস্থার বিশ্লেষণ দেখা অধমের দ্বারা সম্ভব হয়নি। তবে মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদে হযরত ইবনে ওমরের এ আছারটি বর্ণিত আছে مـن صـلـى خـلـف الامـام كـفـتـه قـراءتـه ‘যে ইমামের পেছনে নামাজ পড়বে সে ইমামের তেলাওয়াতই তার জন্য যথেষ্ট হবে। এর দ্বারা বোঝা যায়, ইবনে ওমরের উলে­খিত হাদীসটি ভিত্তিহীন নয় এবং হযরত জাবেরের হাদীসের জন্য এটিকে ‘শাহেদ’ হিসেবে তুলে ধরা যায়।

মোটকথা হচ্ছে, হযরত জাবেরের হাদীস নিঃসন্দেহে সহীহ ও প্রমাণিত। তার উপর আরোপিত সকল আপত্তি প্রত্যাখ্যাত ও অসার। বিভিন্ন সনদ এবং মুতাবি’ওশাহেদ থাকা সত্তে¡ও এ হাদীসকে যয়ীফ-দুর্বল বলা অথবা দলিলের জন্য অযোগ্য সাব্যস্ত করা ইনসাফ থেকে বহু দূরে। والـلـه الـمـوفـق لـلـصـواب

হানাফীদের অভিমত ও সাহাবায়ে কেরামের আছার

যেকোনো বিতর্কিত বিরোধপূর্ণ মাসআলার ক্ষেত্রে এ ভিত্তিতেও ফয়সালা হয় যে, সাহাবায়ে কেরাম রেযয়ানুল্লাহি আলাইহিম আজমাইন-এর মাযহাব ও  আমল কেমন? এদিক থেকে যদি দেখা হয় তাহলেও হানাফীগণের পাল্লা ভারি দেখা যায় এবং তাদের সমর্থনে সাহাবায়ে কেরামের অসংখ্য আছার পাওয়া যায়।

আল্লামা আইনী (র.) উমদাতুল কারীতে লিখেছেন ইমামের পেছনে তেলাওয়াত না করার অভিমতটি প্রায় আশিজন সাহাবায়ে কেরাম থেকে প্রকাশিত আছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন সাহাবী এ বিষয়ে খুব কঠোর ছিলেন। অর্থাৎ চার খলীফা (রা.), হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.), হযরত সা‘দ ইবনে আবী ওয়াফফাস (রা.) হযরত যায়েদ ইবনে ছাবেত (রা.), হযরত জাবের (রা.), হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) ও হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) প্রমুখ রিযওয়ানুল্লাহি আলাইহিম আজমাইন।

এ অধ্যায়ে আমরা যা বলতে চেয়েছি তার আলোচনা এখানেই শেষ। এর আরো দীর্ঘ বিস্তারিত আলোচনা যথাস্থানে রয়েছে। তালেবে ইলমদের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ।


কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.