পরিচ্ছেদ: উট, চতুষ্পদ জন্তু এবং বকরীর প্রস্রাব এবং সেগুলোর আস্তানা (থাকার স্থান)-এর বর্ণনা। হযরত আবু মূসা আশ‘আরী (রা.) ডাকঘরে/ডাকবাংলায় নামায আদায় করেছেন, যেখানে গোবর ছিল। অথচ তার নিকটেই (পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন) মাঠ ছিল। তারপর তিনি বললেন, ইহা এবং উহা উভয়টিই সমান।
حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ حَرْبٍ، قَالَ حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ زَيْدٍ، عَنْ أَيُّوبَ، عَنْ أَبِي قِلاَبَةَ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ قَدِمَ أُنَاسٌ مِنْ عُكْلٍ أَوْ عُرَيْنَةَ، فَاجْتَوَوُا الْمَدِينَةَ، فَأَمَرَهُمُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم بِلِقَاحٍ، وَأَنْ يَشْرَبُوا مِنْ أَبْوَالِهَا وَأَلْبَانِهَا، فَانْطَلَقُوا، فَلَمَّا صَحُّوا قَتَلُوا رَاعِيَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَاسْتَاقُوا النَّعَمَ، فَجَاءَ الْخَبَرُ فِي أَوَّلِ النَّهَارِ، فَبَعَثَ فِي آثَارِهِمْ، فَلَمَّا ارْتَفَعَ النَّهَارُ جِيءَ بِهِمْ، فَأَمَرَ فَقَطَعَ أَيْدِيَهُمْ وَأَرْجُلَهُمْ، وَسُمِرَتْ أَعْيُنُهُمْ، وَأُلْقُوا فِي الْحَرَّةِ يَسْتَسْقُونَ فَلاَ يُسْقَوْنَ
অনুবাদ: হযরত আনাস (রা.) বলেন, উকল বা উরাইনা গোত্রের কিছু লোক মদিনায় এলো। (কিন্তু মদিনার আবহাওয়া তাদের উপযোগী ছিল না।) নবী (সা.) তাদেরকে বায়তুল মালের দুগ্ধবতী উটের কাছে গিয়ে তাদের প্রস্রাব ও দুধ পান করতে আদেশ দিলেন। তারা তা করলো এবং সুস্থ হবার পর আল্লাহর নবী (সা.)-এর রাখালকে হত্যা করে উটগুলো তাড়িয়ে নিয়ে গেল। এই খবর প্রথম ভাগে তাঁর কাছে পৌঁছলে তিনি তাদের পিছনে লোক পাঠালেন। দুপুরের সময় তাদের ধরে আনা হলো। তারপর তিনি তাদের হাত-পা কাটার আদেশ দিলেন। তাদের চোখে গরম শলাকা ঢুকিয়ে দেয়ার পর উত্তপ্ত মাটিতে ফেলে রাখা হলো। তারা পানি পানি করে চিৎকার করতে থাকলো। কিন্তু তাদেরকে পানি দেয়া হলো না। আবু কিলাবা বলেন, তারা চুরি করেছিল, হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল এবং ঈমান আনার পর কুফরী করেছিল। পরিশেষে তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল।
যোগসূত্র: পিছনের বাবসমূহে প্রস্রাব, রক্ত, বীর্য ইত্যাদির আলোচনা ছিল, এখন এ বাবে পশুর প্রস্রাবের হুকুম বর্ণনা করছেন।
শব্দ-বিশ্লেষণ:
مرابض : শব্দটি مَرْبِض-এর বহুবচন। এমন স্থান যেখানে বকরী রাখা হয়। বকরীর আস্তানা; বকরীর ঘর। যেমনিভাবে উটের থাকার জায়গাকে معاطن বলা হয়।
دار البريد : এর অর্থ হলো ডাকচৌকি বা ডাকবাংলা। এ ডাকবাংলাটি ছিল কূফা শহরের এক প্রান্তে রাস্তার পার্শে। তাই সরকারী অফিসারগণ এখানে অবস্থান করতেন। আবু মূসা (রা.) হযরত ওমর ও উসমান (রা.)-এর শাসনকাল পর্যন্ত কূফার গভর্নর ছিলেন। بريد দূতকেও বলা হয়, আবার বারো মাইলের দূরত্বকেও বলা হয়। (কুস্তুল্লানী) যেমন ইমাম মালেক ও আহমদ (র.) থেকে কসরের নামাযের দূরত্ব চার বারীদ বর্ণিত হয়েছে। এ হিসেবে চার বারীদে ৪৮ মাইল হয়।
سرقين : শব্দটি ফারসি থেকে আরবিকৃত। মূলত سرجين ছিল। অর্থ চতুষ্পদ জন্তুর মল, গোবর, লেদা।
اجـتـووا : এ সীগাহটি الاجـتـواء মাসদার হতে নির্গত। অর্থ হলো "جـواء" জাওয়া রোগে আক্রান্ত হওয়া। জাওয়া হলো এক জাতীয় পেটের পীড়া। এ পীড়া হলে পেট ফুলে যায় এবং পানির পিপাসা অতিরিক্ত বেড়ে যায়। এ রোগকে সাধারণত اسـتـسـقـاء রোগ বলা হয়। কেউ কেউ বলেছেন, اجـتـووا শব্দের অর্থ হলো, আবহাওয়া অনুক‚ল না হওয়া। অতএব, বাক্যটির অর্থ হবে- তারা মদিনার আবহাওয়াকে নিজেদের স্বাস্থ্যের অনুক‚লে পেল না। এ দ্বিতীয় অর্থটি অধিক প্রাধান্যযোগ্য। কারণ কোনো কোনো রেওয়ায়েতে اجـتـووا শব্দের পরিবর্তে اسـتـوخـمـوا الـمـدينة শব্দ এসেছে। আর اسـتـيـخـام শব্দটি দ্বিতীয় অর্থের জন্য নির্দিষ্ট অর্থাৎ اسـتـيـخـام -এর একক অর্থ হলো: আবহাওয়া অনুক‚ল না হওয়া।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ
ইমাম বুখারী যদিও স্পষ্ট করেননি যে, হালাল প্রাণীর প্রস্রাব-পায়খানা পাক কি নাপাক? কিন্তু বাবের অধীনে হযরত আবু মূসা আ শআরীর যে আমল ও দুটি হাদীস তিনি এনেছেন তাতে এটা প্রতীয়মান হয় যে, ইমাম বুখারীর মতে হালাল প্রাণীর প্রস্রাব পায়খানা পবিত্র। অর্থাৎ তিনি মালেকীদের সমর্থন করছেন।
হালাল জীবের প্রস্রাব পাক না নাপাক?
১. ইমাম আবূ হানীফা, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আবূ ইউসুফ তথা জুমহূরের মাযহাব হলো সকল প্রকার প্রাণীর নাপাক। উক্ত প্রাণী ماكول اللحم হোক বা غير ماكول اللحم হোক।
২. ইমাম মালেক, ইমাম মুহাম্মদ, ইমাম যুফার ও এক বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম আহমদেরও মাযহাব হলো, হালাল জীবের পেশাব পাক। এটাই হলো ইমাম বুখারীর মত; বরং তার ও ইমাম মালেকের মতে হালাল প্রাণীর পায়খানাও পাক।
ইমাম বুখারীর দলীল:
১. ইমাম বুখারী সর্বপ্রথম তার মতের সমর্থনে হযরত আবু মুসা আশআরী (রা)-এর আমলকে দলীল হিসেবে পেশ করছেন যে, তিনি ডাকবাংলায় নামায আদায় করেছেন, যেখানে গোবর ছিল। অথচ আবু মুসা আশআরী প্রস্রাবের ব্যাপারে এত কঠোর যে, সাথে বোতল রাখতেন এবং তাতে প্রস্রাব করতেন যেন, প্রস্রাবের ছিটা এসে কাপড় বা শরীরে না লাগে। বুঝা গেল যে, তার মতে হালাল প্রাণীর মলমূত্র পবিত্র। এটা তো সম্ভব নয় যে, সেটাকে অপবিত্র মনে করে সেখানে নামায আদায় করবেন।
এটা তখন হবে যখন والسرقِين শব্দকে যের দিয়ে পড়া হবে। অর্থাৎ ইবারত হবে: في دار البريد و السرقين কিন্তু এ অবস্থায় গোবরকে পবিত্র প্রমাণ করা কঠিন হবে। কারণ, তখন অর্থ হবে صلي ابو موسي في ا لسرقين الخ আর এটা স্পষ্ট বিষয় যে, ظرفيت-এর মধ্যে ব্যাপকতা রয়েছে। হতে পারে গোবর নিকটে ছিল, আর তাকেই في السرقين দ্বারা আখ্যা দেয়া হয়েছে। অথবা চাটাই বা কোনো কাপড় ইত্যাদি বিছিয়ে নামায পড়েছেন। فاذا جاء الاحتمال بطل الاستدلال
স্পষ্ট ও শক্তিশালী কথা হলো في البريد و السرقين শুধুমাত্র কাছাকাছি অবস্থান হিসেবে বলে দেয়া হয়েছে। সরাসরি গোবরের উপর নামায পড়া উদ্দেশ্য নয়। একজন পরিচ্ছন্ন স্বভাবের লোক কি করে এটা পছন্দ করতে পাওে যে, পরিচ্ছন্ন জায়গা থাকা অবস্থায় একেবারে গোবরের উপর নামায পড়বেন।
আর ওমদাতুল কারী প্রভৃতির কেরাত অনুযায়ী السرْقِينُ কে যদি পেশযোগে পড়া হয় তখন ইবারত হবে والسرقينُ و البريةُ الي جنبه অর্থাৎ তিনি নামায পড়েছেন এমতাবস্থায় যে, তার পার্শ্বে গোবর ও পরিষ্কার জায়গা ছিল।
২. তিনি তার মতের সমর্থনে আলোচ্য হাদীসের উপরিউক্ত বাক্য فَأَمَرَهُمُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم بِلِقَاحٍ، وَأَنْ يَشْرَبُوا مِنْ أَبْوَالِهَا وَأَلْبَانِهَا দলিল হিসেবে পেশ করে থাকেন। তিনি বলেন উটের পেশাব পাক না হলে রাসূল (সা.) তাদেরকে তা পান করার আদেশ করতেন না। বুঝা গেল উট হলো হালাল প্রাণী, যার প্রস্রাব পবিত্র।
উত্তর:
১. তাদের দলীলের উত্তর হলো এটা স্বাভাবিক অবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না; কারণ فامرهم النبي-র পূর্বে কি আছে তাও তো দেখতে হবে। এর পূর্বে আছে: فاجتوا المدينة তারা মদিনায় এসে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। সুতরাং বুঝা গেল যে, হুযুর (সা.) তাদেরকে প্রয়োজবশত ঔষধ হিসেবে প্রস্রাব পানের অনুমতি দিয়েছেন। সুতরাং এটা দলীল হতে পারেনা যে, প্রয়োজন না থাকলেও তখন পান করা জায়েয।
২. আল্লামা আইনী (র.) বলেন রাসূল (সা.) -কে ওহীর মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, উটের পেশাব পান করা ব্যতীত তাদের জীবন রক্ষা হবে না। এ কারণে তারা مضطر বা অপারগের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর নাপাক বস্তু ব্যবহার করা বা পান করা মুযতারের পক্ষে জায়েজ। আজও যদি কোনো অভিজ্ঞ ডাক্তার এ প্রেসক্রিপশন করে যে, এ নাপাক বস্তু ব্যতীত এ রোগ ভালো হবে না, তাহলে তা দ্বারা চিকিৎসা করা জায়েয হবে। সুতরাং এর দ্বারা দলীল দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়।
৩. কেউ বলেছেন- এ হাদীসটি মানসূখ তথা রহিত হয়ে গেছে। নাসেখ বা রহিতকারী হাদীসটি হলো হযরত আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত: اسـتـنزهـوا مـن الـبـول -এর হাদীস।
مثلة সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তরের জন্য দেখুন কিতাবুল মাগাযী পৃ. ২৫৬
পবিত্র প্রবক্তাদের তৃতীয় দলীল: তাঁদের দ্বিতীয় আরেকটি দলিল হলো, এ বাবের দ্বিতীয় হাদীস। এ হাদীসে আছে ‘নবী করীম (সা.) মসজিদ নির্মিত হওয়ার পূর্বে ছাগলের খোয়াড়ে নামায পড়তেন’ দলিলটি তাঁরা এভাবে উপস্থাপন করেন যে, ছাগলের খোয়াড়ে ছাগলের পেশাব ও বিষ্ঠা অধিক হারে থাকে। এমতাবস্থায় সেগুলো যদি নাপাক হতো, তাহলে রাসূল (সা.) সেখানে নামায পড়তেন না বা পড়ার অনুমতি দিতেন না। এ দলিলের ভিত্তিতে তাঁরা বলেন, হালাল জীবের পেশাব ও পায়খানা উভয়ই পবিত্র। তা নাহলে নামায কিভাবে সহীহ হতো?
উত্তর:
বকরীর ঘরে নামায পড়ার অনুমতি দ্বারা তার মল-মূত্র পবিত্র হওয়াকে আবশ্যক করে না। যদি তাই হতো তাহলে উটের ঘরে নামায পড়া থেকে বিরত থাকার কথাও একই হাদীসে রয়েছে। সুতরাং যদি বকরীর ঘরে নামাযের অনুমতি সম্পর্কিত হাদীস তার মলমূত্রের পবিত্রতা কামনা করে তাহলো উটের ঘরে নামায পড়ার নিষিদ্ধের হাদীস দ্বারা উটের মলমূত্র নাপাক হওয়াকে আবশ্যক করবে। অথচ এ ধরনের পার্থক্যের প্রবক্তা কেউ নন।
এর দ্বারা বুঝা গেল যে, বকরীর ঘরে নামায পড়ার অনুমতি এবং উটের ঘরে নামায পড়া থেকে নিষেধ করার কারণ পবিত্রতা এবং অপবিত্রতা নয়; বরং মুল কারণ হলো: বকরী সাধারণতঃ সরল প্রকৃতির ও অক্ষতিকর হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে উট কখনো কখনো হিংস্র প্রাণীর ন্যায় ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। যা নামাযীর ধ্যান বিনষ্ট হওয়াকে আবশ্যক করে।
আল্লামা আইনী বকরীর ঘরে নামায পড়া এবং উটের নামায পড়তে নিষেধের কারণ সম্পর্কে কয়েকটি হাদীস এনেছেন, যা দ্বারা এ পার্থক্যের কারণ স্পষ্ট হয়ে যায়:
১. এক হাদীসে আছে নবী করীম (সা.) বলেছেন বকরী জান্নাতের পশুদের অন্তর্ভুক্ত। তাই তোমরা তাদের শ্লেষ্মা পরিষ্কার করে দিও এবং তাদের ঘরকে পরিচ্ছন্ন রেখ এবং তাতে নামায পড়।
২. বাযযাযের এক হাদীসে আছে احسنوا اليها واميطوا عنها الاذي বকরীর সাথে সদাচরণ কর, এবং তাদের আশপাশ থেকে ময়লা-আবর্জনা দূর করে দাও।
৩. আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফফালের হাদীসে আছে : صلوا في مرابض الغنم الخ তোমরা বকরীর ঘরে নামায পড়, আর উটের ঘরে নামায পড়োনা, কারণ তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে শয়তান থেকে।
৪. এক হাদীসের শব্দ হলো: اذا ادركتم الصلوة وانتم في مراح الغنم فصلوا فيها فانها سكينة وبركة واذا ادركتم الصلوة وانتم في اعطان الابل فاخرجوا منها فانها جن خلقت من الجن الا تري اذا انفرت كيف تشمغ بانفها
৫. মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদে হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর হাদীসে আছে: احسن الي غنمك واطب مُراحها وصل في ناحيتها فانه من دواب الجنة ‘তোমরা বকরীর সাথে সদাচরণ কর, তার থাকার স্থানকে পরিষ্কার রাখ এবং তার প্রান্তে নামায পড়। কারণ তা জান্নাতের পশুদের অন্তর্ভুক্ত।’
এ হাদীস দ্বারা পুরাপুরি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বকরীর ঘরে নামায পড়ার উদ্দেশ্য এই নয় যে, তার প্রস্রাব-পায়খানা যেখানে পড়ে সেখানে নামায পড়; বরং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন প্রান্তে নামায পড়তে বলা হয়েছে।
কোন মন্তব্য নেই