পরিচ্ছেদ: অযুর ফযীলত এবং ঐ সকল লোকদের বর্ণনা যারা (কিয়ামতের দিন) অযুর চিহ্ন দ্বারা শুভ্র ললাট ও শুভ্র হাত-পাবিশিষ্ট হবেন। (অর্থাৎ অযুর অঙ্গগুলি ঝলমল করতে থাকবে)
পূর্বের সাথে যোগসূত্র ও বাবের উদ্দেশ্য: পূর্বের পরিচ্ছেদে আলোচনা হয়েছিল যে, অযু ব্যতীত নামায বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হবে না। আর এ পরিচ্ছেদে ঐ অযুর আলোচনা করা হয়েছে, যার দ্বারা গ্রহণযোগ্যতা অর্জিত হবে।
তাছাড়া অযুর বরকতে কিয়ামতের দিন এ উম্মতের বিশেষ মর্যাদা এবং নূর অর্জিত হবে।
অনুবাদ: নু’আইম মুজমির বর্ণনা করেন, আমি একবার হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর সাথে মসজিদে নববীর ছাদে উঠলাম। তিনি অযু করলেন এবং বললেন, আমি আমি আল্লাহর রাসূল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, আমার উম্মতকে কিয়ামতের দিন তাদের অযুর চিহ্নর জন্য ‘গুররাম মুহাজ্জালীন' বলে আহŸান করা হবে। সুতরাং তোমাদের যার যার পক্ষে সম্ভব হয় সে নিজের জ্যোতি বিস্তৃত করুক।
হাদীসের সামঞ্জস্য: শিরোনামের সাথে হাদীসের সামঞ্জস্য স্পষ্ট। হাদীসের প্রথম অংশ (فضل الوضوء)-এর সাথে হাদীসের মর্মার্থের সাথে। আর দ্বিতীয় অংশের সাথে হাদীসের স্পষ্ট শব্দ غرا محجلين-এর সাথে।
হাদীসের পুনরাবৃত্তি: হাদীসটি বুখারী শরীফে এখানে ২৫ ও লিবাস ৮৮০ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে।
শব্দ-বিশ্লেষণ
المُجْمِرْ : শব্দটি اجمار (বাবে افعال) থেকে ইসমে ফায়িলের সীগাহ। এটিই প্রসিদ্ধ। আবার কারো মতে শব্দটি المُجَمِّر এটি التَّجْمِير (বাবে تفعيل) থেকে ইসমে ফায়িলের সীগাহ। যার অর্থ সুগন্ধি-ধুনি দেওয়া। নুআইম ও তার পিতা আব্দুল্লাহ উভয়েরই এটি উপাধি। কারণ, তারা উভয়েই মসজিদে নববীতে সুগন্ধি ধুনি দিতেন। স্বয়ং তিনি বলেন: جالست ابا هريرة عشرين سنة وعاش الي قريب سنة عشرين ومئة (سير اعلام النبلاء)
غُرًّا : শব্দটি أغَرّ-এর বহুবচন। অর্থাৎ শুভ্র-লালাটবিশিষ্ট। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো নূর। হাফিজ আসকালানী বলেন: واصل الغرة لمعة بيضاء تكون في جبهة الفرس ثم استعملت في الشهرة وطيب الذكر অর্থাৎ غُرَّة-এর মূল অর্থ হল ঘোড়ার ললাটের শুভ্রতা। পরবর্তিতে সুশ্রী, প্রসিদ্ধি, সুখ্যাতি ইত্যাদি অর্থে এর ব্যবহার হতে থাকে।
المُحَجَّلِين : শব্দটি مُحَجَّل-এর বহুবচন, تحجيل থেকে ইসমে মাফউলের সীগাহ। যার অর্থ হলো ঘোড়ার পায়ের শুভ্রতা ছিল। কিন্তু যেহেতু মুসলমানের অযুর অঙ্গগুলিও অযুর বরকতে কিয়ামতের দিন চমকাতে থাকবে, তাই তাদেরকে এ নামে ডাকা হবে।
المسجد : এর الف لام টি عهدي ; উদ্দেশ্য হলো মসজিদে নববী।
امتي : উম্মত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো উম্মতে ইজাবত, অর্থাৎ মুসলমান।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ
বুখারীর অধিকাংশ কপিতে الغر المحجلون অর্থাৎ রফা’র সাথে বর্ণিত আছে।
اطالة الغرة- তথা শুভ্রতা দীর্ঘ করা মস্তাহাব: হানাফী ও শাফেয়ীর সংখ্যাগরিষ্ঠ ওলামায়ে কেরামের মতে অযুতে অঙ্গগুলি নির্দিষ্ট পরিমাণের অধিক ধৌত করা মুস্তাহাব। দুররে মুখতারে রয়েছে: ومِنْ الآدَاب اِطَالَةُ غُرَّتِه و تَحْجِيله অর্থাৎ অযুতে ধৌত করার অঙ্গগুলি নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে অধিক পরিমাণ ধৌত করা মুস্তাহাব। আল্লামা শামী (র.) বলেন: وفي البحر واطالة الغرة تكون بالزيادة علي الحد المحدود وفي الحلية والتحجيل يكون في اليدين والرجلين وهل له حد لم اقف فيه علي شيئ لاصحابنا অর্থাৎ اطالة الغرة হলো নির্দিষ্ট সীমার অধিক চেহারা ধৌত করা, আর تحجيل হলো হাত ও পায়ের নির্দিষ্ট পরিমাণের অধিক ধৌত করা, তবে হানাফী মাযহাবে এর কোনো সীমা আছে বলে আমার জানা নেই।
কিন্তু আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (র.) বলেন:
ثم في الفقه ان اطالة التحجيل الي نصف الساق و نصف الساعد
অর্থাৎ হাত ধৌত করার ক্ষেত্রে اطالة (তথা শুভ্রতা দীর্ঘ করার পরিমাণ) হলো বাহুর অর্ধেক এবং পা ধৌত করার ক্ষেত্রে اطالة হলো পায়ের গোছার অর্ধেক পর্যন্ত ধৌত করা।
ইমাম নবভী (র.) বলেন:
واما تطويل التحجيل فهو غسل ما فوق المرفقين والكعبين الخ অর্থাৎ হাত ধৌত করার ক্ষেত্রে কনুই-এর অতিরিক্ত এবং পা ধৌত করার ক্ষেত্রে টাখনুর অতিরিক্ত ধৌত করা মুস্তাহাব হওয়ার বিষয়ে আমাদের (শাফেয়ীদের) মাঝে কোনো মতপার্থক্য নেই। তবে মুস্তাহাবের পরিমাণ নির্ধারণের ব্যাপারে কয়েকটি মতামত রয়েছে। এক. এর কোনো সীমারেখা নেই। দুই. বাহু এবং পায়ের গোছার অর্ধেক পর্যন্ত। তিন. কাঁধ এবং হাটু পর্যন্ত। (মুসলিম: ১/১২৬)
মালেকী মাযহাবের অনুসারীগণ اطالة الغرة-কে অস্বীকার করেন, তারা বলেন এটা কোনো কিছু নয়। আর হাম্বলীগণের মাযহাবও মালেকীদের মতই অনুভূত হচ্ছে।
اطالة الغرة-এর সমর্থকদের দলীল: প্রথম দলীল হলো বাবের হাদীস। এ হাদীসে বিষয়টি স্পষ্ট আছে, বরং এর প্রতি উদ্ধ করা হয়েছে। দ্বিতীয় দলীল হলো: মুসলিম শরীফের একটি মারফূ’ হাদীস:
ثم غسل يده اليمني حتي اشرع في العضد ثم يده اليسري حتي اشرع في العضد ثم مسح برأسه ثم غسل رجله اليمني حتي اشرع في الساق ثم غسل رجله اليسري حتي اشرع في الساق ثم قال هكذا رأيتُ رسول الله (ص) يتوضَّأ
এ হাদীস দ্বারা জানা গেল যে, নবী করীম (সা.)ও হাত ধৌত করার ক্ষেত্রে বাহু এবং পা ধৌত করার ক্ষেত্রে পায়ের গোছাকে অন্তর্ভূক্ত করেছেন। আর ইহাই হলো اطالة تحجيل
প্রশ্ন: অযু এ উম্মতেরই বৈশিষ্ট্য নয়; বরং পূর্ববর্তী উম্মতেরও অযু ছিল। যেমন বুখারী শরীফেই জুরাইজ রাহিব সম্পর্কে রয়েছে: فتوضأ وصلي ; তেমনিভাবে হযরত সারা (রা.) সম্পর্কে রয়েছে যে, তিনি অযু করে নামায আদায় করেছেন। তদ্রƒপ তিরমিযী শরীফে আছে: هذا وضوئي ووضوء الانبياء من قبلي
উত্তর: বনি ইসরাইলের উপর দুই ওয়াক্ত নামায ফরজ ছিল, সুতরাং অযুও দুইবার ছিল। আর আমাদেও উপর নাজাম পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ, তাই আমাদেও উপর অযুও পাঁচবার ফরজ। বুঝা গেল আমাদের অযু বেশি। যার কারণে কিয়্মাতের দিন অযুর বিশেষ চিহ্ন এ উম্মতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। ذلك فضل الله يؤتيه من يشاء
কোন মন্তব্য নেই