শিরোনামের সাথে হাদীসের সামঞ্জস্যতা
নির্ণয় করা সম্পকে মুহাদ্দিসীনে কেরামের বিভিন্ন উক্তি রয়েছে:
১. কারো কারো মতে এ হাদীসটি শিরোনামের
সাথে সামঞ্জপূর্ণ নয়,
কারণ
শিরোনাম হলো অহীর সূচনা সম্পর্কে। আর এ হাদীসে না সূচনার কথা আছে, না অহীর কথা আছে।
শুধুমাত্র বরকতের জন্যে শুরুতে হাদীসটি আনা হয়েছে।
২. কেউ কেউ বলেন শুরুতে হাদীসটি
এনে এ কথা বুঝানো উদ্দেশ্য যে, আমি এ কিতাবটি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে লিখেছি, (এটা শুধুমাত্র تحديث نعمت হিসেবে) পাশাপাশি পাঠক, পাঠদানকারীকে এ বিষয়ে সতর্ক করাও উদ্দেশ্য যে তারাও যেন
স্ব-স্ব নিয়ত একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে
করে নেয়। কিন্তু এটা সঠিক নয়, কারণ ইমাম বুখারীর উদ্দেশ্য যদি এটা হতো তাহলে তিনি মিশকাত গ্রন্থকারের
ন্যায় শিরোনামের পূর্বে উল্লেখ করতেন। যেন সূচনার পূর্বে নিয়তের বিশুদ্ধতা এবং ইখলাসের
প্রতি দাওয়াতের উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে যেত।
৩. বিশুদ্ধ জবাব হলো এই, যা আল্লামা ইবনে
বাত্তাল বলেছেন শিরোনামের সাথে হাদীসের অংশ:اِنـااَوْحَـيْـنَا اِلَـيْـكَ كَـمـا
اوْحَـيـنَاالـي نُـوح الخ -এর সাথে মিল রয়েছে।
তা এভাবে যে, শিরোনামের
উদ্দেশ্য ছিলো যে,
হুযুরের
প্রতি অহীর সূচনা কিভাবে হয়েছিল? আয়াতে বলা হয়েছে যে, যেমনিভাবে পূর্ববর্তী নবীগণের প্রতি হয়েছিল। হাদীসে সহীহ
নিয়ত ও একনিষ্ঠতার প্রতি গুরুত্বারোপ রয়েছে, আর এ বিষয়ের অহীই সকল নবীগণের প্রতি এসেছে। যেমন:ومـااُمِـرُوا الا لِـيَـعْـبُـدُوالـلـه
مُـخْـلِـصِـيـنَ لَـهُ الـدِيـنَ حُـنَفَـاء ; সুতরাং
বুঝা গেল যে, হাদীসে
যে তাশবীহ বা সাদৃশ্যতা(كـمـااوحـيـنا)
ছিল তার উপমাস্বরূপ انـمـا الاعـمـال بـالـنيـات হাদীসটি বর্ণনা করা হয়েছে। সুতরাং সামঞ্জস্যতা স্পষ্ট।
৪. ইবনে মুনীর বলেন, এ হাদীসে হিজরতের
আলোচনা আছে, আর
হুযুরের হিজরত ছিল দুটি। ১.নির্জনতা ও ইবাদতের জন্যে তিনি ঘর থেকে বের হয়ে হেরা গুহায়
হিজরত করেছিলেন। এ হিজরত অবস্থায়ই সেখানে বস্তুত তার উপর অহীর সূচনা হয়েছিল। ২. দ্বিতীয়
হিজরত হলো মক্কা থেকে মদীনায়। যেখান থেকে অহীর বিকাশ এবং প্রসারতার সূচনা হয়। সুতরাং
শিরোনামের সাথে হাদীসের সুস্পষ্ট মিল বিদ্যমান। : উমদাতুল কারী
৫. একটি সূক্ষ্ম সামঞ্জস্যতা এটিও
বর্ণনা করা হয় যে, এ হাদীসের প্রথম রাবী হুমাইদী হলেন মাক্কী।
সুতরাং ইমাম বুখারী মাক্কী রাবী দ্বারা শুরু করে এদিকে ইঙ্গিত করেছেন যে, অহীর সূচনা মক্কায়
হয়েছে।
৬. অথবা বলা যায় যে, এ হাদীসটির সামঞ্জস্যতা
শিরোনামের مـدلُـول الـتـزامـي (আবশ্যিক অর্থ) তথা অহীর মহত্ত ও শ্রেষ্ঠত্বের সাথে রয়েছে। তা এভাবে যে, অহীপ্রাপ্তির অধিকারী
ঐ ব্যক্তিই হতে পারে যার নিয়ত বিশুদ্ধ। যেমনিভাবে রাজাবাদশাদের দরবারে মন্ত্রীর পদ
একমাত্র তাকেই অর্পণ করা হয় যার একনিষ্ঠতার প্রতি বাদশার পূর্ণ আস্থা থাকে, তার পক্ষ থেকে বিদ্রোহের
কোনো সম্ভাবনা না থাকে। কখনো কখনো কেবলমাত্র বিদ্রোহের ধারণা থেকেই বরখাস্ত করে দেওয়া
হয়। কিন্তু রাজা-বাদশাদের ধারণা হলো ত্রুটিপূর্ণ। তাই যার উপর আস্থা করেছিল হতে পারে
সে বিদ্রোহ করে বসতে পারে। বিদ্রোহ না করলেও সম্ভাবনা তো অবশ্যই রয়েছে। পক্ষান্তরে
আল্লাহর জ্ঞানে ত্রুটির কোনো সম্ভাবনা নেই। সুতরাং যাকে তিনি নির্বাচিত করেন তার মধ্যে
বিদ্রোহের সম্ভাবনাই থাকে না। আল্লাহ বলেন:مَـا كَـانَ لِـبَـشَـرٍ اَنْ يُـوْتِـيَـهُ
الـلـه الـكِـتَـابَ والـحُـكْـمَ والـنـبُـوةَ ثُـم يَـقُـولَ لِـلـنـاسِ كُـوْنُـوا
عِـبَـادًالِـيْ مِـنْ دُوْنِ الـلـه (আল্লাহ যাকে কিতাব, হিকমত এবং নবুওয়াত
দান করেছেন সে কখনো এটা বলবেনা যে, তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমার ইবাদত কর।)
৭. হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী (র.) বলেন:ومِـنَ الـمُـنَاسَـبَـاتِ الـبَـدِيعَـة والـوَجِـيْـزَة
الخ অর্থাৎ সর্বোত্তম ও সংক্ষিপ্ত মিল হলো, যেহেতু কিতাব সংকলন করা হয়েছে অহীয়ে সুন্নত সংগ্রহের উদ্দেশ্যে, তাই অহীর সূচনাকে সর্বাগ্রে আনা হয়েছে, যেন বুঝা যায় যে, এ কিতাবে যা কিছু আছে তার সূচনা কিভাবে হয়েছে? আর অহী দ্বারা উদ্দেশ্য হলো শরীয়তের আমলের বর্ণনা করা। এ কারণে
সর্বপ্রথম انمـا الاعْـمَـال بـالـنـيـات এ হাদীসটি আনা হয়েছে, আমল বিশুদ্ধ করার পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে। অহীর জন্যে সুন্দর
নিয়তের শর্তারোপ দ্বারা এ কল্পনাও যেন না হয় যে, অহী একটি চেষ্টা দ্বারা অর্জনযোগ্য জিনিস। যেমন মুতাজিলা ও কাদিয়ানীদের
ধারণা। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা হলো অহীয়ে নবুওয়াত কেবলমাত্র وهـبـي তথা আল্লাহপ্রদত্ত জিনিস। কোনো ব্যক্তি যতই চেষ্টা-সাধনা করুকনা
কেন এবং তার মধ্যে যতই যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকুক আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত সে مـوحَـي الـيـه তথা অহীপ্রাপ্ত হতে পারবে না। তাছাড়া নবুওয়াত ও রিসালাত কোনো
ডিগ্রী নয়; বরং এটি একটি পদ, যা অর্পণ ব্যতীত অর্জন করা যায় না। পৃথিবীতে হাজারো এমন লোক
রয়েছে যারা ডিগ্রী নিয়েও পদের অধিকারী হতে পারে নি। তেমনিভাবে পৃথিবীতে এমন অনেক লোক
রয়েছে যাদের অন্তরে নবুওয়াতীর মহান দায়িত্ব বহন করার যোগ্যতা রয়েছে কিন্তু তারা নবী
নন। কেননা এটি একটি পদ, আল্লাহপ্রদত্ত দান। তিনি যাকে ইচ্ছা করেন তাকে দান করেন, আর যাকে ইচ্ছা করেন তাকে তা থেকে বঞ্চিত করেন। আল্লাহ বলেন:الـلـه اَعْـلَـمُ حَـيْـثُ يَـجْـعَـلُ رِسَـالَـتَـهُ (রাসূল কাকে বানাবেন,আল্লাহই ভালো জানেন।) اللـه يَـصْـطَـفِـي مِـنَ الـمَـلَائِـكَـةِ رُسُـلًا وَمِـنَ
الـناس (আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতা ও মানুষের মধ্য থেকে রাসূল নির্বাচন করেন।) যখন
এ কথা প্রমাণিত হলো যে, নবুওয়াত ডিগ্রী নয়; বরং এটি একটি পদ, তাহলে মালিক যতক্ষণ ইচ্ছা করবেন পদ বাকি রাখবেন, আবার যখন ইচ্ছা করবেন পদ রহিত/বাতিল করে দেন। সুতরাং রিসালাতের
পদ হুযুরে আকরাম (স.)-এর পরে সমাপ্ত করে দেওয়া হয়েছে। এখন কেউ যতই যোগ্যতা অর্জন করুক
সে নবী হতে পারবে না। যদি নবুওয়াতির সামান্যতম অবকাশও থাকত তাহলে উমর ফারূক (র.) অবশ্যই
নবী হতেন। হুযুর (স.)বলেছেন:لَـوْ كَـانَ بَـعْـدِي نَـبِـي لَـكَـانَ عُـمَـر আমার পরে কেউ নবী হলে উমরই (র.) নবী হতো।
কোন মন্তব্য নেই