তরজামাতুল বাব তথা শিরোনাম হলো كَـيْـفَ كـان بَـدْءُ الـوَحْـي অর্থাৎ অহীর সূচনা কিভাবে হয়েছিল? আয়াতে এর দুটি উত্তর দেওয়া হয়েছে।
১. অহীর মূল উৎসের কথা উল্লেখ রয়েছে; আর তা انا اوحينا এ আয়াতে আছে যে, এর মূল উৎস হলো আল্লাহ তা‘আলা।
২. অহীর ধরনের কালগত সূচনার বিবরণ রয়েছে, যে এ ধরনের অহী হযরত নূহ (আ) থেকে শুরু হয়েছে, আর তা كَـمـااَوْحَـيـنا আয়াতে রয়েছে।
২. দ্বিতীয় উত্তর হলো আয়াতে কারীমায় এ বিষয়ের প্রতি সতর্কীকরণ উদ্দেশ্য যে, অহীর জন্যে তিনটি জিনিস প্রয়োজন।
ক. প্রথম জিনিস হলো مُـرْسِـل তথা অহী প্রেরণকর্তা বা অহীর মূল উৎস, আর তা হলো আল্লাহ তা‘আলার যাত বা সত্তা।
খ. দ্বিতীয় জিনিস হলো مُـرْسَـلْ اِلَـيْـه যার কাছে অহী প্রেরিত হয়েছে; আর তারা হলেন আম্বিয়া (আ.) ও রাসূলে আকরাম (স.)।
গ. তৃতীয় জিনিস হলো واسِـطَـة বা মাধ্যম। আর তা হলো জিবরাঈল (আ.)। সুতরাং আয়াতের কারিমার উদ্দেশ্য হলো যাবতীয় উপকরণসমূহের বিবরণ দেওয়া।
প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন: এখানে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে, এ আয়াতে হযরত নূহ (আ.)-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হলো কেন? অথচ তাঁর পূর্বে আরো অনেক নবী অতিবাহিত হয়েছেন, যেমন হযরত আদম, শীছ, ইদরীছ (আ.) প্রমুখ, এবং তাদের উপরও তো অহী অবতীর্ণ হয়েছে।
উত্তর: এর কয়েকটি উত্তর দেওয়া হয়েছে:
হযরত নূহ (আ.) -এর আলোচনা দ্বারা এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, যেমনিভাবে নূহ (আ.)কে তার সমপ্রদায়ের লোকেরা কষ্ট দিয়েছে এবং তিনি ধৈর্যধারণ করেছেন, তেমনিভাবে হে নবী আপনাকেও কষ্টের সম্মুখীন হতে হবে, আপনি তাতে ধৈর্যধারণ করবেন।
২. নূহ (আ.)-এর পূর্বে যদিও আরো নবীর আগমন হয়েছিল কিন্তু কোনো রাসূল আগমন করেননি। হযরত নূহ (আ.)ই সর্বপ্রথম রাসূল, তার পরে অনেক রাসূল হয়েছেন। আয়াতে সেদিকে ইঙ্গিত রয়েছে যে, হযরত মুহাম্মদ (স.)ও রাসূল।
৩. হযরত নূহ (আ.) কুফরের ব্যাপক প্রচার-প্রসারকালে প্রেরিত হয়েছেন; তার পূর্বে কুফরের ব্যাপকতা ছিল না। এর দ্বারা ইঙ্গিত রয়েছে নবী মুহাম্মদ (স.)ও কুফরের ব্যাপকতাকালে প্রেরিত হয়েছেন।
শায়খুল হিন্দ (র.) হযরত নূহ (আ.)কে বিশেষভাবে উল্লেখের একটি সূত্র কারণ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন নূহ (আ.)-এর পূর্বে অহী আসত সামাজিক বিষয়াদি নিয়ে, যেমন জীবিকা উপার্জনের মাধ্যম, শিল্প ইত্যাদির প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। উদাহরণতঃ হযরত আদম (আ.)কে গৃহনির্মাণ, শীছ(আ.)-কে কৃষিকর্ম এবং ইদরীস (আ.)কে সুচীকর্ম ইত্যাদি সম্পর্কে অহী আসত। এদিকে হযরত নূহ (আ.) থেকে শরীয়ত সম্পর্কিত অহীর ধারাবাহিকতা শুরু হয়, যার পরিসমাপ্তি ঘটে হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর মাধ্যমে। যেমন ধরুন শিশুদেরকে প্রথমে সামাজিক বিষয়াদির শিক্ষা দেওয়া হয়, যখন তারা বুঝমান হয় তখন তাদেরকে কালিমায়ে তায়্যিবাহ ও দীনের মামূলী বিষয় শিক্ষা দেওয়া হয়, এরপর তাদেরকে মাদরাসার সাথে ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি করা হয়। যখন তারা কিছুটা পড়াশুনা শুরু করে এবং জ্ঞানবুদ্ধি বৃদ্ধি পেতে থাকে তখন কঠোরতা আরোপ করা হয় এবং নিয়মতান্ত্রিকতার সাথে শিক্ষা দেওয়া শুরু হয়ে যায়, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয় এবং পাস-ফেল, সফলকাম ও বিফলকাম দু’দলে বিভক্তি সৃষ্টি হয়।
তেমনিভাবে পৃথিবী একটি মাদরাসা, তার প্রথম শিক্ষক ছিলেন আদম (আ.)। যেহেতু তার তখন শৈশবকাল, তাই তাকে অধিকতরভাবে সামাজিক বিষয়াদির বিধিবিধান শিখানো হয়েছিল, পাশাপাশি কিছুটা দীনি বিষয়ের শিক্ষাও দেওয়া হয়েছিল। পর্যায়ক্রমে হযরত নূহ (আ.)-এর যুগ এলো, যেখানে নিয়মতান্ত্রিক দীনি শিক্ষার বিদ্যাপীঠ প্রতিষ্ঠার সূচনা হয়। তাতে যারা ফেল হয়েছে তাদেরকে দুনিয়া থেকে নিঃশেষ করে দেওয়া হয়েছে। অতপর নূহ (আ.)-এর তিন সন্তান থেকে নতুনভাবে দুনিয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এজন্যেই নূহ (আ.) কে আদমে ছানী বা দ্বিতীয় আদম বলা হয়। অতপর দুনিয়া উন্নতি ও অগ্রগতির দিকে ধাবিত হয়। এবং তদনুযায়ী নবী আগমন করতে থাকেন। সর্বশৈষ ইলম ও আমলের বিদ্যাপীঠের কারিকুলাম দোজাহানের সর্দার (স.)-এর মাধ্যমে পূর্ণতা পায়। সেই প্রসঙ্গে আল্লাহর বাণী:اَلْـيَـومَ اَكْـمَـلْـتُ لَـكُـم دِيـنَـكُـم واَتْـمَـمْـتُ عَـلَـيـكُـم نِـعْـمَـتِـي ورَضِـيـتُ لَـكُـمُ الإسْـلامَ دِيْـنًـا
মোটকথা হযরত নূহ (আ.) -এর পূর্বে অহী ছিল ভিন্ন প্রকৃতির তথা আর্থ-সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিষয়াবলী সম্পর্কিত। হযরত নূহ (আ.) থেকে শুরু করে হুযুর আকরাম (স.) পর্যন্ত পরকালীন বিষয় সম্পর্কিত অহী আসতে শুরু করে। এ কারণে হুযুর (স.)-এর অহীকে নূহ (আ.)-এর অহীর সাথে উপমা দেওয়া হয়েছে।
অনুবাদ: (ইমাম বুখারী বলেন) আমার নিকট হুমাইদি বর্ণনা করেছেন, হুমাইদি বলেন আমার নিকট বর্ণনা করেছেন সুফিয়ান, তিনি বলেন আমার নিকট বর্ণনা করেছেন ইয়াহইয়া বিন সাঈদ আনসারী, তিনি বলেন আমাকে সংবাদ দিয়েছেন মুহাম্মদ বিন ইবরাহীম তাইমী, তিনি আলকামা বিন ওয়াক্কাস আল লাইসী কো এটা বলতে শুনেছেন যে, হযরত ওমর বিন খাত্তাব (রা.) মিম্বারের উপর বলতে শুনেছেন যে, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, সকল কাজের ফলাফল (সওয়াব) নিয়তের উপর নির্ভরশীল। আর প্রত্যেক ব্যক্তি (তার কাজের বিনিময়স্বরূপ) তা-ই পাবে, যা সে নিয়ত করেছে। সুতরাং যে ব্যক্তির হিজরত হবে দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে অথবা কোনো নারীকে বিবাহ করার উদ্দেশ্য, তার হিজরত সে উদ্দেশ্যেই গণ্য হবে যে উদ্দেশ্যে সে হিজরত করেছে।
নোট: শুধুমাত্র শুরুতে কয়েকটি হাদীসের সনদের তরজমা করা হবে। যেন ছাত্র/ছাত্রীরা পদ্ধতি বুঝতে সক্ষম হয়। কিতাবুল ঈমান থেকে শুধুমাত্র হাদীসের তরজমা লেখা হবে। : ইনশাআল্লাহ
সহীহ বুখারীতে হাদীসটির পুনরাবৃত্তি : এ হাদীসটি বুখারী শরীফে ৭ স্থানে বর্ণিত হয়েছে; তন্মধ্যে: ১. এখানে দ্বিতীয় পৃষ্ঠায়। যাতে نيات বহুবচনের শব্দে আছে। বাকি ছয় স্থানে نية একবচনের শব্দ ব্যবহার হয়েছে। সেগুলি হলো যথাক্রমে: পৃ. ১৩, ৩৪৩, ৫৫১, ৭৫৯, ৭৯০, ১০২৮।
কোন মন্তব্য নেই