Header Ads

সহীহ বুখারীঃ কিতাবুল অযুঃ মিসওয়াক প্রসঙ্গ

باب السِّوَاكِ وَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ بِتُّ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاسْتَنَّ

পরিচ্ছেদ: মিসওয়াক প্রসঙ্গ। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আমি নবী করীম (সা.)-এর নিকট রাত্রি যাপন করেছি। (দেখতে পেয়েছি) তিনি মিসওয়াক করেছেন।

পূর্বের সাথে যোগসূত্র: উভয় বাবের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে। তা এভাবে যে, উভয় বাবেই দূরীকরণের বর্ণনা রয়েছে। পূর্বের বাবে রক্ত দরীকরণের বর্ণনা ছিল। আর এ বাবে রয়েছে মুখের দুর্গন্ধ দূরীকরণের বর্ণনা।

অথবা সামঞ্জস্য এভাবে হতে পারে যে, পূর্বের বাবে ছিল মুখের রক্ত ধৌত করা। আর মিসওয়াক করা দ্বারা কখনও রক্ত বের হয়ে যায়। তাই এখন মিসওয়াকের বাবসমূহ শুরু করছেন।

ডশরোনামের উদ্দেশ্য: এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে যে, মিসওয়াক নামাযের সুন্নত না অযুর সুন্নত? ইমাম বুখারী কিতাবুল অযুতে মিসওয়াকের বর্ণনা করে এটা বলে দিলেন যে, মিসওয়াক অযুর সুন্নত।

বুঝা গেল যে, এ মাসআলায় ইমাম বুখারী হানাফী মাসলাকের সমর্থন করছেন।

حَدَّثَنَا أَبُو النُّعْمَانِ، قَالَ حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ زَيْدٍ، عَنْ غَيْلاَنَ بْنِ جَرِيرٍ، عَنْ أَبِي بُرْدَةَ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ أَتَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَوَجَدْتُهُ يَسْتَنُّ بِسِوَاكٍ بِيَدِهِ يَقُولُ ‏ "‏ أُعْ أُعْ ‏"‏، وَالسِّوَاكُ فِي فِيهِ، كَأَنَّهُ يَتَهَوَّعُ‏.‏

অনুবাদ: হযরত আবু মূসা (রা.) বলেন, আমি একদিন নবী (সা.)-এর কাছে এসে দেখি, তিনি তাঁর হাতের মিসওয়াক দিয়ে দাঁত ঘসছেন। তিনি মুখে মিসওয়াক রেখে এমনভাবে শব্দ করছেন, মনে হলো যেন বমি করবেন।

হাদীসের সামঞ্জস্য: শিরোনামের সাথে হাদীসের সামঞ্জস্য فَوَجَدْتُهُ يَسْتَنُّ بِسِوَاكٍ -এর সাথে।

হাদীসের পুনরাবৃত্তি: হাদীসটি বুখারী শরীফে ৩৮ পৃষ্ঠায় এবং মুসলিম শরীফ ১২৮, আবু দাউদ শরীফ ৭ ও নাসাঈ ২ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে।

حَدَّثَنَا عُثْمَانُ، قَالَ حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، عَنْ مَنْصُورٍ، عَنْ أَبِي وَائِلٍ، عَنْ حُذَيْفَةَ، قَالَ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِذَا قَامَ مِنَ اللَّيْلِ يَشُوصُ فَاهُ بِالسِّوَاكِ‏.‏

অনুবাদ: হযরত হুযাইফা (রা.) বলেন, আল্লাহর নবী (সা.) রাতে যখন ঘুম থেকে উঠতেন, তখন মিসওয়াক দিয়ে মুখ পরিষ্কার করতেন।

হাদীসের সামঞ্জস্য: শিরোনামের সাথে হাদীসের সামঞ্জস্য يَشُوصُ فَاهُ بِالسِّوَاكِ -এর সাথে।

হাদীসের পুনরাবৃত্তি: হাদীসটি বুখারী শরীফে ৩৮, ১২২, ১৫৩ পৃষ্ঠায় এবং মুসলিম ১২৮, আবু দাউদ ৮, নাসাঈ ২ ও ১৮৪ ইবনে মাজাহ ২৫ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে।

শব্দ-বিশ্লেষণ

سِـوَاك শব্দটি فـعـل ও الـة অর্থাৎ মুখ পরিষ্কার করার উপকরণ এবং কর্ম উভয়টির জন্য ব্যবহৃত হয়।

استنَّ : إسـتـنان শব্দটি سـن থেকে উৎপন্ন। যার অর্থ দাঁত। সুতরাং استنان অর্থ হলো দাঁত মাজা; মিসওয়াক করা। চাই আঙ্গুল দ্বারা হোক বা গাছের ডাল দ্বারা।

يتهوَّع : শব্দটি هوع থেকে উদগত হয়েছে। বাবে نصر و سمع অর্থাৎ هاع يهوع و هاع يهاع هوعًا অনিচ্ছাকৃত বমি করা, আর تهوع অর্থ হলো ইচ্ছাকৃত বমি করা; মুখে আঙ্গুল প্রবেশ করিয়ে বমি করা।

ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ

মিসওয়াক সুন্নত হওয়ার ব্যাপারে ওলামায়ে ইসলামের মতৈক্য রয়েছে। এবং অসংখ্য হাদীস দ্বারা হুযুর (সা.)-এর সর্বসময়ের আমল হিসেবে প্রমাণিত রয়েছে। বিশেষত নবী করীম মিসওয়াকের পাবন্দী ও গুরুত্বারোপের অনুমান করা যায় মৃত্যুকালীন অবস্থা দেখলে বুঝা যায়। হযরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত যে, (মৃত্যুরোগের সময়) আমার ভাই আব্দুর রহমান বিন আবী বকর (রা.) নবী করীম (সা.)-এর নিকট এলো। এবং তখন নবী করীম (সা.) তখন আমার সিনার সাথে হেলান দিয়ে ছিলেন। আব্দুর রহমানের কাছে একটি উত্তম তাজা মিসওয়াক ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) উক্ত মিসওয়াকের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তাই আমি তার হাত থেকে সেটি নিয়ে আমার দাঁত দ্বারা চিবিয়ে উত্তমরূপে ঝেড়ে পরিষ্কার করে নবী করীম (সা.)-কে দিলাম। নবী করীম (সা.) তা দ্বারা মিসওয়াক করলেন, এবং এত উত্তমরূপে মিসওয়াক করলেন যে, জীবনে কখনও এত উত্তমরূপে মিসওয়াক করতে দেখিনি। মিসওয়াক থেকে ফারেগ হওয়ার পর কিছুক্ষণ অতিবাহিত হতে না হতেই (তাৎক্ষণিক) তিনি নিজ হাত বা আঙ্গুল উঠালেন। এরপর তিনবার বললেন: في الرفيق الاعلي এরপর তিনি ইন্তেকাল করলেন। (বুখারী  কিতাবুল মাগাযী, পৃ. ৬৩৮)

মিসওয়াকের বিধান  ও ইমামগণের মতামত: উপরোক্ত বক্তব্য দ্বারা বুঝা গেল যে, মিসওয়াক করা সুন্নত। অতঃপর মতবিরোধ হলো মিসওয়াক নামাযের সুন্নত নাকি অযুর সুন্নত।

হানাফী ফুকাহায়ে কেরাম এটাকে অযুর সুন্নত বলেন।

আর ইমাম শাফেয়ী (র.) এটিকে নামাযের সুন্নত সাব্যস্ত করেন। ইমাম আজম থেকে এটাও বর্ণিত আছে যে, মিসওয়াক করা দীনের সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত। ইমাম বুখারী মিসওয়াকের মাসআলা কিতাবুল অযুতে উলে­খ করেছেন। এতে স্পষ্টভাবেই বুঝা যায় যে, ইমাম বুখারী হানাফীদের অনুকূলে রয়েছেন। তার মতেও মিসওয়াক অযুর সুন্নত। নেচৎ এ বাবটি কিতাবুসসালাতে উলে­খ করতেন।

ইমাম বুখারী সবৃপ্রথম হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের একটি আছর পেশ করছেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) নবী করীম  (সা.)-এর নিকট রাত্রিযাপন করেছিলেন। এটি একটি দীর্ঘ হাদীসের অংশ। যা ইমাম বুখারী কয়েক জায়গায় এনেছেন। এরপর আরো দুটি হাদীস এনেছেন। প্রথম হাদীসটি হযরত আবু মুসা আশআরী বলেন, আমি হুযুর আকদাস (সা.)-এর দরবারে হাজির হলাম, দেখলাম তিনি মিসওয়াক করছিলেন, তার মুখ থেকে উ’ উ’ শব্দ বের হচ্ছিল। এটা স্পষ্ট যে, শুধুমাত্র দাঁতের উপর মিসওয়াক করলে এ ধরনের আওয়াজ সৃষ্টি হয় না। এখানে এটাও বুঝা গেল যে, নামায অযুর সুন্নত। কেননা, যারা মিসওয়াককে নামাযের সুন্নত সাব্যস্ত করেন। তারা শুধুমাত্র দাঁতের উপর মিসওয়াক করাকেই যথেষ্ট মনে করেন।

ঘানাফীদেও মাসলাক হলো আসল মিসওয়াক অযুর সুন্নতের সাথে সংশ্লিষ্ট। এতদ্ভিন্ন আরো কিছু সময়ও মুস্তাহাব। আল্লামা শামী (র.) লিখেছেন:

قال في امداد الفتاح وليس السواك من خصائص الوضوء فانه يستحب في حالات منها تغير الضم الفم والقيام من النوم والي الصلوة ودخول البيت والاجتماع بالناس وقراءة القرآن لقول ابي حنيفة ان السواك من سنن الدين فتسوي فيه الاحوال كلها (شامي اول)

মিসওয়াকের উপকারিতা: মিসওয়াকের অগণিত উপকারিতা রয়েছে। আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী (র.) লিখেছেন, মিসওয়াকের সত্তরেরও বেশি উপকারিতা রয়েছে। যেমন:

ادنـاهـا إمـاطـة الاذى عـن الـفـم واعـلاهـا تـذكـيـر الـشـهـادتـيـن عـنـد الـمـوت অর্থাৎ ‘মিসওয়াকের সর্বনিম্ন উপকার হলো, মুখের দুর্গন্ধ দূর হয়, আর সবচেয়ে বড় উপকার হলো মৃত্যুর সময় কালিমায়ে শাহাদাত নসীব হয়।’

মিসওয়াক ধরার পদ্ধতি: বাহরুরায়েক গ্রন্থকার লিখেছেন: والسنة في كيفية اخذه ان تجعل الخنصر من يمينك اسفل السواك الخ (بحرالرائق)

মিসওয়াক ধরার সুন্নত পদ্ধতি হলো ডান হাতের কণিষ্ঠাঙ্গুলি মিসওয়াকের নিচে রাখবে, এবং অণামিকা ও মধ্যমা ও তর্জনী এ তিনটিকে মিসওয়াকের উপর রাখবে। আর বৃদ্ধাঙ্গুলিকে মিসওয়াকের মাথার দিকে নিচে রাখবে।

হযরত ইবনে মাসউদ (রা.)-এর রেওয়ায়েতে আছে মিসওয়াককে মুষ্ঠি দ্বারা চেপে ধরে মিসওয়াক করবে না। এর ফলে অর্শ্ব রোগ সৃষ্টি হয়।

মিসওয়াক হাতের কণিষ্ঠাঙ্গুলির সমপরিমাণ মোটা এক বিঘত লম্বা হবে। ব্যবহার করতে করতে ছোট হয়ে গেলে কোনো সমস্যা নেই।

মিসওয়াক করার সুন্নত পদ্ধতি: দাঁতগুলোতে প্রস্থে মিসওয়াক করা হবে। প্রথমে উপরের দাঁতের ডান দিকে পরে বাম দিকে। এরপর নিচের দাঁতের ডান দিকে পরে বাম দিকে। মিসওয়াক সমাপ্ত করার পর ধুয়ে দাঁড় করিয়ে রাখবে, যেন মিসওয়াকের আঁশগুলি উপরের দিকে থাকে।


কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.