Header Ads

সহীহ বুখারীঃ কিতাবুল অযুঃ নাবীয এবং নেশাকর দ্রব্য দ্বারা অযু করা

باب لاَ يَجُوزُ الْوُضُوءُ بِالنَّبِيذِ وَلاَ الْمُسْكِر وَكَرِهَهُ الْحَسَنُ وَأَبُو الْعَالِيَةِ وَقَالَ عَطَاءٌ التَّيَمُّمُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنَ الْوُضُوءِ بِالنَّبِيذِ وَاللَّبَنِ ِ

পরিচ্ছেদ: নাবীয এবং নেশাকর দ্রব্য দ্বারা অযু করা জায়েয নেই এ প্রসঙ্গে। হাসান বসরী এবং আবুল ‘আলিয়া একে মাকরূহ বলেছেন। আতা (র.) বলেন, নাবীয এবং দুধ দ্বারা অযুর পরিবর্তে আমার মতে তায়াম্মুম করাই উত্তম।

পূর্বের সাথে যোগসূত্র: পূর্বের বাবে পবিত্র ময়লা সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে। এখন পাক অময়লা বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করছেন।

তাছাড়া পবিত্র জিনিসসমূহ দুই প্রকার। এক. নোংরা ও ঘৃণিত। সে সম্পর্কে ইমাম বুখারী পূর্বের বাবে আলোচনা করেছেন। দুই. যা নোংরা ও ঘৃণিত নয়। এ বাবে সেই সম্পর্কে আলোচনা করছেন। আল্লামা আইনী (র.) বলেন, বাব দুটির মাঝে বিশেষ কোনো যোগসূত্র নেই। কিন্তু উভয় বাবে এমন হুকুম রয়েছে যা সহীহ এবং ফাসেদ হওয়ার বিষয়ে শরীয়ত পালনে বাধ্য এমন লোকদের সাথে সম্পৃক্ত।

বাবের উদ্দেশ্য: ইামাম বুখারীর উদ্দেশ্য হলো যদি পানিতে মিশ্রিত বস্তু পাক ও অনোংরা বস্তু হয় যা দ্বারা না তো পানির নাম পরিবর্তন হয়ে যায় না রং, স্বাদ ও তরলতায় তার কোনো প্রভাব পড়ে, তাহলে এর প্রত্যেকটি ব্যবহার জায়েয। আর যদি সেই জিনিস পানির গুণাগুণ ও নাম পরিবর্তন করে দেয় তাহলে তা দ্বারা অযু জায়েয নেই।

حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، قَالَ حَدَّثَنَا الزُّهْرِيُّ، عَنْ أَبِي سَلَمَةَ، عَنْ عَائِشَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ "‏ كُلُّ شَرَابٍ أَسْكَرَ فَهُوَ حَرَامٌ ‏"‏‏.‏ 

অনুবাদ: উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা (রা.) বলেন, আল্লাহর নবী (সা.) বলেছেন, মানুষকে নেশাগ্রস্ত করে এমন প্রতিটি পানীয় দ্রব্য হারাম।

হাদীসের সামঞ্জস্য: শিরোনামের সাথে হাদীসের সামঞ্জস্য ‏ "‏ كُلُّ شَرَابٍ أَسْكَرَ فَهُوَ حَرَامٌ ‏"‏‏ -এর সাথে।

হাদীসের পুনরাবৃত্তি: হাদীসটি বুখারী শরীফে ৩৭, ৮৩৭ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে।

ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ

نَبِيذ : শব্দটি বাবে ضرب-এর মাসদার نبذ থেকে গৃহিত। অর্থ হলো নিক্ষেপ করা; ঢালা। نبيذ শব্দটি منبوذ অর্থে ব্যবহৃত, এক প্রকার শরবত, যা বিভিন্ন বস্তু  যেমন খেজুর, কিসমিস, মধু, গম, যব, আটা ইত্যাদি দ্বারা তৈরি হয়। কিন্তু অধিকতর খেজুর থেকেই তৈরি হয়।

নাবীযের প্রকার: সাধারণতঃ নাবীয তিন প্রকার:

১.    যে নাবীয আগুনে জ্বাল করা হয়নি, নেশা সৃষ্টি করে না, পরিবর্তন হয়নি, মিষ্ট নয় তবে তরল, এরূপ নাবীয দ্বারা অযু করা সর্বসম্মতিক্রমে জায়েজ।

২.    জ্বাল করা হয়েছে, নেশা সৃষ্টি করে, ঘন এবং তার তরলতা প্রবাহ ক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে- এরূপ নাবীয দ্বারা অযু জায়েজ নয়। এটাও সর্বসম্মত কথা।

৩.    যে নাবীয মিষ্ট, পাতলা, পাকানো হয়নি, নেশা সৃষ্টি করে না।

এ তৃতীয় প্রকার নাবীয নিয়ে মতভেদ রয়েছে এবং কয়েকটি মতামত বর্ণিত আছে:

বিঃদ্রঃ উলে­খ্য, নাবীযের এ মতভেদ কেবলমাত্র নাবীযে তামার তথা খেজুরের নাবীয সম্পর্কে। এ ছাড়া অন্য বস্তুর নাবীয যেমন, আঙ্গুর, মধু ইত্যাদি দ্বারা অযু করা সর্বসম্মতিক্রমে না জায়েয।   

১.    ইমাম শাফেয়ী, মালেক, আহমাদ ইবনে হাম্বল ও ইমাম আবু ইউসুফ (র.)-এর মাযহাব। এর দ্বারা অযু জায়েজ নেই। এমনকি যদি অন্য পানি পাওয়া না যায়, তাহলে তায়াম্মুম করবে।

২.    ইমাম আবূ হানীফা (র.) সুফিয়ান ছাওরী ও ইমাম আওযায়ীর মাযহাব। এ তৃতীয় প্রকার দ্বারা অযু করবে, যদি এতদ্ভিন্ন কোনো পানি পাওয়া না যায়। তাছাড়া হযরত আলী, ইকরামা (র.) প্রমুখ থেকেও অযুর অবকাশ সম্পর্কে মুসান্নিফে ইবনে আবী শাইবায় বর্ণিত আছে। মূল ইবারত হলো: عن الحارث عن علي انه كان لا يري باسًا بالوضوء من النبيذ – عن يحي عن عكرمة قال النبيذ وضوء لمن لم يجد الماء

৩.    ইমাম মুহাম্মদের মাযহাব হলো, যদি অন্য পানি না থাকে, তাহলে প্রথমে নাবীয দ্বারা অযু করবে, অতঃপর তায়াম্মুমও করে নিবে।

وَكَرِهَهُ الْحَسَنُ : হাসান বসরী (র.) এবং আবুল আলিয়া নাবীয দ্বারা অযু করাকে মাকরূহ বলেছেন। ইমাম বুখারী এর কোনো ব্যাখ্যা করেননি যে, এখানে মাকরূহ দ্বারা কোন প্রকার মাকরূহ উদ্দেশ্য: তাহরীমী না তানযীহী। তবে আবু উবায়েদ হাসান বসরী হতে রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেন, তিনি বলেছেন:لا بأس به فعلي هذا كراهته كراهة تنزيه অর্থাৎ নাবীয দ্বারা অযু করার মধ্যে কোনো ক্ষতি নেই। এর দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, হাসান বসরীর মতে নাবীয দ্বারা অযু করা মাকরূহে তানযীহী। এ প্রকার মাকরূহ জায়েযের বিরোধী নয়। সুতরাং ইমাম বুখারীর এটা বলা যে, নাবীয দ্বারা অযু জায়েয নেই তা প্রমাণ হয়নি।

আল্লামা আইনী (র.) বলেন: فحينئذ لا يساعد الترجمة

وَأَبُو الْعَالِيَةِ : আবুল আলিয়াও নাবীযে তামার দ্বারা অযু করাকে মাকরূহ মনে করতেন। আবু দাউদ শরীফে আবু খালদার রেওয়ায়েত রয়েছে, আবুল আলিয়াকে আমি এক জুনুবী ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, তার নিকট পানি নেই; কিন্তু নাবীযে তামার আছে। সে কি সেই নাবীযে তামার দ্বারা গোসল করতে পারবে? আবুল আলিয়া উত্তর দিলেন যে, না। সে নাবীযে তামার দ্বারা গোসল করতে পারবে না। (আবু দাউদ, খ. ১, পৃ. ১২)

হাফিয আসকালানী বলেন: وفي رواية ابي عبيد فكرهه (ফতহুল বারী খ. ১, পৃ. ২৮২)

এ উক্তি সম্পর্কে আমরা বলব:

মূলতঃ আবুল আলিয়ার ফতওয়া গোসল সম্পর্কিত: যার বিষয়ে হানাফীদেরও প্রাধান্যযোগ্য মত এটাই যে, নাবীয দ্বারা গোসল করা জায়েয নয়। কারণ, ইমাম আবু হানিফা (র.)-এর নিকট নাবীযে তামার দ্বারা অযু জায়েয হওয়াটা কিয়াস পরিপন্থি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। কাজেই ইমাম বুখারী এটাকে অযু নাজায়েয হওয়ার উপর দলীল কিভাবে পেশ করা কিভাবে সঠিক হতে পারে?

وَقَالَ عَطَاءٌ التَّيَمُّمُ أَحَبُّ إِلَيَّ : হযরত আতার উক্তি দ্বারা তো নাবীযে তামার দ্বারা অযু জায়েয হওয়াটা বুঝে আসছে। কেননা, তিনি বলছেন احب الي আমার নিকট নাবীযে তামার দ্বারা অযু করা হতে আমার নিকট তায়াম্মুম করা অধিকতর পছন্দনীয়। এ উক্তি দ্বারা নাজায়েয হওয়া মোটেই বুঝা যায় না।

মোটকথা, এ আছারগুলি ইমাম বুখারীর জন্য না উপকারী হয়েছে না সমর্থনকারী।

বাবের হাদীস দ্বারা দলীলপ্রদান: বাবের হাদীসে রয়েছে যে, প্রত্যেক নেশা সৃষ্টিকারী পানীয় হারাম। তিনি বলেন এ হাদীসের শব্দ كل شراب اسكر-এর মধ্যে ব্যাপকতা রয়েছে। চাই তা বর্তমানে নেশা সৃষ্টি করুক বা তার মধ্যে নেশা সৃষ্টির শক্তি থাকুক।

কিন্তু এ অর্থ গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, আবু দাউদ শরীফে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত রয়েছে:

كا ن ينبذ للنبي (ص) الزبيب فيشربه اليوم والغد و بعد الغد الي مساء الثالثة ثم يأمر به فيسقي الخدم او يهراق

‘নবী করীম (সা.)-এর জন্য মুনাক্কার নাবীয তৈরি করা হতো। তিনি আজ, কাল এবং তৃতীয় দিনের সন্ধ্যা পর্যন্ত পান করতেন। তারপর তিনি নির্দেশ এবং তদনুসারে তা (নেশা সৃষ্টির পূর্বেই) খাদেমদেরকে পান করানো হতো বা ফেলে দেওয়া হতো।

সুতরাং বাবে উলি­খিত হাদীস দ্বারাও তার দলীল দেওয়া সহীহ হয়নি।

بدائع গ্রন্থে আল্লামা কাসানী উদ্ধৃত করেছেন যে, ইমাম আবূ হানীফা (র.) (জীবনের) শেষ দিকে প্রথমোক্ত মতামতের দিকে রুজু করেছেন। অতএব, নাবীয দ্বারা অযু করা যাবে না। এ বিষয়ে যে চার ইমামের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হলো। হানাফীদের মধ্যে ইমাম ত্বাহাবী, আল্লামা ইবনে নুজাইম এবং কাযীখান এটাকে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু পরবর্তীকালের অধিকাংশ হানাফী আলেম জায়েজ না হওয়ারই ফতোয়া দিতেন। তাই এ বিষয়ে অধিক আলোচনার প্রয়োজন নেই।


কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.