Header Ads

সহীহ বুখারীঃ কিতাবুল অযুঃ এক মুদ্দ পরিমাণ পানি দ্বারা অযু করা

باب الْوُضُوءِ بِالْمُدِّ

পরিচ্ছেদ: এক মুদ্দ পরিমাণ পানি দ্বারা অযু করা প্রসঙ্গে

حَدَّثَنَا أَبُو نُعَيْمٍ، قَالَ حَدَّثَنَا مِسْعَرٌ، قَالَ حَدَّثَنِي ابْنُ جَبْرٍ، قَالَ سَمِعْتُ أَنَسًا، يَقُولُ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَغْسِلُ ـ أَوْ كَانَ يَغْتَسِلُ ـ بِالصَّاعِ إِلَى خَمْسَةِ أَمْدَادٍ، وَيَتَوَضَّأُ بِالْمُدِّ‏.‏

অনুবাদ: হযরত আনাস (রা.) বলেন, আল্লাহর নবী (সা.) এক সা' থেকে পাঁচ মুদ পর্যন্ত পানি দিয়ে গোসল এবং এক মুদ পানি দিয়ে অযু করতেন। (এক মুদ এক সের বা কেজির সমান, চার মুদে এক সা')

হাদীসের সামঞ্জস্য: শিরোনামের সাথে হাদীসের সামঞ্জস্য قد أذن أن تخرجن في حاجتكن -এর সাথে।

যোগসূত্র : পূর্বের বাবে পানির পাত্রের প্রকার এবং ধাতুর ব্যাপকতা বর্ণনা করা হয়েছে যে, অযুর জন্য কোনো প্রকার বিশেষ পাত্রের প্রয়োজন নেই। পাত্র ছোট হোক বা বড়, বড় জলাধার বা ছোট পেয়ালা, মাটির হোক বা পাথরের, তামার হোক বা পিতলের, সর্বপ্রকার পাত্রেই অযু করা জায়েয। আর এ বাবে পরিমাণের উলে­খ করা হচ্ছে যে, অযু কতটুকু পানি দ্বারা করা চাই। এ বিষয়ে নবী করীম (সা.)-এর নিয়ম কী ছিল?

ব্যাখ্যা: বাবের হাদীসের একথা বুঝে আসে যে, হুযুর (সা.)-এর অভ্যাস ছিল এক মুদ পানি দ্বারা অযু এবং এক সা’ থেকে পাঁচ সা’ পর্যন্ত পানি দ্বারা গোসল করা।

صاع ও مد : সা’ ও মুদ হলো দুটি পরিমাপপাত্র। যার সাথে শরীয়তের অনেকগুলি মাসআলা সম্পর্কিত। যেমন সদকাতুল ফিতর, ফিদইয়া, কাফফারা ইত্যাদি, তেমনিভাবে অযু ও গোসলের পানির পরিমাণ নির্ধারণ।

এ কারণেই ফোকাহায়ে কেরাম ও মুহাদ্দিসীনে ইযাম সা’ ও মুদ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা গুরুত্ব সহকারে কওে থাকেন।

এ ব্যাপারে সকল ফকীহ একমত যে, এক সা‘ -এর সমপরিমাণ হলো চার মুদ। কিন্তু মুদের পরিমাণ ও তার ওজন কি? এ নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে।

১.    ইমাম আবূ হানীফা, ইমাম মুহাম্মদ, ইরাকবাসী ও এক বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম আহমদেরও মাযহাব হলো, এক মুদের পরিমাণ দুই রিতিল, আর এক সা‘ হয় আট রিতিল; যাকে صاع عراقي বলা হয়, আবার صاع عمري এবং صاع حجازيও বলা হয়।

ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালেক, হেজাযবাসী (মক্কা মদিনার অধিবাসী) ও এক বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম আহমদের মাযহাব এই যে, এক মুদের পরিমাণ এক রিতিল এক তৃতীয়াংশ রিতিল। অর্থাৎ ১১৩ রিতিল। সে হিসাবে এক সা‘-এর পরিমাণ ৫ রিতিল ও এক তৃতীয়াংশ রিতিল। অর্থাৎ ১ সা‘ = ৫ রিতিল। যাকে صاع حجازي বলা হয়।

সর্বপ্রথম এ কথাটি স্মরণ রাখা দরকার যে, এ ব্যাপারে সকল ফকীহ একমত যে, অজু গোসলের জন্য শরিয়তের পক্ষ থেকে পানির কোনো পরিমাণ নির্ধারিত নেই; বরং অপচয় না করে যতটুকু পানির প্রয়োজন হয় ততটুকুই ব্যবহার করা জায়েজ আছে। কারণ হলো দুনিয়ার সকল মানুষ একই রকম হয়না; কেউ আছে অনেক লম্বা, কেউ বেঁটে, কেউ অনেক মোটা, কেউ আবার শীর্ণকায়। আবার কারো মাথায় ঘন চুল ও ঘন দাড়ি থাকে, কারো মাথা কামানো, দাড়ি হালকা। তাহলে এটা স্পষ্ট হলো সকলের জন্য কোনো পরিমাণ নির্দিষ্ট করা যাবে না। তাছাড়া শীতকাল ও গরমকাল হিসেবে পানির ব্যবহারেও ব্যবধান হয়ে থাকে।

তাইতো ইমাম নবভী: اجمع المسلمون علي ان الماء الذي يجزي في الوضوء والغسل غير مقدر بل يكفي فيه القليل والكثير اذا وجد شرط الغسل وهو جريان الماء علي الاعضاء

তবে এটা অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে যে, অপচয় এবং এত অল্প ব্যয় যে, শরীরের অঙ্গ শুকনা থাকে নিষিদ্ধ।

শাফেয়ীদের দলীল:

ইমাম শাফেয়ী বলেন, ফিদিয়া সম্পর্কে বুখারীর একটি রেওয়ায়েতে আছে اَطْعِم ستة مساكين نصف صاع

অপর হাদীসে আছে فامره رسول الله صلي الله عليه وسلم ان يُّطْعِمَ فرقا بين ستة مساكين (بخاري) 

প্রথম হাদীসের মর্ম হলো ছয়জন মিসকীনকে খানা খাওয়াও, প্রত্যেক মিসকীনকে অর্ধ সা’ পরিমাণ শস্য দিয়ে দাও, সুতরাং সব মিলিয়ে তিন সা’ হলো।

দ্বিতীয় হাদীসের মর্ম হলো হুযুর (সা.) হযরত কা’ব কে নির্দেশ দিয়েছিলেন এক فرق শস্য ছয়জন মিসকীনকে দিতে। এ উভয় হাদীসকে মিলালে বুঝা যায় যে, এক فرق তিন সা’ পরিমাণ হয়। যেমন মুসলিমের হাদীসে আছে واطعم فرقا بين ستة مساكين والفرق ثلثة آصع  (মুসলিম প্রথম খণ্ড, পৃ. ৩৮২) আর فرق হয়ে থাকে ষোল রিতলে। এখন ষোলোকে তিন দিয়ে ভাগ দিলে ভাগফল ৫১৩  রিতিল হয়।

জবাব: তাদের দলীলের উত্তর হলো এক فرق ষোলো রিতিলে হয় একথা কোনো হাদীসে প্রমাণিত নয়। সুতরাং আমরা একথা স্বীকার করিনা যে, হাদীসে যে فرق-এর কথা রয়েছে তা দ্বারা ষোলো রিতিল উদ্দেশ্য হবে। খুব বেশি হলো ভাষাবিদদের যে উক্তি রয়েছে যে তা ধরা যেতে পারে। সুতরাং এটা হানাফীদের উপর দলীল হতে পারে না। কারণ তরা হলো ভাষার ক্ষেত্রে অনুসরণীয়।

হানাফীদের দলীল:

হানাফীগণ দলিল পেশ করেন নিম্নেবর্ণিত হাদীসসমূহ দ্বারা:

১.    ইমাম ত্বাহাবী (র.) ‘শরহে মা‘আনিল আছারে’ সা‘-এর পরিমাণ সংক্রান্ত পরিচ্ছেদে হযরত মুজাহিদ (র.) থেকে হাদীস নকল করেছেন- তিনি বলেন, আমরা হযরত আয়েশা (রা.)-এর নিকট গেলাম। অতঃপর আমাদের একজন পানি পান করতে চাইলে একটি বগড় পাত্র নিয়ে আসা হলো। হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) বললেন, এ পাত্রটির পরিমাণ পানি দ্বারা রাসূল (সা.) গোসল করতেন। মুজাহিদ বলেন, আমি অনুমান করলাম, তাতে আট রিতিল, নয় রিতিল, অথবা দশ রিতিল পানি ধরবে। সন্দেহের ক্ষেত্রে নিম্ন পরিমাণটি নির্দিষ্ট। আর তা হলো আট রিতিল।

২.    ইমাম নাসায়ী (রা.) ত্বাহারাত পরিচ্ছেদে ‘যে পরিমাণ পানি গোসলের জন্য’ শিরোনামে মুসা জুহানী থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন: তিনি বলেন, মুজাহিদ একটি পাত্র নিয়ে এলেন আমি তা অনুমান করলাম আট রিতিল হবে। অতপর মুজাহিদ বলেন, হযরত আয়েশা (রা.) আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল  (সা.) এ পাত্র পরিমাণ পানি দ্বারা গোসল করতেন। এ হাদীস দ্বারা ইমাম তাহাবীর হাদীসের সন্দেহও দূর হয়ে যায়।

৩.    عن انس قال كان النبي صلي الله عليه وسلم يتوضا باناء يسع رطلين ويغسل بالصاع (ابو داؤد في باب ما يجزي من الماء في الوضوء  অর্থাৎ হযরত আনাস (রা.) বলেন নবী করীম (সা.) এমন পাত্র দ্বারা অযু করতেন যাতে দুই রিতিল পানি সংকুলান হতো, আর গোসল করতেন এক সা’ পানি দ্বারা। আর সহীহাইনে নবী করীম (সা.) এক মুদ দ্বারা অযু করা প্রমাণিত আছে। সুতরাং সেই পাত্র এক মুদেরই ছিল।

ইমাম আবু ইউসুফের মত পরিবর্তন: ইমাম আবু ইউসুফও তরফাইনের সাথে ছিলেন। এরপর হজ থেকে প্রত্যাবর্তন করার পর তিনি তার মত পরিবর্তন করেছেন।

এ ঘটনাকে আল্লামা উসমানী (র.) ফতহুল মুলহিমে বর্ণনা করেছেন যে, ইমাম আবু ইউসুফ বলেন আমি যকন হজের উদ্দেশ্যে মদিনা যাই তখন মদিনাবাসীকে সা’ এর পরিমাণ জিজ্ঞেস করলাম। তখন তারা বলল: صاعنا هذا صاع رسول الله صلي الله عليه وسلم  অর্থাৎ আমাদেও এখানে যে সা’-এর প্রচলন রয়েছে তাহলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সা’। আমি তাদেরকে বললাম ما حجتكم في ذلك এ ব্যাপারে তোমাদের দলীল কি? فقالوا غدا  তারা বলল আগামী কাল দলীল পেশ করব। পরের দিন সকালবেলা আনুমানিক পঞ্চাশজন মুহাজির ও আনসারের সন্তানরা স্ব-স্ব সা’ নিয়ে এলো। তাদের সকলেই নিজেদেও পিতা ও পরিবারের পক্ষ  থেকে বর্ণনা করতে লাগল যে, এটা হলো হুযুর (সা.)-এর সা’। অতপর আমি গভীরভাবে দৃষ্টি দিয়ে দেখলাম যে, সকল সা’গুলি সমান ছিল। অতঃপর আমি সেগুলি মেপে দেখলাম যে, তা ছিল পাঁচ রিতিল সমপরিমাণ। ইমাম আবু ইউসুফ (র.) বলেন: فرأيت امرا قويا فتركت قول ابي حنيفة في الصاع فاخذت بقول اهل المدينة هذا هو المشهور (فتح الملهم)

কিন্তু শায়খ ইবনুল হুমাম এ ঘটনাকে রেওয়ায়েত ও দিরায়াত উভয় দিক থেকে দুর্বল সাব্যস্ত করেছেন। যার একটি কারণ হলো এ ঘটনাটি অপরিচিত লোকদের থেকে বর্ণনা করা হয়েছে। মুহাদ্দিসে কেরামের মূলনীতি অনুযায়ী এমন ঘটনা দ্বারা দলীল প্রদান করা বৈধ নয়। দ্বিতীয়ত ঘটনাটি যদি সত্যই হতো তাহলে ইমাম মুহাম্মদ (র.) অবশ্য নিজ কিতাবসমূহে তা উলে­খ করতেন। কেননা তিনি ইমাম আবূ ইউসুফ (রা.)-এর রুজু সংক্রান্ত বিষয়গুলো বর্ণনার ক্ষেত্রে অতীব গুরুত্ব দিয়েছেন।

কতিপয় বুযুর্গ থেকে এটাও বর্ণিত আছে যে, ইমাম আবু ইউসুফ ঐ মাদানী সা’ কে মদিনাবাসীদের রিতিল দ্বারা মেপেছেন। যেহেতু মদিবাসীদেও রিতিল বাগদাদবাসীদের রিতিল অপেক্ষা কিছুটা বড় ছিল। তাদের রিতিল ছিল ত্রিশ আসতার সমপরিমাণ। আর বিশ আসতারে বাগদাদী আট রিতিলকে ৫১৩  মাদানী রিতিল দ্বারা ওজন দিলে সমপরিমাণ হয়ে যায়।


কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.