পরিচ্ছেদ: ইমাম যদি নামাজে কান্না করে (তাহলে কি হুকুম?)। আব্দুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ বলেন, আমি ওমর (রা.)-এর কান্নার আওয়াজ শুনেছি, অথচ আমি ছিলাম পিছনের কাতারে। তখন তিনি পড়ছিলেন: إِنَّمَا أَشْكُو بَثِّي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ [আমি আমার দু]ঃখ, বিষণœতা ও পেরেশানীর অভিযোগ একমাত্র আল্লাহর নিকট করছি]
অনুবাদ: উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসূল (সা.) পীড়িত হওয়ার (যে রোগে তিনি ইন্তেকাল করেছিলেন) পর বলেছিলেন আবু বকরকে লোকজনের নামাজ আদায়ের আদেশ দাও। আয়িশা বর্ণনা করেন, (এ কথা শুনে) আমি তাঁকে বললাম, আপনার স্থলে আবু বকর নামাজ পড়াতে দাঁড়ালে কেঁদে ফেলবে এবং এ জন্য লোকজনের শ্রবণ উপযোগী করে কিরায়াত করতে পারবে না। সুতরাং লোকজনের নামাজ পড়ানোর জন্য ওমরকে আদেশ করুন। (এ কথা শোনার পরও) তিনি বললেন, আবু বকরকে আদেশ করো, সে লোকজনের সাথে নামাজ আদায় করুক। আয়িশা বলেন, এই সময়ে আমি হাফসাকে বললাম। তাঁকে বলো, আবু বকর আপনার স্থলে নামাজে ইমামতি করতে দাঁড়ালে কাঁদার কারণে লোকজনের শ্রবণের মত করে কিরাআত করতে পারবে না। তাই ওমরকে আদেশ করুন। তিনি লোকজনের নামাজ আদায় করাবেন। হাফসা তাই বললো। (এ কথা শুনে) আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, তোমরা দেখছি ইউসূফকে পরিবেষ্টনকারিণী নারীদের মত। আবু বকরকে বলো, লোকজনকে নামাজ পড়াতে। এ কথা শুনে হাফসা (অভিমানের সুরে) আয়িশাকে বললো, তোমার থেকে আমি কখনো কল্যাণ লাভ করিনি।
শিরোনামের উদ্দেশ্য: ইমাম বুখারী শিরোনামে কোনো জওয়াব উলেখ করেননি। কিন্তু ইমাম বুখারী বাবের অধীনে যে হাদীস উলেখ করেছ্নে তা দ্বারা বুঝা যায় যে, তাঁর উদ্দেশ্য হলো এটা বর্ণনা করা যে, নামাজে কান্নার কারণে নামাজ বাতিল হবে না।
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ
নামাজে কান্নার বিধান:
১. ইমাম আজম আবু হানিফা ও ইমাম মালেক (র.) বলেন, যদি নামাজের মধ্যে আল্লাহর ভয়ে বা জাহান্নামের আলোচনার কারণে কান্না করে তাহলে তা জায়েয আছে। মাকরূহ হবে না, যদিও কান্নার সময় আওয়াজ হয়। তবে যদি শারীরীক বা দুনিয়াবী বিপদাপদের কারণে কান্না আসলে যদি এমনভাবে কান্না করে যে, কোনো শব্দ বা বাক্য বের হয়ে যায়, তাহলে নামাজ ফাসেদ হয়ে যাবে। আর যদি কান্নার আওয়াজ না হয়; বরং চক্ষু হতে অশ্র“ নির্গত হয় তাহলে নামাজ ফাসেদ হবে না। এটি ইমাম আহমদেরও মাযহাব।
২. ইমাম শাফেয়ীর মতে যদি কান্না করতে গিয়ে দুটি হরফ বের হয়ে যায় (যেমন আহ্ ইত্যাদি) তাহলে নামাজ ফাসেদ হয়ে যাবে। কান্নার কারণ আল্লাহর ভয়ে হোক বা অন্য কোনো কিছু।
প্রবল সম্ভাবনা যে, ইমাম বুখারীর উদ্দেশ্য হলো ইমাম শাফেয়ীর মত খণ্ডন করা এবং জুমহূরের মাযহাব সমর্থন করা।
ইমাম বুখারী (র.) হযরত ওমর (রা.)-এর আছরটি দলীলস্বরূপ পেশ করেছেন। এটি ফজরের নামাজের ঘটনা। আব্দুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ বলেন, ওমর (রা.) ফজরের নামাজ পড়ছিলেন, নামাজে তিনি সূরা ইউসুফ তিলাওয়াত করছিলেন। এক পর্যায়ে যখন তিনি إِنَّمَا أَشْكُو بَثِّي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ এ আয়াতে পৌঁছলেন, তখন তিনি কান্না করতে লাগলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ বলেন, আমি শেষ কাতারে ছিলাম, সেখান থেকেও কান্নার আওয়াজ শুনছিলাম। একথা স্পষ্ট যে, ওমর (রা.) শারিরীকি কষ্ট বা দুনিয়াবী কোনো বিপদের কারণে কান্না করেননি; বরং আল্লাহর ভয়ে বা ইয়াকুব (আ.)-এর উপর আল্লাহর পক্ষ হতে কঠিন পরীক্ষার কথা মনে করে অনিচ্ছাকৃতভাবে তার কান্না এসে গিয়েছিল। বুঝা গেল যে, নামাজে কান্না করার কারণে নামাজ ফাসেদ হবে না।
হাদীস দ্বারা দলীল: আবু বকর (রা.) নরমদিল মানুষ, এবং তিনি অধিক পরিমাণ কান্নাকারী লোক তা নবী করীম (সা.)-এর জানা ছিল। তা সত্তেও তিনি আবু বকর (রা.)-কেই নামাজ পড়ানোর নির্দেশ দিলেন। এবং তাঁকে কান্নাকাটি করতে নিষেধ করেননি। এর দ্বারা বুঝা গেল যে, কান্নাকাটির কারণে নামাজ নষ্ট হয় না।
مَا كُنْتُ لأُصِيبَ مِنْكِ خَيْرًا : হযরত হাফসা (রা.)-এর কথার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মধুর ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা। ঘটনাটি হলো এরূপ: নবী করীম (সা.) যয়নাব (রা.)-এর ঘরে মধু পান করেছিলেন। এদিকে আয়েশা ও হাফসা (রা.)-এর ঘরে বিলম্বে পৌঁছতে লাগলেন। তখন আয়েশা (রা.) হাফসা (রা.)-কে বললেন, রাসূল (সা.) যখন তোমার নিকট আসবে তখন বলবে আপনার মুখ থেকে মাগাফিরের গন্ধ আসছে। হাফসা (রা.) ভয়ে ভয়ে নবী করীম (সা.)-কে তা বলে দিলেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে তিরস্কার অবতীণ হয়েছিল। এবারও হযরত আয়েশা (রা.)-এর শিখানো কথা বলতে গিয়ে নবী করীম (সা.) থেকে তিরস্কার শুনতে হলো। তাই তিনি আয়েশা (রা.)-কে বললেন, আমি কখনও তোমার থেকে ভালো কিছু পাইনি।
কোন মন্তব্য নেই