পরিচ্ছেদ: হায়েয আসা ও শেষ হওয়ার বর্ণনা প্রসঙ্গে। নারীরা হযরত আয়েশা (রা.)-এর নিকট কৌটা দিয়ে পাঠাত, তাতে থাকত হায়যের নেকড়া, যার মধ্যে হায়েযের হলুদ রং থাকত। যার রং হতো হলদে, হায়যের রক্তের কারণে। (তারা পাঠাতো নামাজের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করার জন্য।) তখন হযরত আয়েশা (রা.) তাদের বলতেন- তোমরা তাড়াহুড়া করো না, যতক্ষণ না তোমরা পরিষ্কার সাদাস্রাব দেখতে পাও। এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য হতো হায়েয থেকে পবিত্রতা। হযরত যায়েদ বিন সাবিত (রা.)-এর মেয়ের নিকট এ সংবাদ পৌঁছল যে, মেয়েরা মধ্যরাতে বাতি চেয়ে নিয়ে দেখত যে, তারা পবিত্র হয়েছে কি না? তিনি বললেন (নবী করীম (সা.)-এর যুগে মেয়েরা এমন করত না। তিনি ইহা তাদের জন্য দোষণীয় মনে করলেন।
অনুবাদ : উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা (রা.) বলেন, ফাতিমা বিনতে আবু হুবাইশ একজন রক্ত প্রদর রোগগ্রস্তা নারী ছিলেন। তিনি রাসূল (সা.)-এর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলেন। তিনি বললেন, এটা শিরা বিশেষের রক্ত, ঋতু নয়। ঋতু এলে নামাজ ছেড়ে দিবে এবং ঋতু চলে গেলে গোসল করে নামাজ আদায় করবে।
শিরোনামের উদ্দেশ্য: হায়েযের শুরু এবং শেষ কিভাবে জানা যাবে? হায়েযের আসা-যাওয়ার ভিত্তি রক্তের রং এর উপর হবে না দিন ও অভ্যাসের উপর হবে? যেহেতু মাসআলাটি মতবিরোধপূর্ণ, তাই ইমাম বুখারী এ বাবে সে বিষয়টি সম্পর্কে আলোকপাত করছেন।
ইমামগণের মাযহাব:
১. হেদায়া গ্রন্থকার (র.) বলেছেন: ঋতুস্রাবের রং ছয়টি যথা- কালো, লাল, হলদে শেওলা, সবুজ ও মেটে। সুতরাং ইমাম আবূ হানীফার মতে, হায়যের সময়-সীমার ভিতরে যে কোনো বর্ণের রক্তই নির্গত হোক তা হায়েয বলে গণ্য। মোটকথা রক্তের রং ধর্তব্য নয়; বরং অভ্যাসের দিনের হিসাব ধর্তব্য।
২. ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর মতে উভয়টাই ধর্তব্য। অর্থাৎ মহিলা যদি معتادة محضة হয় তাহলে শাফেয়ী ও হাম্বলীদের মতে মহিলার অভ্যাস ও নিয়মকে গ্রহণযোগ্য ধরতে হবে। কিন্তু মহিলা যদি مميزة محضة হয় তাহলে রংয়ের পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য হবে। অর্থাৎ তখন শুধু কালো ও লাল বর্ণের রক্তই হায়েয, অন্যান্য বর্ণগুলো ইস্তিহাযা। হাম্বলীদের মাযহাবও এটাই। ইমাম মালেক (র.) হলদে ও শেওলা বর্ণকেও হায়েয বলেন। আল্লামা নববী (র.) বলেছেন: হায়যের সময়কালের ভিতরে হলদে ও শেওলা বর্ণ হায়েয বলে গণ্য হবে।
ইমাম বুখারী এক্ষেত্রে হানাফীদের মাযহাবকে সমর্থন করছেন। ইমাম বুখারীর এ মত তার উলেখকৃত আছর দ্বারা জানা যায়। এ আছর দু’টি সামান্য পরিবর্তন সহকারে মুয়াত্তা মালেকের باب طهر الحائض-এ উলেখ রয়েছে।
প্রথম আছর: ইমাম প্রথম আছর হলো: নারীরা হযরত আয়েশা (রা.)-এর নিকট কৌটা দিয়ে পাঠাত, তাতে থাকত হায়যের নেকড়া। যার রং হতো হলদে, হায়যের রক্তের কারণে। (তারা পাঠাতো) নামাজের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করার জন্য। তখন হযরত আয়েশা (রা.) তাদের বলতেন- তোমরা তাড়াহুড়া করো না, যতক্ষণ না তোমরা পরিষ্কার সাদাস্রাব দেখতে পাও। এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য হতো হায়েয থেকে পবিত্রতা।
(‘হযরত আয়েশা (রা.)-এর আজাদকৃত দাসী হতে বর্ণিত,) তিনি বলেন: নারীরা হযরত আয়েশা (রা.)-এর নিকট কৌটা দিয়ে পাঠাত, তাতে থাকত হায়যের নেকড়া। যার রং হতো হলদে, হায়যের রক্তের কারণে। (তারা পাঠাতো) নামাজের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করার জন্য। তখন হযরত আয়েশা (রা.) তাদের বলতেন- তোমরা তাড়াহুড়া করো না, যতক্ষণ না তোমরা পরিষ্কার সাদাস্রাব দেখতে পাও। এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য হতো হায়েয থেকে পবিত্রতা। (আব্দুর রায্যাক এবং ইবনে আবি শায়বাও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। উপরিউক্ত শব্দরূপ মুওয়াত্তা মালেক হতে গৃহীত।) এর দ্বারা বুঝা গেল সম্পূর্ণ সাদাবর্ণের আর্দ্রতা নির্গত হওয়া পর্যন্ত, যে কোনো বর্ণের রক্তই হায়েয বলে গণ্য হবে।
এর অর্থ হলো যে, তাড়াহুড়া করেনা যে পর্যন্ত না তোমরা নেকড়ায় সাদাস্রাব বা সাদা আর্দ্রতা দেখতে পাও যা হায়েযের শেষে বের হয়। এ আর্দ্রতা হায়েয শেষ হওয়ার নিদর্শন। এর সাথে অন্য কোনো রংয়ের সামান্যতম মিশ্রণও থাকবে না। হযরত আয়েশা (রা.)-এর এ উক্তি দ্বারা বুঝা গেল যে, রংয়ের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। আবার তার এ উক্তির আরেকটি অর্থও হতে পারে। তা হলো: যতক্ষণ পর্যন্ত নেকড়া সম্পূর্ণরূপে সাদা অর্থঅৎ শুষ্ক না দেখ: তখন এর দ্বারা বুঝা যাবে যে, এখন আর কোনো আর্দ্রতা অবশিষ্ট নেই।
দ্বিতীয় আছর: তাঁর দ্বিতীয় আছর হলো এই যে: হযরত যায়েদ বিন সাবেত (রা.)-এর কন্যা (উম্মে কুলসুম)-এর নিকট এ সংবাদ পৌঁছেছে যে, মেয়েরা মধ্যরাতে বাতি চেয়ে নিয়ে তাদের হায়েযের নেকড়া পরীক্ষা করত যে, তারা পবিত্র হয়েছে কিনা? ইহা চুড়ান্ত পর্যায়ের গুরুত্বের প্রকাশ। এর উদ্দেশ্য ছিল যদি পবিত্র হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে গোসল এশার নামাজ পড়ে নিবে।
তিনি বললেন, নবী করীম (সা.)-এর যুগে মহিলারা এরূপ করতেন না। তিনি তাদের এ কাজকে দোষণীয় মনে করলেন। এ কাজটিকে অপছন্দনীয় মনে করার এটা হতে পারে যে, শরীয়তে সহজতা বা শিথিলতা করা হয়েছৈ। মধ্যরাতে বাতি চেয়ে নেওয়া আবার বারবার তা দেখা বেশ কষ্টকর কাজ, যা শরীয়তের স্বভাব পরিপন্থি। দীনের মধ্যে কঠোরতা অবলম্বন করা পছন্দনীয় নয় যে, লোকদেরকে অনর্থক নিয়ম-নীতি প্রচলন করে দিবে। এতদসংক্রান্ত শরীয়তের বিধান হলো: لن يشاد الدين احد الا غلبه
কারো মতে, এ কাজটি দোষণীয় সাব্যস্ত করার কারণ হলো রাতের বেলা বাতির আলোতে নির্মল শুভ্রতা অনুধাবন করার কঠিন ব্যাপার। ফলে এমন হতে পারে সে পবিত্র হয়ে গেছে মনে করে গোসল করে এশার নামাজ পড়ে নিল, অথচ তখনও সে পবিত্র হয়নি। সে ক্ষেত্রে এ নামাজটি হায়েয অবস্থায় হবে: যা নাজায়েয।
যা হোক, হযরত আয়েশা ও হযরত যায়েদ বিন সাবিত (রা.)-এর কন্যার আছর দ্বারা হায়েযের শুরু এবং শেষের বিষয়ে হানাফীদের মতের সমর্থন পাওয়া যায়। কারণ, এ আছর দুটি দ্বারা জানা গেছে যে, হায়েযের শুরু এবং শেষের ভিত্তি কালো এবং লাল বর্ণের রক্তকে সাব্যস্ত করা যায় না। হায়েযের সময় রঙীন আর্দ্রতা আসা ইহাও হায়েয। সে আর্দ্রতা শেষ হওয়াটাই হলো হায়েয বন্ধের নিদর্শন। রঙের হিসাব হবে না যে, শুধু লাল এবং কালো রংই ধর্তব্য হবে, যেমনটা শাফেয়ী এবং হাম্বলীদের মাযহাব। তাদের দলীল হল আবু দাউদ শরীফের রেওয়ায়েত: فانه دم اسود يعرف অর্থাৎ হায়েযের রং হলো কালো রং যা চিনে নেওয়া যায়।
তাদের দলীরের উত্তর:
১. এ হাদীসের সনদটি বিতর্কিত।
২. এ হাদীসটি স্বয়ং শাফেয়ীদের মতেরও পরিপন্থি। কারণ, তারা কালোর পাশাপাশি লাল রং-কেও হায়েয হিসেবে গণ্য করে। অথচ এ হাদীসে শুধুমাত্র কালো রংয়ের কথা বলা হয়েছে।
৩. এটি একটি جزئي বিষয়, যা كلي-এর মোকাবেলায় অপ্রাধান্য হবে। তাছাড়া রক্তের রংয়ের পরিবর্তন দেশ ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে এবং খাদ্য ও বয়সের পরিবর্তনের কারণে হয়ে থাকে: যা সকলেরই জ্ঞাত বিষয়। অধিকন্তু শিরোনামের হাদীসটি এ বিষয়ে স্পষ্ট: فاذا اقبلت الحيض الخ যখন হায়েযের দিন শুরু হয়ে যাবে তখন নামাজ ছেড়ে দাও, আর যখন তা শেষ হয়ে যাবে তখন গোসল করে নামাজ পড়।
কোন মন্তব্য নেই