Header Ads

সহীহ বুখারীঃ কিতাবুল অযুঃ বীর্য ধৌত করা এবং তা ঘষে তুলে ফেলা

باب غَسْلِ الْمَنِيِّ وَفَرْكِهِ وَغَسْلِ مَا يُصِيبُ مِنَ الْمَرْأَةِ

পরিচ্ছেদ: বীর্য ধৌত করা এবং তা ঘষে তুলে ফেলা আর মেয়েদের লজ্জাস্থান হতে যে আর্দ্রতা (শরীরে কিংবা কাপড়ে) লেগে যায় সে প্রসঙ্গে আলোচনা

পূর্বের সাথে যোগসূত্র: উভয় বাবের মধ্যে যোগসূত্র সুস্পষ্ট। কারণ উভয় বাবেই নাপাকী দূর করা সম্পর্কে আলোচনা চলছে। অথবা এভাবেও বলা যেতে পারে যে, ইমাম বুখারী রক্তের পর বীর্যের মাসআলা বর্ণনা করছেন। কেননা, বীর্য রক্ত থেকেই তৈরি হয় এবং তা রক্তেরই সার-নির্যাস।

حَدَّثَنَا عَبْدَانُ، قَالَ أَخْبَرَنَا عَبْدُ اللَّهِ، قَالَ أَخْبَرَنَا عَمْرُو بْنُ مَيْمُونٍ الْجَزَرِيُّ، عَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ يَسَارٍ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ كُنْتُ أَغْسِلُ الْجَنَابَةَ مِنْ ثَوْبِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم، فَيَخْرُجُ إِلَى الصَّلاَةِ، وَإِنَّ بُقَعَ الْمَاءِ فِي ثَوْبِهِ‏.‏

অনুবাদ: উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা (রা.) বলেন, আমি আল্লাহর নবী (সা.)-এর কাপড় থেকে নাপাকী ধুয়ে পরিষ্কার করতাম এবং তিনি কাপড়ে পানির ভিজা দাগ নিয়ে নামায পড়তে বের হতেন।

অনুবাদ: হযরত সুলাইমানস ইবনে ইয়াসার (রা.) বলেন, আয়িশা বলেছেন, আমি রাসূল (সা.)-এর কাপড় থেকে নাপাকী ধুয়ে দিতাম এবং তিনি কাপড়ে পানির ভিজা দাগ নিয়ে নামায পড়তে চলে যেতেন।

হাদীসের সামঞ্জস্য: শিরোনামের সাথে হাদীসের সামঞ্জস্য كُنْتُ أَغْسِلُ الْجَنَابَةَ اي المني-এর সাথে।

হাদীসের পুনরাবৃত্তি: হাদীসটি বুখারী শরীফে ৩৬ পৃষ্ঠায় চারবার এবং মুসলিম শরীফে ১৪০ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে।

ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ

حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ، قَالَ حَدَّثَنَا يَزِيدُ، قَالَ حَدَّثَنَا عَمْرٌو، عَنْ سُلَيْمَانَ، قَالَ سَمِعْتُ عَائِشَةَ، ح وَحَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، قَالَ حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَاحِدِ، قَالَ حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ مَيْمُونٍ، عَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ يَسَارٍ، قَالَ سَأَلْتُ عَائِشَةَ عَنِ الْمَنِيِّ، يُصِيبُ الثَّوْبَ فَقَالَتْ كُنْتُ أَغْسِلُهُ مِنْ ثَوْبِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم، فَيَخْرُجُ إِلَى الصَّلاَةِ وَأَثَرُ الْغَسْلِ فِي ثَوْبِهِ بُقَعُ الْمَاءِ‏.‏

অনুবাদ: হযরত সুলাইমান ইবনে ইয়াসার (রা.)-কে কাপড়ে লাগা বীর্ষ সম্পর্কে প্রশ্ন করায় তিনি বললেন, আয়িশা (রা.) বলেছেন, আমি আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর কাপড় থেকে বীর্ষ ধুয়ে দিতাম। তারপর তিনি কাপড়ের পানিয় ভিজা দাগসহ নামায পড়তে যেতেন।

হাদীসের সামঞ্জস্য: শিরোনামের সাথে হাদীসের সামঞ্জস্য سَأَلْتُ عَائِشَةَ عَنِ الْمَنِيّ، يُصِيبُ الثَّوْبَ فَقَالَتْ كُنْتُ أَغْسِلُهُ -এর সাথে।

ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ:

উলে­খ্য যে, ইমাম বুখারী শিরোনামে তিনটি বিষয় উলে­খ করেছেন। এক. বীর্য ধৌত করা। দুই. বীর্য ঘর্ষণ করে তুলে ফেলা। তিন. মহিলার লজ্জাস্থান হতে নির্গত আর্দ্রতা ধুয়ে ফেলা। কিন্তু এর অধীনে যে হাদীস এনেছেন তা বাহ্যত শুধুমাত্র প্রথমটির সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই আল্লামা আইনী বলেছেন:لم يطابق الحديث الترجمة الا في غسل المني فقط

কিন্তু হাদীস শরীফ দ্বারা তৃতীয় অংশের সাথেও সামঞ্জস্য হতে পারে। কারণ, প্রথম হাদীসে রয়েছে:كنت اغسل الجنابة আর জানাবত ব্যাপক শব্দ। পুরুষেরও হতে পারে আবার মহিলারও হতে পারে। তাই হাদীসের অর্থ হলো আমি নবী করীম (সা.)-এর কাপড় হতে বীর্য ধুতাম-চাই তা নবীজীর বীর্য থেকে হোক বা আমার বীর্য থেকে হোক কিংবা উভয়ের মিশ্রিত হোক। এ হাদীসে জানাবাত দ্বারা উদ্দেশ্য বীর্য-ই। বরং যদি গভীরভাবে চিন্তা করা হয় তবে দেখা যাবে পুরুষের কাপড়ে বা শরীরে মহিলার বীর্য-ই লেগে থাকবে। কারণ, পুরুষের বীর্য মহিলার রেহেমের দিকে যায়। তবে পুরুষ এবং মহিলার মিশ্রিত বীর্যও হতে পারে।

অবশ্য শিরোনামের দ্বিতীয় অংশ তথা বীর্য ঘষে তুলে ফেলা তা এ হাদীস দ্বারা প্রমাণ করা মুশকিল। তাই হাদীসের ব্যাখ্যাতাগণ এ বিষয়ে পেরেশান। এ বিষয়ে সবচেয়ে উত্তম হল হাফিজ ইবনে হাজার (র.)-এর কথা। তিনি বলেন, ইমাম বুখারী বীর্য ঘষে তুলে ফেলার কথা উলে­খ করে ঐ সকল হাদীসের দিকে ইঙ্গিত করেছেন যেগুলো হযরত আয়েশা (রা.) হতে বুখারী শরীফ ব্যতীত অন্যান্য কিতাবে উলে­খ রয়েছে। এর জন্য দ্রষ্টব্য: আবু দাউদ শরীফ খ. ১, পৃ. ৫৩, ইবনে মাজাহ পৃ. ৪১, নাসাঈ ইত্যাদি। তাহলে শিরোনামের বিষয় তিনটিই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়।

বীর্য পবিত্র না অপবিত্র? বীর্য পবিত্র বা অপবিত্র হওয়া সম্পর্কে মতবিরোধ রয়েছে। 

আল্লামা নবভী (র.) বলেন: اختلف العلماء في طهارة مني الآدمي فذهب مالك وابو حنيفة الي نجاسته الخ 

অর্থাৎ মানুষের বীর্য সম্পর্কে ওলামায়ে কেরামের মতবিরোধ রয়েছে:

১. ইমাম আবূ হানীফা, ইমাম মালেক ও ইমাম আবু ইউসুফের মতে যে কোনো বীর্য অপবিত্র। তবে ইমাম আবু হানিফা বলেন, তা পবিত্র করার জন্য فرك খুঁটে তোলাও যথেষ্ট, যদি তা শুকনা হয়। এটিই ইমাম আহমদেরও। কিন্তু ইমাম মালেক (র.)-এর মতে বীর্য যেহেতু নাপাক, তাই এটা কেবল ধৌত করলেই পাক হবে। আঙ্গুল দ্বারা খুঁটে তোলা যথেষ্ট নয়। ইমাম বুখারীর মতও ইহাই যে, বীর্য নাপাক। শিরোনামের غسل المني দ্বারা এটা স্পষ্ট। ইহাই ইমাম আওযায়ী, সুফিয়ান ছওরী প্রমুখসহ জুমহূরের মত।

ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র.)-এর প্রসিদ্ধ ও প্রাধান্য মত হলো পুরুষ মহিলা উভয়ের বীর্য পবিত্র। দাউদে যাহেরীর মতও ইহাই। ইসহাক ও দাউদে যাহেরীও এ মতের প্রবক্তা। তাঁর দ্বিতীয় মত হলো পুরুষ মহিলা উভয়ের বীর্য অপবিত্র। যেমনটি হানাফী ও মালেকীরা বলেন। তৃতীয় উক্তি হলো পুরুষের বীর্য পবিত্র, মহিলার বীর্য অপবিত্র।

শাফেয়ী ও হাম্বলীদের দলীল: বীর্য পাক হওয়ার বিষয়ে ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর দলিল নিম্নরূপ:

১.    কুরআনের আয়াত هو الذي خلق من الماء بشرا এ আয়াতে বীর্যকে পানি বলা হয়েছে। আর বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, পানি পবিত্র। তাই বুঝা গেল বীর্যও পবিত্র।

২.    তাদের দ্বিতীয় দলীল  হলো فرك সম্পর্কিত হাদীসসমূহ। অর্থাৎ যেসব হাদীসে মনি খুঁটে তোলার কথা রয়েছে সেসব হাদীস দ্বারাও ইমাম শাফেয়ী (র.) দলিল পেশ করেন। কেননা মনি যদি নাপাক হতো তাহলে আঙ্গুল দিয়ে খুঁটে তোলা যথেষ্ট হতো না; বরং রক্তের ন্যায় ধৌত করা আবশ্যক হতো। তিনি বলেন, কাপড়ে মনি লাগলে আঙ্গুল দ্বারা খুঁটে তা তুলে ফেলতে হয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য। অতএব, যেসব হাদীসে মনি ধৌত করার কথা রয়েছে, সেগুলোও (তাঁর মতে) পরিচ্ছন্নতার উপরই প্রযোজ্য হবে।

৩.    ইমাম শাফেয়ী (র.) (‘কিতাবুল উম্ম’-এ) একটি যৌক্তিক দলিল পেশ করতে গিয়ে বলেন, যে বীর্য দ্বারা পাক-পবিত্র পুণ্যাত্মা নবী-রাসূলগণকে সূজন করা হয়েছে, সে বীর্যকে আমরা কিরূপে নাপাক বলতে পারি?

হানাফী ও মালেকীদের দলিলসমূহ:

১.    কুরআনে কারীমে বীর্যকে مـاء مـهـيـن ‘নিকৃষ্ট পানি’ বলে উলে­খ করা হয়েছে। এর দ্বারাও তা নাপাক হওয়ার বিষয়টি সমর্থিত হয়।

২.    বাবের হাদীস: যা হযরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত: فَقَالَتْ كُنْتُ أَغْسِلُهُ مِنْ ثَوْبِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم আর বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, যদি বীর্য নাপাক না হতো তাহলে তা ধৌত করার প্রয়োজন ছিল না। তাও আবার সবসময় ধৌত করতেন।

৩.    হযরত আয়েশা (রা.) বলেন: ان رسول الله صلي الله عليه وسلم كا يغسل المني ثم يخرج الي الصلوة (مسلم)

৪.    ‘হযরত মু‘আবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর বোন নবীপতœী হযরত উম্মে হাবীবা (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) যে কাপড়ে স্ত্রীসহবাস করতেন, সে কাপড়ে কি নামায পড়তেন? তিনি বললেন: نعم اذالم ري فيه اذي (ابو داؤد)হ্যাঁ, যখন তাতে কোনো নাপাকি দেখতে না পেতেন।

৫.    উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে হাবীবা (রা.) মনীকে اذي বলে আখ্যায়িত করেছেন। যার অর্থ হলো নাপাকী।

৬.    কিয়াস দ্বারাও হানাফীদের মাসলাক প্রাধান্য পায়। কেননা পেশাব, মযি, ওদি সবই সকলের মতে নাপাক অথচ সেগুলো বের হলে অযু ওয়াজিব হয়। পক্ষান্তরে মনি বের হলে গোসল ওয়াজিব হয়, অতএব তা অবশ্যই নাপাক হবে।

বিরোধীদের দলীলের জবাব:

প্রথম দলীলের জবাব: কুরআনের আয়াত দ্বারা তারা যে দলীল দিয়েছেন তার জবাব হলো যেখানে আল্লাহ তা‘আলা هو الذي خلق من الماء بشرا বলেছেন, তদ্রƒপ আল্লাহ এও বলেছেন: والله خلق كل دابة من ماء আল্লাহ তা‘ালা সকল প্রাণীকে পানি (বীর্য) দ্বারা সৃষ্টি করেছেন।

সুতরাং বীর্যকে পান  বলার কারণে যদি তা পবিত্র হওয়া বুঝে আসে তাহলে সকল প্রাণী এমনকি কুকুর, শূকরের মনীও পবিত্র হওয়া আবশ্যক হয। অথচ এগুলি সর্বসম্মতিক্রমে নাপাক। তাই এ দলীলটি তাদের সঠিক হয়নি।

দ্বিতীয় দলীলেল জবাব: আঙ্গুল দ্বারা খুঁটে বীর্য পরিষ্কার করা সম্পর্কিত হাদীসমূহের দ্বারা ইমাম শাফেয়ী (র.) যে বীর্যকে পবিত্র বলেছেন, তাহলে তো মানষের মল-মূত্রকেও পবিত্র বলতে হবে। কেননা, মল-মূত্রের ক্ষেত্রেও তো استجمار তথা পাথর/ঢেলা ইত্যাদি ব্যবহারই যথেষ্ট। যাতে পূর্ণাঙ্গরূপে নাপাকী দূরীভূত হয় না। অথচ মানষের মল-মূত্র সর্বসম্মতিক্রমে নাপাক। মূল কথা হলো নাপাক বস্তু পাক করার বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। কোথাও ধৌত করা জরুরি, কোথাও জরুরি নয়। যেমন রাস্তায় চলার সময় জুতার তলায় নাপাকী লেগে গেলে, তেমনিভাবে আয়না ও তরবারিতে নাপাকী লেগে গেলে তখন শুধুমাত্র মুছে ফেলাই এগুলি পবিত্র হয়ে যাবে। যেমন বর্ণিত হয়েছে: اذا وطئ الاذي بخفيه فطهور هما التراب যদি মোজার নিচে নাপাকী লেগে যায় তাহলে মাটিই তাকে পবিত্র করবে।  তেমনিভাবে নাপাক তুলা ধুনলেই তা পাক হয়ে যায় এবং নাপাক জমিন শুকালেই পাক হয়ে যায়। অনুরূপভাবে মনি বা বীর্য হতে পবিত্রতা অর্জনের এক পদ্ধতি হলো তা খুঁটে তুলে ফেলা তবে শর্ত হলো তা শুকনো হতে হবে।

তৃতীয় দলীলের জবাব: ইমাম শাফেয়ী (র.)-এর তৃতীয় দলিলটি ছিল কিয়াস বা যুক্তিনির্ভর আর তা হলো, পূণ্যাত্মা নবী-রাসূলগণকে যেহেতু বীর্য থেকেই সৃষ্টি করা হয়েছে তাই এটাকে নাপাক বলা চলে না। তাদের এ দলীলের উত্তর হলো এখানে তো আম্বিয়ায়ে কেরামের বীর্য সম্পর্কে আলোচনা চলছেনা; যে বরকতময় বীর্য দ্বারা আম্বিয়ায়ে কেরাম জন্মগ্রহণ করেছেন তাকে সাধারণ মানুষের বীর্যের ন্যায় নাপাক না বলা হয়ে আমাদেও কোনো আপত্তি নেই। আমাদের আলোচনা তো হলো উম্মতের বীর্য সম্পর্কে।

অথবা বলা যায় যে, যে বীর্য দ্বারা আবু জাহল, ফেরাউন ইত্যাদিকে সৃষ্টি করা হয়েছে তাকে আমরা কিভাবে পবিত্র বলতে পারি? অথচ তারা হলো জাহান্নামী।


কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.