Header Ads

সহীহ বুখারীঃ কিতাবুল অযুঃ ঘুমের কারণে অযুর বর্ণনা

بَابُ الْوُضُوءِ مِنَ النَّوْمِ وَمَنْ لَمْ يَرَ مِنَ النَّعْسَةِ وَالنَّعْسَتَيْنِ أَوِ الْخَفْقَةِ وُضُوءًا

পরিচ্ছেদ: ঘুমের কারণে অযুর বর্ণনা। আর যারা দু’একবার তন্দ্রার কারণে কিংবা ঘুমের একবার ঝাকুনির কারণে অযু ওয়াজিব মনে করেন না, সে প্রসঙ্গে আলোচনা

পূর্বের সাথে যোগসূত্র: উভয় বাবের মধ্যে যোগসূত্র স্পষ্ট, তা হলো উভয় বাবই অযুর বিধিবিধান সম্পর্কিত।

বাবের উদ্দেশ্য: এ বাব দ্বারা ইমাম বুখারীর উদ্দেশ্য হলো এটা বর্ণনা করা যে, নিদ্রা না-তো নিঃশর্তভাবে অযু ভঙ্গকারী আর না-তো অযু অ-ভঙ্গকারী। সুতরাং এক্ষেত্রে ইমাম বুখারী জুমহূরের অনুকূলে রয়েছেন। যার বিস্তারিত আলোচনা ব্যাখ্যায় আসছে।

حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنْ هِشَامٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ "‏ إِذَا نَعَسَ أَحَدُكُمْ وَهُوَ يُصَلِّي فَلْيَرْقُدْ حَتَّى يَذْهَبَ عَنْهُ النَّوْمُ، فَإِنَّ أَحَدَكُمْ إِذَا صَلَّى وَهُوَ نَاعِسٌ لاَ يَدْرِي لَعَلَّهُ يَسْتَغْفِرُ فَيَسُبَّ نَفْسَهُ ‏"‏‏.‏

অনুবাদ: উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, যখন তোমাদের কেউ নামায আদায়রত অবস্থায় ঝিমাতে থাকবে, তখন যেন সে পুরোপুরি ঘুমিয়ে নেয়। কেননা ঝিমানো অবস্থায় নামায আদায় করতে থাকলে সে জানতে পারবে না যে সে মাগফিরাত চাচ্ছে, না নিজের জন্যে বদদোয়া করছে।

হাদীসের সামঞ্জস্য: শিরোনামের সাথে এ হাদীসের অর্থ ও উদ্দেশ্যের সাথে মিল রয়েছে। শিরোনামের দুটি অংশ রয়েছে। ১. ঘুমের কারণে অযু করা। ২. তন্দ্রার কারণে অযু না করা। অর্থাৎ ঘুম অযু ভঙ্গকারী, আর তন্দ্র অযু ভঙ্গকারী নয়। কারণ হাদীসে রয়েছে:اذا صلي وهو ناعس অর্থাৎ তন্দ্রাবস্থায় নামায পড়া হতে নিষেধ করা হয়েছে। এর দ্বারা বুঝা যায় তন্দ্রা দ্বারা অযু ভঙ্গ হয় না। তাই তো এ অবস্থায় নামায পড়া থেকে নিষেধ করা হয়েছে। আর এ নিষেধের কারণও বলা হয়েছে যে, তন্দ্রারত ব্যক্তি নিজের জন্য দোয়া করতে চাইবে; কিন্তু তন্দ্রার কারণে উল্টো নিজের জন্য বদদোয়া করে বসবে। তন্দ্রা যদি অযু ভঙ্গের কারণ হতো তা হলে নবী করীম (সা.) এরূপ বলতেন যে, তোমাদের কেউ নামাজে তন্দ্রা গেলে অযু ভঙ্গ হয়ে যাবে।

হাদীসের উদ্ধৃতি: হাদীসটি বুখারী শরীফে ৩২ পৃষ্ঠায় এবং মুসলিম শরীফে ২৬৭, আবু দাউদ শরীফে ১৮৬, নাসাঈ শরীফে ২০ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে।

حَدَّثَنَا أَبُو مَعْمَرٍ، قَالَ حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَارِثِ، حَدَّثَنَا أَيُّوبُ، عَنْ أَبِي قِلاَبَةَ، عَنْ أَنَسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ "‏ إِذَا نَعَسَ أَحَدُكُمْ فِي الصَّلاَةِ فَلْيَنَمْ حَتَّى يَعْلَمَ مَا يَقْرَأُ ‏"‏‏.‏

অনুবাদ: হযরত আনাস (রা.) বলেন, নবী (সা.) বলেছেন, যখন তোমাদের কেউ নামাযের মধ্যে ঝিমাতে থাকে, তখন যেন সে ঘুমিয়ে নেয়, যাতে (পরবর্তিতে যখন সে নামায পড়বে) তখন সে বুঝতে পারে যে, সে নামাযের মধ্যে কি পড়ছে।

হাদীসের সামঞ্জস্য: শিরোনামের সাথে হাদীসের সামঞ্জস্য "‏ إِذَا نَعَسَ أَحَدُكُمْ فِي الصَّلاَةِ -এর সাথে।

ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ

ঘুমের দ্বারা অযু নষ্ট হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লামা নবভী (র.) ৮টি এবং আল্লামা আইনী (র.) ৯ টি উক্তি বর্ণনা করেছেন।

কিন্তু এ মতবিরোধগুলি শরীরের অঙ্গের বন্ধন শিথীলতার উপর নির্ভর করে। এটিই হলো ইমামচতুষ্টয় ও জুমহূরের মাযহাব।

এ মত পোষণকারীরা সকলেই এ বিষয়ে একমত যে, ঘুম সত্তাগতভাবে অযু ভঙ্গকারী কোনো বিষয় নয়; বরং ঘুমালে বায়ু নির্গত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে বিধায় ঘুমকে অযুভঙ্গকারী বলা হয়। কিন্তু এই যে বায়ু নির্গত হওয়ার সম্ভাবনা, এটা হালকা ঘুমের দ্বারা সৃষ্টি হয় না। তাই এ মত অবলম্বন করা হয়েছে যে, হালকা ঘুমের দ্বারা অযু ভাঙ্গে না। কিন্তু গভীর নিদ্রা অর্থাৎ, এরূপ নিদ্রা যার দ্বারা মানুষ একেবারে চেতনাহীন হয়ে পড়ে এবং তার শরীরের বন্ধনগুলো শিথিল হয়ে যায়, তা অবশ্যই অযু ভঙ্গকারী। ঘুমন্ত অবস্থায় বায়ু নির্গত হওয়ার বিষয়টি যেহেতু জানা যায় না তাই শরীরের বন্ধনগুলোর শিথিলতাকে বায়ু নির্গত হওয়ার স্থলাভিষিক্ত করে দেওয়া হয়েছে। যেমন তিরমিযী শরীফের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:  اذا اضـطـجـع اسـتـرخـت مـفـاصلـه এর দ্বারাও বুঝা যায় যে, অযু ভাঙ্গার হুকুমটি মূলত দেহ বন্ধন শিথিল হয়ে যাওয়ার উপরই নির্ভরশীল। অতএব কারো দেহবন্ধনগুলো শিথিল হলে অযু নষ্ট হয়ে যাবে, যদিও বায়ু নির্গত না হওয়ার ব্যাপারে তার দৃঢ় বিশ্বাস থাকে। যেমন নামায কসর করার হুকুমের ক্ষেত্রে সফরকে কষ্টক্লেশের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে।

দেহ বন্ধন শিথিল হওয়া ও নিদ্রা গভীর হওয়ার পরিসীমা কি এ নিয়ে ইমামগণের মাঝে মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাফেয়ী (র.) বলেছেন, জমিন থেকে নিতম্ব সরে যাওয়া, দেহ বন্ধন শিথিল হওয়ার আলামত বা লক্ষণ। অতএব, তাঁর মতে জমিন থেকে নিতম্ব সরে যাওয়ার শর্তে যে কোনো প্রকার ঘুমই অযু ভঙ্গকারী। হানাফীগণের পছন্দনীয় মত এই যে, ঘুম যদি নামাযের আকৃতিতে হয়, তাহলে এর দ্বারা দেহ বন্ধন শিথিল হয় না। অতএব, নামাযের আকৃতিতে থাকা অবস্থায় ঘুম অর্থাৎ কিয়াম, রুকু, সেজদা ইত্যাদি অবস্থার ঘুম অযু ভঙ্গকারী নয়। আর যদি নামাযের আকৃতি ছাড়া অন্য কোনো আকৃতিতে ঘুমানো হয়, তাহলে দেখতে হবে জমিনের উপর তার নির্ভরশীলতা আছে কিনা? যদি জমিনের উপর নির্ভরশীলতা অবশিষ্ট থাকে অর্থাৎ জমিনের উপর ভর ফেলে দেহের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে বসে বসে ঘুমিয়ে থাকে, তাহলে তা দ্বারা অযু নষ্ট হবে না। পক্ষান্তরে যদি দেহের নিয়ন্ত্রণ অবস্থাটি অবশিষ্ট না থাকে অর্থাৎ নিতম্ব জমিনের সাথে মজবুতভাবে লেগে না থাকে, তাহলে অযু নষ্ট হয়ে যাবে। যেমন, চিৎ হয়ে, কাত হয়ে অথবা উপুর হয়ে শুয়ে ঘুমালে অযু নষ্ট হয়ে যায়। অনুরূপভাবে যদি কেউ কোনো বস্তুর উপর হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে যায় এবং ঘুম এতটুকু প্রবল হুয়ে পড়ে যে, হেলান দেওয়ার বস্তুটি সরালে সে পড়ে যাবে তাহলেও তার অযু নষ্ট হবে। কারণ, পড়ে যাওয়ার কারণে বুঝা গেল তার আত্মনিয়ন্ত্রণ অবশিষ্ট ছিল না।

হযরত গাংগুহী র.:এর মত: হযরত রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী (র.) বলেন: ঘুম অযু ভঙ্গকারী হওয়া না হওয়ার বিষয়টি দেহবন্ধন শিথিল হওয়ার উপর নির্ভরশীল, তাই ওলামায়ে কেরাম দেহ বন্ধন শিথিল হওয়ার কিছু আলামত বা লক্ষণ নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু দেহবন্ধ মিথিল হওয়ার বিষয়টি কালক্রমে মানুষের দৈহিক পরিবর্তনের কারণে পরিবর্তন হতে থাকে। তাই এর আলামতও পরিবর্তন হবে অবশ্যই।

অতএব, বর্তমানে হানাফীগণের জন্য স্বীয় মাযহাব মোতাবেক এই বলে একগুঁয়েমি করা ঠিক হবে না যে, নামাযের আকৃতিতে ঘুমালে অযু যায় না। কারণ, বর্তমানে (মানুষের স্বাস্থ্যগত দুর্বলতার কারণে) নামাযের আকৃতিতে থাকা অবস্থায়ও দেহবন্ধন শিথিল হয়ে যায়। কেননা অনেক সময় দেখা যায় নামাযের আকৃতিতে ঘুমানো অবস্থায়ও অযু ভেঙ্গে যায়, কিন্তু যে ব্যক্তি ঘুমাচ্ছে সে তা অনুভবও করতে সক্ষম হয় না। : কাওকাবুদ্দুররী খ. ১, পৃ. ৫০


কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.