Header Ads

সহীহ বুখারীঃ কিতাবুল অযুঃ নামাযী ব্যক্তির পিঠে কোনো নাপাক বস্তু

باب إِذَا أُلْقِيَ عَلَى ظَهْرِ الْمُصَلِّي قَذَرٌ أَوْ جِيفَةٌ لَمْ تَفْسُدْ عَلَيْهِ صَلاَتُهُ

পরিচ্ছেদ: নামাযী ব্যক্তির পিঠে কোনো নাপাক বস্তু কিংবা মৃত প্রাণী রেখে দিলে তার নামায ফাসেদ হবে না।

وَكَانَ ابْنُ عُمَرَ إِذَا رَأَى فِي ثَوْبِهِ دَمًا وَهُوَ يُصَلِّي وَضَعَهُ وَمَضَى فِي صَلاَتِهِ وقال ابن المسيب والشعبي اذا صلي وفي ثوبه دم او جنابة او لغير القبلة او تيمم فصلي ثم  ادرك الماء في وقته لا يعيد

ইবনে ওমর (রা.) নামাযরত অবস্থায় কাপড়ে রক্ত দেখলে কাপড় রেখে দিতেন এবং নামায পড়ে যেতেন। ইবনুল মুসাইয়িব ও শা’বী বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি এমতাবস্থায় নামায আদায় করছে যে, তার কাপড় বা শরীরে রক্ত বা নাপাকী থাকে অথবা সে কিবলা ব্যতীত অন্য দিকে মুখ করে নামায পড়ে বা এমন হয় যে, সে তায়াম্মুম করে নামায পড়ল এবং নামায শেষে ওয়াক্তের মধ্যেই পানি পেল, তাহলে তার নামায পুনরায় পড়তে হবে না।

পূর্বের সাথে যোগসূত্র: উভয় বাবের মধ্যে সামঞ্জস্য এভাবে যে, পূর্বের বাবে পানিতে নাপাকী পড়ার কথা উলে­খ রয়েছে। আর এ বাবে নামাযরত ব্যক্তির উপর নাপাকী পড়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ নাপাকী লাগার বিষয়ে উভয় বাবই যৌথ।

বাবের উদ্দেশ্য: এ বাব দ্বারা ইমাম বুখারীর উদ্দেশ্য হলো এটা বর্ণনা করা যে, যেসব বিষয় নিয়ে নামায শুরু করা জায়েয নয় নামাযরত অবস্থায় সেগুলোর সম্মুখীন হলে তা দ্বারা নামায ফাসেদ হবে না। ইবনে হাজার আসকালানীও প্রায় একই কথা বলেছেন। অর্থাৎ নামায শুরু করা ও নামায বহাল থাকার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ইমাম বুখারীর ঝোঁক সেদিকেই মনে হচ্ছে। 

حَدَّثَنَا عَبْدَانُ، قَالَ أَخْبَرَنِي أَبِي، عَنْ شُعْبَةَ، عَنْ أَبِي إِسْحَاقَ، عَنْ عَمْرِو بْنِ مَيْمُونٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ بَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم سَاجِدٌ ح قَالَ وَحَدَّثَنِي أَحْمَدُ بْنُ عُثْمَانَ قَالَ حَدَّثَنَا شُرَيْحُ بْنُ مَسْلَمَةَ قَالَ حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ يُوسُفَ عَنْ أَبِيهِ عَنْ أَبِي إِسْحَاقَ قَالَ حَدَّثَنِي عَمْرُو بْنُ مَيْمُونٍ أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ مَسْعُودٍ حَدَّثَهُ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم كَانَ يُصَلِّي عِنْدَ الْبَيْتِ، وَأَبُو جَهْلٍ وَأَصْحَابٌ لَهُ جُلُوسٌ، إِذْ قَالَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ أَيُّكُمْ يَجِيءُ بِسَلَى جَزُورِ بَنِي فُلاَنٍ فَيَضَعُهُ عَلَى ظَهْرِ مُحَمَّدٍ إِذَا سَجَدَ فَانْبَعَثَ أَشْقَى الْقَوْمِ فَجَاءَ بِهِ، فَنَظَرَ حَتَّى إِذَا سَجَدَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم وَضَعَهُ عَلَى ظَهْرِهِ بَيْنَ كَتِفَيْهِ وَأَنَا أَنْظُرُ، لاَ أُغَيِّرُ شَيْئًا، لَوْ كَانَ لِي مَنْعَةٌ‏.‏ قَالَ فَجَعَلُوا يَضْحَكُونَ وَيُحِيلُ بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ، وَرَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم سَاجِدٌ لاَ يَرْفَعُ رَأْسَهُ، حَتَّى جَاءَتْهُ فَاطِمَةُ، فَطَرَحَتْ عَنْ ظَهْرِهِ، فَرَفَعَ رَأْسَهُ ثُمَّ قَالَ ‏"‏ اللَّهُمَّ عَلَيْكَ بِقُرَيْشٍ ‏"‏‏.‏ ثَلاَثَ مَرَّاتٍ، فَشَقَّ عَلَيْهِمْ إِذْ دَعَا عَلَيْهِمْ ـ قَالَ وَكَانُوا يُرَوْنَ أَنَّ الدَّعْوَةَ فِي ذَلِكَ الْبَلَدِ مُسْتَجَابَةٌ ـ ثُمَّ سَمَّى ‏"‏ اللَّهُمَّ عَلَيْكَ بِأَبِي جَهْلٍ، وَعَلَيْكَ بِعُتْبَةَ بْنِ رَبِيعَةَ، وَشَيْبَةَ بْنِ رَبِيعَةَ، وَالْوَلِيدِ بْنِ عُتْبَةَ، وَأُمَيَّةَ بْنِ خَلَفٍ، وَعُقْبَةَ بْنِ أَبِي مُعَيْطٍ ‏"‏‏.‏ وَعَدَّ السَّابِعَ فَلَمْ يَحْفَظْهُ قَالَ فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَقَدْ رَأَيْتُ الَّذِينَ عَدَّ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم صَرْعَى فِي الْقَلِيبِ قَلِيبِ بَدْرٍ‏.‏

অনুবাদ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাস'উদ (রা.) বলেন, আল্লাহর নবী (সা.) কা'বার কাছে নামায আদায় করছিলেন এবং আবু জেহেল ও তার কয়েকজন সাথী সেখানে বসেছিল। এমন সময় তাদের মধ্যে থেকে একজন বললো, তোমাদের মধ্যে থেকে কে উমুক গোত্রের উটের নাড়ি-ভুঁড়ি এনে মুহাম্মাদ যখন সিজদায় যাবে তার পিঠের ওপর রেখে দিতে পারে? এরপর তাদের মধ্যে থেকে সবচাইতে বড় পাষণ্ডটি উঠে গিয়ে তা এনে অপেক্ষায় রইলো। আল্লাহর নবী (সা.) যখন সিজদায় গেলেন, তখন সেই পাষণ্ড সেটি তাঁর দুই কাঁধের মধ্যখানে পিঠের ওপর রেখে দিল। আমি তা দেখছিলাম। কিন্তু আমার করার কিছু ছিল না। হায় আমার যদি কিছু করার শক্তি থাকতো! তিনি বলেন, তারা হাসতে লাগলো এবং একে অপরের ওপর দোষ চাপাতে লাগলো। আল্লাহর রাসূল (সা.) সিজদায় ছিলেন, তিনি মাথা তুলতে পারছিলেন না। এমন সময় ফাতিমা (রা.) এসে তা তাঁর পিঠ থেকে সরালে তিনি মাথা তুলে তিনবার বললেন, হে আল্লাহ! তুমি কুরাইশদের গ্রেফতার করো। এই বদদোয়ায় তারা মনে আঘাত পেল। কারণ এই শহরে দোয়া কবুল হয়। তারপর তিনি নাম ধরে বদদোয়া করলেন, হে আল্লাহ! তুমি আবু জেহেল, উতবা ইবনে রবীয়া, শাইবা ইবনে রবীয়া, অলীদ ইবনে উতবা, উমাইয়া ইবনে খালফ এবং উকবা ইবনে আবি মুয়ীতকে গ্রেফতার করো। তিনি সাতজন লোকের নাম করেছিলেন, কিন্তু বর্ণনাকারী তা ভুলে গেছেন। আব্দুল্লাহ বলেন, সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার জীবন, আল্লাহর রাসূল (সা.) যে সকল লোকের না নিয়েছিলেন, আমি তাদের প্রত্যেককে বদরের অন্ধকার ক‚পে পড়ে থাকতে দেখেছি।

হাদীসের সামঞ্জস্য: শিরোনামের সাথে হাদীসের সামঞ্জস্য حَتَّى إِذَا سَجَدَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم وَضَعَهُ عَلَى ظَهْرِهِ بَيْنَ كَتِفَيْهِ -এর সাথে।

হাদীসের পুনরাবৃত্তি: হাদীসটি বুখারী শরীফে ৩৭-৩৮, ৭৪, ৪১১, ৪৫২, ৫৪৩-৫৪৪, ৫৬৫ পৃষ্ঠায় এবং মুসলিম ও নাসাঈ শরীফে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে।

ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ

ইমাম বুখারীর উদ্দেশ্য পূর্বে উলি­খিত বাবের উদ্দেশ্যের বর্ণনা দ্বারা বুঝা গেছে যে, নামায শুরু করা এবং নামায বহাল রাখার হুকুমের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ নামাযের মধ্যে যদি নাপাকী লেগে যায় তাহলে নামায ফাসেদ হবে না। এর সমর্থনে তিনি তিনটি দলীল পেশ করেছেন।

হানাফী ও শাফেয়ীদের মতে নামাযের বিশুদ্ধতার জন্য স্থান, শরীর ও কাপড় পবিত্র হওয়া শর্ত। তা শুরুতে এবং মাঝে সর্বাবস্থায়।

ইমাম বুখারীর দলীল: ইমাম বুখারীর প্রথম দলীল হলো হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-এর আছর। নামাযরত অবস্থায় তিনি কাপড়ে রক্ত দেখলে কাপড় খুলে রেখে দিতেন এবং নামায অব্যাহত রাখতেন। তাই বুঝা গেল নামাযের শুরু এবং নামায চলাকালীন আহকামের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কারণ, ইবনে ওমর (রা.) নামায ভঙ্গ করতেন না, জারী রাখতেন।

উত্তর: এ দলীল তার মতের সমর্থনে মোটেই ঠিক নয়। কারণ, এ আছর দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, ইবনে ওমর কাপড় নাপাক থাকা অবস্থায় নামায জায়েয মনে করতেন না। এ কারণেই তিনি কাপড় খুলে ফেলতেন।

ইবনে ওমর (রা.)-এর এ আছরটি বিস্তারিতভাবে মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বায় এভাবে বর্ণিত রয়েছে যে, তিনি যদি নামাযের মাঝে তার কাপড়ে রক্ত দেখতে পেতেন তা হলে যদি তা খুলতে পারতেন তা হলে খুলে ফেলতেন। আর যদি খুলতে নাপারতেন তাহলে নামায হতে বের হয়ে এসে তা ধুয়ে নিয়ে বাকী নামায আদায় করতেন।

ইমাম বুখারীর দলীল এ কারণে সহীহ নয় যে, ইবনে ওমর (রা.)-এর নিকট যদি নামাযের শুরু এবং নামায চলাকালীন অবস্থার মধ্যে পার্থক্য হতো তা হলে নামায ছেড়ে এসে কাপড় ধৌত করতেন কেন?

দ্বিতীয় দলীল: ইমাম বুখারীর দ্বিতীয় হলো ইবনুল মুসাইয়িব ও শা’বীর উক্তি। তারা বলেন যদি কোনো ব্যক্তি এমতাবস্থায় নামায আদায় করছে যে, তার কাপড় বা শরীরে রক্ত বা নাপাকী থাকে অথবা সে কিবলা ব্যতীত অন্য দিকে মুখ করে নামায পড়ে বা এমন হয় যে, সে তায়াম্মুম করে নামায পড়ল এবং নামায শেষে ওয়াক্তের মধ্যেই পানি পেল, তাহলে তার নামায পুনরায় পড়তে হবে না।

তাঁর দলীল এভাবে যে, দেখুন! যদি কাপড়ে রক্ত কিংবা বীর্য লেগে থাকাটা আগে থেকেই জানা থাকে তা হলে এমন কপড় নিয়ে নামায শুরু করা জায়েয ছিল না। কিন্তু যদি নামায শুরু করার পর নামাযের মধ্যে জানা যায় তা হলে তা জায়েয মনে করে নামাযকে সহী ধরা হয়।

উত্তর: রক্ত বা বীর্যের পরিমাণ কম হলে আমাদের মতেও পুনরায় নামায পড়ার প্রয়োজন নেই। কারণ সামান্য পরিমাণ ক্ষমারযোগ্য। আর ক্ষমার পরিমাণ হতে বেশি হলে নামায পুনরায় পড়া ওয়াজিব। শাফেয়ীদের মতে সাবিলাইন তথা মল-মূত্রদ্বার ব্যতীত অন্য কোনো স্থঅন থেকে নির্গত রক্ত দ্বারা অযু ভঙ্গ হয় না। আর বীর্য তো তাদের মতে নাপাকই নয়।

আর নামায যদি تحري তথা চিন্তা-ভাবনা করে শুরু করা হয় আর নামাযের পর জানা যায় যে, কিবলার দিকে রোখ ছিল না তা হলে আমাদের মতেও নামায পুনরায় পড়া আবশ্যক নয়।

বাকী রইল তায়াম্মুমের মাসআলা। তায়াম্মুম করে নামায আদায় করল। তারপর নামাযের ওয়াক্ত থাকা অবস্থায়ই পানি পাওয়অ গেল। তো এ বিষয়ৈ সবাই একমত যে, এ তায়াম্মুম ছিল পানি না পাওয়া যাওয়অ অবস্থায়। আর নামায পড়ে নেওয়ার পর পানি পাওয়া গেছে। তাই নামায দুরুস্ত হবে। পুনরায়  পড়ার দরকার নেই।

বুঝা গেল ইমাম বুখারী (রা.) যে পার্থক্য বুঝানোর জন্য আছর উপস্থাপন করেছিলেন তা দ্বারা তার  সে আশা পূরণ হয়নি।

তৃতীয় দলীল: এখানে তিনি তৃতীয় দলীল উপস্থাপন করছেন বাবের হাদীস দ্বারা। তা হল নবী করীম (সা.)-এর পিঠে উটের নাড়িভূঁড়ি রাখা হয়েছিল। কিন্তু তিনি নামায পুনরায় পড়েননি।

উত্তর: এর কয়েকটি উত্তর রয়েছে। যথা:

১.    কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে নামাযী ব্যক্তির কাপড় এবং শরীর পাক থাকা জরুরী। তাই এ ‘মুজমাল’ বা অস্পষ্ট ঘটনা দ্বারা তার মুকাবিলা করা যাবে না।

২.    হতে পারে নবী করীম (সা.) নামায পুনরায় পড়েছেন। রেওয়ায়েতে তার উলে­খ নেই। কারণ, রাবীর উদ্দেশ্য হলো শুধুমাত্র ঘটনার বিবরণ দেওয়া: মাসআলা বর্ণনা করা তার উদ্দেশ্য নয়। আর এমনও হতে পারে যে, নবীজী (সা.) ঘরে গিয়ে নামায পুনরায় পড়েছেন। এ সমূহ সম্ভাবনা থাকার কারণে এ হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করা যাবে না।

৩.    এমনও হতে পারে যে, নবী করীম (সা.) আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকার কারণে বুঝতেই পারেননি যে, তার পিঠে কিছু ছিল। এবং এ মগ্নতার কারণে তিনি সিজদার মধ্যে দীর্ঘক্ষণ ছিলেন।

৪.    আর তার পিঠে বোঝা বুঝতে পারলেও এমন হতে পারে যে, তা যে নাপাক ছিল তা তিনি জানতে পারেননি।

৫.    শাফেয়ীরা তো বলবেন যে, নামায নফল ছিল। তাই পুনরায় পড়ার প্রয়োজন হয়নি।

মোটকথা, ইমাম বুখারী এ দলীল এনেও তার উদ্দেশ্যে সফলকাম হতে পারেননি।


কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.