Header Ads

সহীহ বুখারীঃ কিতাবুল অযুঃ অযুসহ রাত্রিযাপন করার ফযীলত প্রসঙ্গে

باب فَضْلِ مَنْ بَاتَ عَلَى الْوُضُوءِ

পরিচ্ছেদ: অযুসহ রাত্রিযাপন করার ফযীলত প্রসঙ্গে

যোগসূত্র: উভয় বাবের মধ্যে এ হিসেবে মিল রয়েছে যে, উভয় বাবই ফযীলত এবং ছওয়াব সম্পর্কিত এবং উভয় বাব অযু সম্পর্কিত। অর্থাৎ পূর্বের বাবে মিসওয়াকের মাধ্যমে সওয়াব অর্জনের বর্ণনা করা হয়েছে। আর এ বাবেও ঘুমের সময় অযু সহকারে থেকে বিরাট ছওয়াব অর্জন করার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ مُقَاتِلٍ، قَالَ أَخْبَرَنَا عَبْدُ اللَّهِ، قَالَ أَخْبَرَنَا سُفْيَانُ، عَنْ مَنْصُورٍ، عَنْ سَعْدِ بْنِ عُبَيْدَةَ، عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ، قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏"‏ إِذَا أَتَيْتَ مَضْجَعَكَ فَتَوَضَّأْ وُضُوءَكَ لِلصَّلاَةِ، ثُمَّ اضْطَجِعْ عَلَى شِقِّكَ الأَيْمَنِ، ثُمَّ قُلِ اللَّهُمَّ أَسْلَمْتُ وَجْهِي إِلَيْكَ، وَفَوَّضْتُ أَمْرِي إِلَيْكَ، وَأَلْجَأْتُ ظَهْرِي إِلَيْكَ، رَغْبَةً وَرَهْبَةً إِلَيْكَ، لاَ مَلْجَأَ وَلاَ مَنْجَا مِنْكَ إِلاَّ إِلَيْكَ، اللَّهُمَّ آمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِي أَنْزَلْتَ، وَبِنَبِيِّكَ الَّذِي أَرْسَلْتَ‏.‏ فَإِنْ مُتَّ مِنْ لَيْلَتِكَ فَأَنْتَ عَلَى الْفِطْرَةِ، وَاجْعَلْهُنَّ آخِرَ مَا تَتَكَلَّمُ بِهِ ‏"‏‏.‏ قَالَ فَرَدَّدْتُهَا عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَلَمَّا بَلَغْتُ ‏"‏ اللَّهُمَّ آمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِي أَنْزَلْتَ ‏"‏‏.‏ قُلْتُ وَرَسُولِكَ‏.‏ قَالَ ‏"‏ لاَ، وَنَبِيِّكَ الَّذِي أَرْسَلْتَ ‏"‏‏.‏

অনুবাদ: হযরত বারা ইবনে আযিব (রা.) বলেন, আল্লাহর নবী (সা.) আমাকে বললেন, তুমি বিছানায় যাবার সময় নামাযের অযুর মত করবে। তারপর ডান কাত হয়ে শুয়ে বলবে, হে আল্লাহ! আমি ঝুঁকিয়ে দিলাম আমার মুখমণ্ডল তোমার দিকে। ন্যস্ত করলাম আমার বিষয় তোমার কাছে। আমি তোমাকে নিজের পৃষ্ঠপোষক করলাম: তোমার প্রতি আশা ও ভয় রেখে তুমি ব্যতীত কোনো আশ্রয় ও কোনো মুক্তি নেই। হে আল্লাহ! আমি তোমার অবতীর্ণ গ্রন্থের প্রতি ঈমান রাখি এবং (ঈমান রাখি) তোমার নবীর প্রতি, যাকে তুমি প্রেরণ করেছো। যদি তুমি এই দো'আ পড়ার পর এই রাতে ইন্তেকাল করো, তাহলে ঈমানের ওপর ইন্তেকাল করে। এই কথাগুলোকে (অর্থাৎ এই দো'আকে) তোমার রাতের সর্বশেষ কথায় পরিণত করো। বারা বলেন, আমি আল্লাহর নবী (সা.)-এর কাছে এই কথাগুলো পুনরাবৃত্তি করি। যখন আমি اللَّهُمَّ آمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِي أَنْزَلْتَ  পর্যন্ত পৌঁছলাম, তখন বললাম وَرَسُولِكَ‏ তিনি বললেন, না; বরং বলো  وَنَبِيِّكَ الَّذِي أَرْسَلْتَ

হাদীসের সামঞ্জস্য: শিরোনামের সাথে হাদীসের সামঞ্জস্য فَتَوَضَّأْ وُضُوءَكَ لِلصَّلاَةِ -এর সাথে।

হাদীসের পুনরাবৃত্তি: হাদীসটি বুখারী শরীফে ৩৮, ৯৩৩-৯৩৪, ৯৩৪, ৯৩৪, ৯৩৪, ১১১৫-১১১৬, পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে।

বাবের উদ্দেশ্য: শায়খুল হাদীস যাকারিয়া (র.) বলেন,এর দ্বারা ইমাম বুখারী বাবের হাদীসটির দু ধরনের ব্যাখ্যা করেছেন।

রেওয়ায়েতে আছে:اذا اتيت مضجعك فتوضأ وضوءك للصلوة الخ এ রেওয়ায়েতে বর্ণিত اذا দ্বারা ধারাণা হতে পারে যে, যখনই শোয়ার ইচ্ছা করবে, এমনকি পূর্বে অযু অবস্থায় থাকলেও  অযু করতে হবে। সুতরাং শিরোনামে من بات علي الوضوء বৃদ্ধি করে ব্যাখ্যা করে দিলেন যে, উদ্দেশ্য হলো অযু সহকারে ঘুমানো: চাই পূর্ব হতেই অযু থাকুক বা ঐ সময় অযু করে নিবে। মোটকথা ঘুমের সময় অযু থাকা চাই।

হাদীস শরীফে فتوضأ শব্দটি امر-এর সীগাহ। আর امر ওয়াজিব বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। তাই এর দ্বারা ঘুমানোর সময় অযু করা ওয়াজিব হওয়া বুঝা যায়। ইমাম বুখারী শিরোনামে فضل শব্দটি বৃদ্ধি করে জানিয়ে দিলেন  যে, এ امر-টি ওয়াজিবের জন্য; বরং তা মুস্তাহাব ফযীলতের জন্য। : তাকরীরে বুখারী

ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ

হযরত বারা বিন আযেব (রা.) বলেন, নবী করীম (সা.) আমাকে বলেছেন যখন তুমি শয়ন করার স্থানে আসবে তখন নামাযের অযুর ন্যায় অযু করতে হবে। অর্থাৎ শাব্দিক অযু তথা শুধুমাত্র কুলি করা বা হাত, মুখ ধৌত করলে এ ফযীলত আদায় হবে না। অযু অবস্থায় ডান দিকে কাত শয়ন করতে হবে। নবীগণও এ ভাবেই শয়ন করতেন। কারণ ডানদিককে প্রাধান্য দেওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে পছন্দনীয় কাজ। যদিও বাম দিকে কাত হয়ে ঘুমানোকে চিকিৎসাশাস্ত্রে উত্তম বলা হয়েছে। কারণ, বাম কাত হয়ে শয়ন করলে নিদ্রা গভীর হয়, খাবারও উত্তমরূপে হজম হয়। স্বাস্থ্য এবং সুস্থতার ক্ষেত্রে উপকারী; কিন্তু শরীয়তে অধিক আহার করা কাম্য নয়। কারণ অধিক আহারের ফলে নিদ্রা এবং অলসতা বৃদ্ধি পায়। পক্ষান্তরে ডান কাত হয়ে শয়ন করলে হৃদয়  ঝুলে থাকে; হৃদয়ের উপর বোঝা পড়েনা। কিন্তু প্রয়োজনে বাম পার্শ্বে ফিরে শয়ন করাও জায়েয আছে। শুধুমাত্র উপুড় হয়ে শয়ন করা জাহান্নামীদের নিয়ম বিধায় তা পরিহার করা চাই।

আবু দাউদ শরীফের এক রেওয়ায়েতে আছে, নবীগণ চিত হয়ে শয়ন করতেন। উভয় হাদীসের মধ্যে সমন্বয় করা যায় এভাবে যে, শেয়ার সময় আবু দাউদ শরীফ রেওয়ায়েত অনুযায়ী প্রথমে চিত হয়ে শয়ন করতেন, অতঃপর বুখারী শরীফের রেওয়ায়েত অনুযায়ী ডান দিক কাত হয়ে শয়ন করতেন এবং দোয়া মাছুরা পড়তেন।

দোয়া মাছুরার শব্দালীর গুরুত্ব: হযরত বারা বিন আযিব (রা.) বলেন, আমি এ দোয়াকে নবী করীম (সা.)-এর সামনে মুখস্থ করার জন্য পুনরাবৃত্তি করছিলাম। যখন اللهم آمنت بكتبك الذي انزلت পর্যন্ত পৌঁছলাম, তারপর আমি ونبيك-এর স্থলে ورسولك বলে দিলাম। কেননা নবীর চেয়ে রাসুলের মর্যাদা বড়। তখন নবী করীম (সা.) বললেন: لا ونبيك الذي ارسلت  এর দ্বারা বুঝা গেল যে, নবী করীম (সা.) হতে দোয়ার শব্দসমূহ যেভাবে বর্ণিত রয়েছে সেভাবেই পড়া উচিত। পরিবর্তন করা ঠিক হবে না; যদিও পরিবর্তিত শব্দ শ্রæতিমধুর এবং হৃদয়গ্রাহী হয়। অধিকাংশ আলেমের মতে এ হাদীসের উদ্দেশ্য হলো দোয়ায়ে মাছুরা এবং আযকারসমূহের অর্থের মতই শব্দসমূহেরও সংরক্ষণ করা আবশ্যক। কারণ, এ শব্দগুলোর মধ্যে বিশেষ রবকত এবং প্রভাব থাকে। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা হরূফসমূহের মধ্যে বিশেষ বৈশিষ্ট্য রেখেছেন। শাইখ আকবার (র.) ফতুহাত গ্রন্থে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি সেখানে বলেছেন যে, কতক হরফ حار (উষ্ণ) কতক হরফ بارد(শীতল) তেমনিভাবে কতকের মধ্যে রয়েছে আর্দ্রতা আবার কতকের মধ্যে রয়েছে শুষ্কতা। তেমনিভাবে কয়েকটি হরফের বিন্যাস ও সংমিশ্রণে একপ্রকার প্রভাব পাওয়া যায়। সুতরাং দোয়ার বাক্যসমূহ নবী করীম (সা.) হতে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে তাকে সেভাবেই পাঠ করা উচিত। তাতে কোনো প্রকার রদ-বদল, হ্রাস-বৃদ্ধি, সংজোযন-সঙ্কোচন করা কাম্য নয়। কেননা, এর ফলে এ দোয়ার বিশেষ তাছীর অবশিষ্ট থাকে না। এর দৃষ্টান্ত তালার চাবির ন্যায়। যাতে বিশেষ কতগুলি দাঁত থাকে, যা দ্বারা তালা খোলে। এখন যদি চাবির দাঁত কমবেশি হয়ে যায়, বা বড় ছোট হয়ে যায় তাহলে ঐ চাবি দ্বারা ঐ তালা কখনো খুলবে না।

আজানের শব্দের মধ্যে কিছু বৃদ্ধি করা হয়। যেমন:آت محمد الوسيلة و الفضيلة-এর পরে والدرجة الرفيعة শব্দ বৃদ্ধি করা হয়। এ সম্পর্কে মাওলানা খলীল আহমদ সাহারানপুরী বযলুল মাজহুদ গ্রন্থে আল্লামা সাখাবীর বরাতে উলে­খ করেছেন:لم اره في شئ من الروايات ‘এ বাক্যগুলি আমি কোনো রেওয়ায়েতেই পাইনি।’

তেমনিভাবে ফরজ নামাযের পর পঠিত দোয়া:اللهم انت السلام ومنك السلام تباركت يا ذا الجلال والاكرام-এর মধ্যে منك السلام-এর পরে যে, واليك يرجع السلام حينا ربنا بالسلام وادخلنا الجنة دار السلام  বৃদ্ধি করা হয়, এরও কোনো ভিত্তি নেই। শাইখ জাযারী তাসহীহুল মাসাবীহ গ্রন্থে বলেন: اما ما يزاد بعد قوله ومنك السلام ...... دار السلام فلا اصل له بل مختلق بعض القصاص অর্থাৎ বৃদ্ধির কোনো ভিত্তি নেই; বরং এটা হলো কোনো বক্তা বা খতীবের মনগড়া শব্দ। যা পরিহার করা উচিত।

কিতাবুল অযুর শুরুর সাথে শেষের মিল: কিতাবুল অযুর শুরু কুরআনের আয়াত اذا قمتم الي الصلاة الخ দ্বারা হয়েছিল। সেখানে আমরা জানতে পেরেছিলাম যে, قمتم-এর অর্থ এটাও হতে পারে যে, যখন তোমরা ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে নামাযের জন্য দণ্ডায়মান হবে তখন অযু করে নাও। আর এখানে কিতাবুল অযুর শেষে বলা হচ্ছে যে, যখন তোমরা ঘুমানোর ইচ্ছা করবে তখন অযু করে নাও। অর্থাৎ যদি অযু না থাকে তাহলে। কিন্তু যদি পূর্ব হতে অযু থাকে তাহলে সেই অযুই যথেষ্ট হবে।

সারকথা, যখন ঘুমানোর ইচ্ছা কর অযু করে নাও। আর যখন জাগ্রত হও অযু করে নাও। শুরু এবং শেষের মধ্যে কত সুন্দর মিল! এভাবে কিতাবের শুরু ও শেষের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা এটা একমাত্র ইমাম বুখারীর ন্যায় সূ²দৃষ্টিসম্পন্ন,  চমৎকার বিন্যাসবিদ ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তির পক্ষেই সম্ভব।

চমৎকার সমাপ্তি: হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (র.) বলেন, এখানে وَاجْعَلْهُنَّ آخِرَ مَا تَتَكَلَّمُ بِهِ-এর آخر শব্দ দ্বারা কিতাবুল অযুর সমাপ্তির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ কিতাবুল অযু  آخر বা শেষ হয়ে গেছে। এখন অন্য কিতাবের জন্য প্রস্তুতিগ্রহণ কর। এ বাক্য দ্বারা বাবের চমৎকার সমাপ্তির প্রতি ইঙ্গিত করছেন।

হযরত শাইখূল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া (র.) বলেন, ইমাম বুখারী প্রতিটি কিতাবের সমাপ্তিতে মানব জীবনের সমাপ্তির দিকে ইঙ্গিত করে থাকেন যে, যেমনিভাবে এ কিতাব সমাপ্ত হলো তেমনিভাবে সবকিছুরই একটি সমাপ্তি আছে। এবং তোমার জীবনও শেষ হওয়ার পথে। এ জন্য فان مت-এর উপর চিন্তা করাই যথেষ্ট।


কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.