পরিচ্ছেদ: জামাতের সাথে নামাজ আদায় ওয়াজিব হওয়া প্রসঙ্গে। হযরত হাসান বসরী (র.) বলেন, যদি কারো মাতা স্নেহ-মমতার কারণে ইশার নামাজ জামাতে পড়তে নিষেধ করেন, তাহলে তার কথা মান্য করা যাবে না।
অনুবাদ: হযরত আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ, আমি মনস্থ করেছি, আমি জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করার আদেশ দিব। তারপর নামাজ আদায় করার নির্দেশ দিব। নামাজের ইকামত বলা হবে এবং লোকজনের ইমামতি করার জন্য কোনো একজনকে নির্দেশ দিব। এরপর আমি লোকজনকে পিছনে রেখে (নামাজে অনুপস্থিত) লোকজনের বাড়ী যাবো এবং বাড়ীগুলো জ্বালিয়ে দিব। যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ, যদি তাদের কেউ জানে যে, সে একটি মাংসল হাড় অথবা ছাগলের দুটি ভাল খুর পাবে তাহলে অবশ্যই সে ইশার নামাজের জামাআতে হাজির হবে।
প্রাসঙ্গিক আলোচনা
হাদীসের সামঞ্জস্য: শিরোনামের সাথে হাদীসের সামঞ্জস্য فَأُحَرِّقَ عَلَيْهِمْ بُيُوتَهُمْ -এর সাথে। কারণ, ওয়াজিব তরক করার কারণেই কেবল এমন শাস্তির ধকম দেওয়া যেতে পারে। তাছাড়া হাসান বসরীর আছর দ্বারাও শিরোনামের সাথে সামঞ্জস্য স্পষ্ট। কেননা হুযুর (সা.)-এর বাণী: ان الله حرم عليكم عقوق الامهات হাদীস দ্বারা জানা গেল যে, মায়ের অবাধ্যতা হারাম। তার আনুগত্য করা ওয়াজিব। কিন্তু গুনাহের কাজে নয়। কারণ নবী করীম (সা.) বলেছেন: لاطاعة في معصية الله انما الطاعة في المعروف বুঝা গেল জামাত তরত করা গুনাহের কাজ।
শিরোনামের উদ্দেশ্য: ইমাম বুখারীর উদ্দেশ্য হলো এটা বর্ণনা করা যে, নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা ওয়াজিব। যেহেতু ইমাম বুখারীর মতে ওয়াজিব হওয়ার দলীল স্পষ্ট ছিল, যেমন হাসান বসরীর আছর, যা তিনি শিরোনামে বর্ণনা করে নিজের উদ্দেশ্যের কথা প্রকাশ করে দিয়েছেন। উলেখ্য যে, এ ওলামাগণের নিকট ওয়াজিব দ্বারা ফরজ উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। এর দ্বারা বুঝা গেল যে, ইমাম বুখারীর মতে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করা ফরজে আইন।
ইমামগণের মাযহাব: জামাতের হুকুম সম্পর্কে ইমামগণের উক্তি বিভিন্ন:
১. ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ও ইসহাক (র.)-এর মাসলাক হলো: জামাতে হাজির হওয়া ফরজে আইন। যেমনটি ইমাম বুখারীর মাযহাব বর্ণিত হয়েছে। এক বর্ণনায় এমনও আছে: কেউ যদি ওজর ব্যতীত একা একা নামাজ পড়ে তাহলে তার নামাজ ফাসেদ হয়ে যাবে। আতা ইবনে আবী রাবাহ, আওযায়ী, ইবনে খুযাইমা, আবু ছাওর ও ইবনে হিব্বান এ কথারই প্রবক্তা।
২. দাউদে যাহেরীর নিকট নামাজ সহীহ হওয়ার জন্য জামাত শর্ত। যদি জামাত তরক করা হয় তাহলে নামাজই হবে না।
৩. হানাফীদের মধ্য থেকে ইমাম ত্বহাবী, ইমাম কারাখী, কতিপয় শাফেয়ী ও মালেকীর মতে জামাত ফরজে কেফায়া।
৪. আইম্মায়ে ছালাছাহ (ইমাম আবু হানিফা, মালেক ও শাফেয়ী)-র মতে জামাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। ইমামত্রয়ের রাজেহ কওল এটিই।
ফজর/ওয়াজিব প্রবক্তাদের দলীলের উত্তর: এ দলীলের কয়েকটি উত্তর নিম্নরূপ:
১. স্বয়ং এ হাদীস দ্বারা-ই প্রমাণিত হয় যে, জামাত ফরজ নয়। কারণ, নবী করীম (সা.) নিজেই বলছেন, আমি কাউকে জামাতের নির্দেশ দিব, এবং নিজে কিছু লোক নিয়ে তাদের বাড়ি গিয়ে হাজির হব। এর দ্বারা স্বয়ং জামাত বর্জন করা আবশ্যক হয়। কিন্তু এ উত্তরটি সঠিক নয়। কারণ, আহকামের তাবলীগ করা তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব। অধিক সম্ভাবনা এটাই যে, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল জামাতের বিষয়টির প্রতি সতর্ক করা। তাছাড়া তিনি জামাত ত্যাগ করার ইচ্ছা এরূপ করেছেন যে, কিছু লোককে সঙ্গে নিয়ে যাবেন। সুতরাং যেহেতু তার সাথেও লোকজন রয়েছে, তাই মিশন সেরে এসে তিনি তাদেরকে নিয়ে জামাত করে নিবে।
২. দ্বিতীয় উত্তর এই দেওয়া হয় যে, রাসূল (সা.) তো শুধুমাত্র ইচ্ছা করেছেন। তা-তো কার্যে পরিণ করেননি। কিন্তু এ উত্তরও সঠিক নয়। কারণ, তিনি এমন কাজেরই ইচ্ছা করতে পারেন যার উপর আমল করা জায়েয হবে। আর মুসলমানদের ঘর-বাড়ি জ্বালানো একমাত্র কবীরা গুনাহে লিপ্ত হওয়ার কারণেই হতে পারে।
৩. তৃীয় জবাব এই দেওয়া হয় যে, নবী করীম (সা.) এ নির্দেশ ঐ সমস্ত লোকদের ব্যাপারে বলেছেন যারা জামাত সম্পূর্ণরূপেই বর্জন করেছিল।
৪. চতুর্থ জবাব এই যে, এ হুকুমটি ছিল মুনাফিকদের জন্য।
৫. পঞ্চম জবাব হলো এ হুকুমটি ধমক ও কঠোরতার উপর প্রযোজ্য হবে।
শব্দ-বিশ্লেষণ
عَرْقًا سَمِينًا : আল্লামা আইনী বলেন:ان العرق العظم الذي اخذ اكثر مما بقي عليه وبقي عليه شئ يسير অর্থাৎ যে হাড়ের উপর হতে অধিকাংশ গোশত খসানো হয়েছে, এবং তার উপর সামান্য গোশত অবশিষ্ট রয়েছে, তাকে عرق বলা হয়।
مِرْمَاتَيْنِ حَسَنَتَيْنِ : مرماتين-এর সংজ্ঞায় আল্লামা কুস্তুল্লানী (র.) বলেন: تثنية مرماة ظِلف الشاة او ما بين ظلفها من اللحم শব্দটি مرماة-এর দ্বি-বচন, অর্থ হলো বকরির খুর বা বকরির খুরের গোশত। এ দ্বিতীয় অর্থটি ইমাম বুখারী হতেও বর্ণিত হয়েছে।
আবার কেউ কেউ বলেছ্নে مرماتين এমন দুটি তীরকে বলা হয় যা দ্বারা তীরন্দাজীর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা হয়। এখানে উভয় অর্থই উদ্দেশ্য হতে পারে।
উদ্দেশ্য হলো হুযুর (সা.) জামাত তরককারীদেরকে তিরস্কার করছেন যে, যদি মসজিদে মামুলী জিনিসও পাওয়ার আশা থাকে তাহলে তো অবশ্যই হাজির হবে। (তাহলে জামাতে কেন হাজির হয়না?)
কোন মন্তব্য নেই